ভারতের ব্যাটারি শিল্পে ২০৩০-এর মধ্যে ২০ লক্ষ চাকরি, গিগাফ্যাক্টরিতে বাড়বে নিয়োগ
কলকাতা: ভারতের ব্যাটারি শিল্প (Battery Industry) আগামী কয়েক বছরে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চলেছে। ২০২৯-৩০ অর্থবর্ষের মধ্যে দেশে ব্যাটারি শিল্পে ১৫ থেকে ২০ লাখ চাকরি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে ট্যালেন্ট সংস্থা অ্যাডেকো ইন্ডিয়া।
সংস্থার মতে, ভারতীয় ব্যাটারি শিল্প এখন শুধুমাত্র আমদানি করা লিথিয়াম-আয়ন সেল জোড়া দিয়ে ব্যাটারি তৈরির পর্যায় থেকে বেরিয়ে আসছে। ধীরে ধীরে দেশে সেল তৈরি থেকে সম্পূর্ণ ব্যাটারি প্যাক, উপাদান উৎপাদন এবং ব্যাটারি রিসাইক্লিং পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প-ইকোসিস্টেম তৈরি হচ্ছে।
অ্যাডেকো ইন্ডিয়ার ডিরেক্টর এবং হেড অব জেনারেল স্টাফিং দীপেশ গুপ্ত পিটিআইকে জানিয়েছেন, এই পরিবর্তনের ফলে শিল্পে সরাসরি ও পরোক্ষ, দুই ধরনের কর্মসংস্থানই দ্রুত বাড়বে।
৭৫ শতাংশ চাকরি হতে পারে পরোক্ষ ক্ষেত্রে
অ্যাডেকো ইন্ডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি হতে পারে ১৫-২০ লাখ চাকরি। এর মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ সরাসরি এবং ৭৫ শতাংশ পরোক্ষ কর্মসংস্থান হবে। শিল্পে নিয়োগের হার বছরে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। দেশে সংস্থাটির ৩০টিরও বেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও নিয়োগের প্রবণতার ভিত্তিতে এই পূর্বাভাস তৈরি করেছে অ্যাডেকো ইন্ডিয়া। শুধু কর্মীর সংখ্যা নয়, নিয়োগের ধরনেও বড় পরিবর্তন আসবে। আগামী দিনে ইলেকট্রোকেমিস্ট্রি, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ব্যাটারি ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং রিসাইক্লিং-এর মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়বে।
Advertisements
আরও পড়ুন: দেশের প্রতিরক্ষায় অগ্রগতি! ১.১০ লক্ষ কোটির অস্ত্র প্রস্তাবে সই রাজনাথের
২০২৬-এর শেষে ব্যাটারি উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ GWh-এর কাছে
বর্তমানে ভারতে ব্যাটারি উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৬০ GWh। ২০২৬ সালের শেষে তা প্রায় ১০০ GWh-এর কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। গুজরাট, কর্ণাটক, হরিয়ানা এবং তেলঙ্গানায় একাধিক গিগাফ্যাক্টরি প্রকল্পের বিনিয়োগ এই বৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। দীপেশ গুপ্তের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে ভারতীয় ব্যাটারি শিল্প আর শুধু অ্যাসেম্বলি নির্ভর থাকবে না। বরং ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প পরিকাঠামো তৈরি হবে। এর ফলে ব্যাটারি সেল উৎপাদন, ব্যাটারি প্যাক অ্যাসেম্বলি, উপাদান তৈরি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রিসাইক্লিং, সব ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান বাড়বে।
আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ
ব্যাটারি উৎপাদনে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোকে ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর লক্ষ্য পূরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অ্যাডেকো ইন্ডিয়ার মতে, ক্রিটিক্যাল মিনারেলস মিশন এবং কোয়াড ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ইনিশিয়েটিভ ফ্রেমওয়ার্ক-এ ভারতের অংশগ্রহণ এই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। দেশে সেল এবং পরিশোধিত কাঁচামালের উৎপাদন বাড়লে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। একইসঙ্গে গুজরাট, কর্ণাটক, হরিয়ানা ও তেলঙ্গানার মতো শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি টিয়ার-২ এবং টিয়ার-৩ শহরকেন্দ্রিক শিল্প করিডরেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: মহাকাশ গবেষণায় সাফল্য! ১০০ মিলিয়ন তহবিল সংগ্রহ করে রেকর্ড গড়ল স্পেস স্টার্টআপ পিক্সেল
