রাশিয়ার প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ছে ২৭%, সাতাশে খরচ ২০২.৬ বিলিয়ন ডলার
রাশিয়া ২০২৭ সালে প্রতিরক্ষা খাতে ১৭.১ ট্রিলিয়ন রুবল খরচের পরিকল্পনা করছে। মার্কিন ডলারে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ২০২.৬ বিলিয়ন ডলার। আগের বরাদ্দ করা ১৩.৫ ট্রিলিয়ন রুবলের তুলনায় প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা রুশ সরকারের বাজেট নথি অনুযায়ী, এই বিপুল প্রতিরক্ষা বরাদ্দ ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে কতটা পরিবর্তন এসেছে, তা তুলে ধরছে। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, ২০২৭ সালে দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় ৬.৯ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হতে পারে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া তার অর্থনীতির এত বড় অংশ প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ করেনি বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধের আগে থেকে কয়েক গুণ বেড়েছে প্রতিরক্ষা ব্যয়
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। যুদ্ধের আগে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল মোটামুটি ৩ থেকে ৪ ট্রিলিয়ন রুবলের মধ্যে। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৪.৭ ট্রিলিয়ন রুবল। ২০২৩ সালে প্রতিরক্ষা খাতে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৬.৪ ট্রিলিয়ন রুবলে।
২০২৪ সালে এই ব্যয় আরও বেড়ে প্রায় ১০.৮ ট্রিলিয়ন রুবলে পৌঁছয়। ২০২৫ সালেও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। এবার ২০২৭ সালের জন্য ১৭.১ ট্রিলিয়ন রুবলের প্রস্তাব সেই বৃদ্ধিকে আরও বড় মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় রাশিয়ার প্রতিরক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
GDP-র প্রায় ৬.৯ শতাংশ যাবে প্রতিরক্ষা খাতে
২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বরাদ্দ অনুযায়ী, রাশিয়ার মোট GDP-র প্রায় ৬.৯ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হতে পারে। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকের বছরগুলিতে এই হার ছিল আনুমানিক ৩ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে রাশিয়ার অর্থনীতিতে সামরিক ব্যয়ের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই মাত্রার ব্যয় সোভিয়েত ইউনিয়নের শীতল যুদ্ধের সময়কার সামরিক ব্যয়ের সঙ্গে তুলনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সোভিয়েত যুগের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের হিসাব নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন ছিল। ফলে বর্তমান রাশিয়ার ব্যয়ের সঙ্গে সেই সময়ের সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে সংজ্ঞা ও হিসাবের পদ্ধতি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
সোভিয়েত যুগের সঙ্গে কেন তুলনা হচ্ছে?
১৯৮৯ সালে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ জানিয়েছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল ৭৭.৩ বিলিয়ন রুবল। সেই সময়ের সরকারি বিনিময় হার অনুযায়ী এর মূল্য ছিল প্রায় ১২৪ বিলিয়ন ডলার। সমসাময়িক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই ব্যয় সোভিয়েত ইউনিয়নের GDP-র প্রায় ৮.৪ শতাংশের সমান ছিল।
তবে সেই সময় পশ্চিমা সরকার এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে সোভিয়েত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে মতভেদ ছিল। ব্রিটিশ সরকারের একটি হিসাব অনুযায়ী, NATO-র মতো সংজ্ঞা ব্যবহার করে সোভিয়েত সামরিক ব্যয় সরকারি ঘোষিত পরিমাণের প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। সেই হিসাব অনুযায়ী GDP-র প্রায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছিল। এই ঐতিহাসিক হিসাবের প্রেক্ষাপটেই ২০২৭ সালের রাশিয়ার ৬.৯ শতাংশ GDP-র প্রতিরক্ষা বরাদ্দকে সোভিয়েত আমলের সামরিক ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
আর্থিক চাপের মধ্যেও বাড়ছে সামরিক বরাদ্দ
রাশিয়ার অর্থনীতিতে বর্তমানে বিভিন্ন আর্থিক চাপ রয়েছে। তেল ও গ্যাস থেকে ভবিষ্যৎ রাজস্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি বাড়ছে এবং সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যেও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেট থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সামরিক খাত এখনও রুশ সরকারের ব্যয়ের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। অর্থনীতির বড় অংশ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যুক্ত থাকছে।
কোথায় খরচ হবে বাড়তি অর্থ?
প্রস্তাবিত অতিরিক্ত অর্থের একটি বড় অংশ রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পকে সক্রিয় রাখার কাজে ব্যবহার হতে পারে। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, আর্টিলারি গোলাবারুদ, সাঁজোয়া যান এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত এবং ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জামের জায়গায় নতুন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এছাড়াও সেনাদের বেতন, নতুন সদস্য নিয়োগের জন্য প্রণোদনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির পর সরঞ্জাম ও জনবলের ঘাটতি পূরণের ক্ষেত্রেও এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সঙ্গে বদলাচ্ছে রাশিয়ার অর্থনীতি
২০২৭ সালের ১৭.১ ট্রিলিয়ন রুবলের প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা বাজেট রাশিয়ার যুদ্ধকালীন অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যুদ্ধ শুরুর আগে যে পরিমাণ অর্থ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করা হতো, তার তুলনায় বর্তমান বরাদ্দ অনেক বেশি।
GDP-র প্রায় ৬.৯ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিকল্পনা রাশিয়ার অর্থনীতিতে সামরিক ব্যয়ের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সময়ে তেল-গ্যাস রাজস্ব, বাজেট ঘাটতি এবং ঋণের চাপের মতো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
ফলে ২০২৭ সালের বাজেট পরিকল্পনায় রাশিয়ার অর্থনীতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী সামরিক প্রয়োজন মেটানোর দিকে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।