সবুজ উৎপাদন খাতে ব্যাটারির বড় ভূমিকা
অ্যাডেকো ইন্ডিয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের গ্রিন ম্যানুফ্যাকচারিং চাকরির ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন শিল্প থেকে আসতে পারে। বিশেষায়িত ব্যাটারি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো দক্ষতার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেতনেও প্রিমিয়াম দেখা যেতে পারে। প্রচলিত ম্যানুফ্যাকচারিং এবং ইলেকট্রনিক্স ক্ষেত্রের তুলনায় দক্ষ ব্যাটারি ইঞ্জিনিয়াররা ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি বেতন পেতে পারেন বলে অনুমান করা হয়েছে।
১৮,১০০ কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ
দেশে ব্যাটারি সেল উৎপাদন বাড়াতে সরকার অ্যাডভান্সড কেমিস্ট্রি সেল বা ACC-এর জন্য PLI স্কিমের আওতায় ১৮,১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এর মাধ্যমে দেশে ৫০ GWh-এর অ্যাডভান্সড কেমিস্ট্রি সেল উৎপাদন ক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ ধরনের ব্যাটারি কেমিস্ট্রির জন্য আরও ৫ GWh ক্ষমতা রাখা হয়েছে। এর ফলে আগামী দিনে স্থানীয় সেল উৎপাদনের পরিমাণ বাড়বে এবং ব্যাটারি শিল্পের মূল্যশৃঙ্খলের আরও বেশি অংশ দেশে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চার রাজ্যেই ৭০ শতাংশের বেশি নিয়োগ
গিগাফ্যাক্টরি ক্লাস্টারগুলিই আগামী দিনে ব্যাটারি শিল্পের প্রধান কর্মসংস্থান কেন্দ্র হয়ে উঠবে। বর্তমানে কর্ণাটক, তেলঙ্গানা, গুজরাট এবং হরিয়ানা এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে। অ্যাডেকোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, মোট নিয়োগের ৭০ শতাংশের বেশি এই চারটি ক্লাস্টারকে কেন্দ্র করে হতে পারে। তবে টিয়ার-২ এবং টিয়ার-৩ শিল্প করিডরগুলির গুরুত্বও দ্রুত বাড়বে। কম্পোনেন্ট পার্ক, ব্যাটারি রিসাইক্লিং ইউনিট এবং সরবরাহকারী সংস্থাগুলি গিগাফ্যাক্টরির আশপাশে গড়ে উঠলে নতুন নিয়োগের প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এই অঞ্চলগুলি থেকে আসতে পারে।
রাজ্যভিত্তিক নিয়োগের সম্ভাব্য অংশ
- কর্ণাটক: ২৪ শতাংশ
- গুজরাট: ২২ শতাংশ
- তেলঙ্গানা: ১৮ শতাংশ
- হরিয়ানা: ১৪ শতাংশ
সেল ম্যানুফ্যাকচারিং, ব্যাটারি প্যাক অ্যাসেম্বলি এবং আনুষঙ্গিক সরবরাহকারী শিল্পের ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রাজ্যগুলিতে নিয়োগ আরও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি চাকরি হবে সেল ও কম্পোনেন্ট তৈরিতে
ব্যাটারি শিল্পের মধ্যে সেল ম্যানুফ্যাকচারিং এবং ব্যাটারি কম্পোনেন্ট বিভাগেই সবচেয়ে বেশি নিয়োগ হতে পারে। মোট নিয়োগের প্রায় ৪২-৪৫ শতাংশ এই ক্ষেত্র থেকে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাটারি ব্যবহারের পর তা পুনরুদ্ধার ও পুনর্ব্যবহারের প্রয়োজন বাড়ায় রিসাইক্লিং এবং ম্যাটেরিয়ালস রিকভারি-ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। এই বিভাগে নিয়োগের হার ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে অ্যাডেকো ইন্ডিয়া।
অর্থাৎ, ভারতের ব্যাটারি শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু ইভি বিক্রির ওপর নির্ভর করছে না। ব্যাটারি সেল, কম্পোনেন্ট, গিগাফ্যাক্টরি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রিসাইক্লিং মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প-ইকোসিস্টেম তৈরি হওয়াই আগামী কয়েক বছরে দেশের কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।