দুই বছরে দুই ভয়াবহ বন্যা, হিমালয়ের ল্হেন্দে করিডোরে বাড়ছে বিপদের ঝুঁকি - 24 Ghanta Bangla News
Home

দুই বছরে দুই ভয়াবহ বন্যা, হিমালয়ের ল্হেন্দে করিডোরে বাড়ছে বিপদের ঝুঁকি

Spread the love

কলকাতা: হিমালয়ের কোনও একটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে (Himalayan Flood) আলাদা করে দেখলে বিপদের সম্পূর্ণ চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কখনও হিমবাহের উপর জমে থাকা জল হঠাৎ বেরিয়ে এসে বন্যা তৈরি করতে পারে, আবার কখনও বরফ-পাথরের ধস নদী আটকে দিয়ে পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ জলপ্রবাহ ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি করতে পারে।

নেপালের লেহন্দে-বোটেকোশি করিডোরে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে পরপর দুটি বড় বিপর্যয় সেই ঝুঁকিরই উদাহরণ। একই নদী ব্যবস্থায় দুই বছরে দুটি ঘটনায় প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ছিল আলাদা, কিন্তু downstream বা নিম্নপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় একই ধরনের জনবসতি, রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক পরিকাঠামো।

২০২৬-এর বিপর্যয় শুধু একটি বন্যা নয়

২৬ অগস্ট ২০২৬ নেপালের রাসুয়া জেলার লেহন্দে-বোটেকোশি করিডোরে ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত আঘাত হানে। ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ এখনও তদন্তাধীন। বিজ্ঞানীরা উচ্চভূমিতে বরফ-পাথরের ধস বা আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ, তার পরে নদী সাময়িকভাবে আটকে যাওয়া এবং সেই বাধা ভেঙে জল নীচের দিকে ছুটে আসার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন। অর্থাৎ, ঘটনাটি শুধু একটি সাধারণ বন্যা ছিল না। একাধিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া পরপর ঘটেছে এবং একটির ফলাফল পরের বিপদের কারণ হয়েছে।

এই ধরনের ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা ক্যাসকেডিং হ্যাজার্ড বা পরস্পর-সংযুক্ত বিপদ হিসেবে দেখেন। উচ্চভূমিতে কয়েক কিলোমিটার দূরে শুরু হওয়া একটি ঘটনা কীভাবে নদীর আচরণ বদলে দিয়ে বহু দূরের জনবসতি ও পরিকাঠামোকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে, লেহন্দের ঘটনা তারই উদাহরণ।

Advertisements


   


   

হিমালয়ে এই ধরনের বিপদ নতুন নয়

হিমালয়ে এক বিপদ থেকে অন্য বিপদ তৈরি হওয়ার নজির আগেও রয়েছে। পরিবর্তনটা হল, এখন পাহাড়ি পরিবেশ দ্রুত বদলাচ্ছে এবং একইসঙ্গে নদী উপত্যকায় মানুষের বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোও বাড়ছে। ১৯৮৫ সালের ডিগ সো হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা তার অন্যতম পরিচিত উদাহরণ। ৪ অগস্ট ১৯৮৫-তে নেপালের মোরেন-ড্যাম দিয়ে আটকে থাকা ডিগ সো হ্রদের জল হঠাৎ বেরিয়ে যায়। বিপুল জলরাশি নীচের দিকে ছুটে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করে এবং প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া নামচে স্মল হাইড্রোইলেকট্রিক প্রকল্প ধ্বংস করে। এই ঘটনা দেখিয়েছিল, পাহাড়ের অনেক উপরে তৈরি হওয়া একটি হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে গেলে তার প্রভাব বহু দূরের পরিকাঠামোতেও পড়তে পারে।

২০১৪ সালের জুরে ধসও দিয়েছিল বড় শিক্ষা

২ অগস্ট ২০১৪ নেপালের জুরে ভূমিধস আরেক ধরনের ক্যাসকেডিং বিপদের উদাহরণ। বড়সড় ভূমিধসে সুনকোশি নদী আটকে যায়। ধসের তৈরি বাঁধের পিছনে জল জমে অস্থায়ী হ্রদের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই বাধা ভেঙে গেলে আরও বড় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।এর প্রভাব পড়ে নেপাল-চিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের রাস্তা, সেতু এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর ওপর। এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: ভূমিধস যেখানে ঘটেছে, বিপদ সেখানেই শেষ হয় না। ভূমিধস নদী আটকে দিলে নদী নিজেই পরবর্তী বিপদের অংশ হয়ে ওঠে।

২০২১ সালের মেলামচি বিপর্যয়

২০২১ সালের মেলামচি বিপর্যয়ও একই ধরনের বহুস্তরীয় ঝুঁকি সামনে এনেছিল। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট বা আইসিআইএমওডি-র মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওই ঘটনায় বিভিন্ন জায়গায় একাধিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করেছিল। এর মধ্যে ছিল বৃষ্টি, উচ্চভূমির প্রক্রিয়া, ভূমিধস, নদী আটকে যাওয়া, জল হঠাৎ বেরিয়ে আসা, নদীভাঙন এবং ধ্বংসাবশেষ জমা হওয়া। একটি বিপদ কীভাবে অন্য বিপদকে বাড়িয়ে দিতে পারে, মেলামচি সেই বিষয়টি স্পষ্ট করেছিল। তাই আইসিআইএমওডি পৃথক পৃথক বিপদ বিশ্লেষণের পরিবর্তে সমন্বিত মাল্টি-হ্যাজার্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট-এর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।

২০২৫-এ বন্যার কারণ ছিল হিমবাহের হ্রদ

লেহন্দে নদী ব্যবস্থায় ২০২৫ সালের ঘটনাটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ৮ জুলাই ২০২৫ নেপাল-চিন সীমান্ত থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উজানে, তিব্বতের পিউরেপু হিমবাহের উপর তৈরি একটি সুপ্রাগ্লেসিয়াল লেক বা হিমবাহের উপরিভাগের হ্রদ দ্রুত খালি হয়ে যায়। এর ফলে আকস্মিক বন্যা তৈরি হয় এবং লেহন্দে নদী দিয়ে সেই জল নীচের দিকে নেমে আসে। নেপালে এই নদীকে বোটেকোশি নদী নামেও উল্লেখ করা হয়। রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং রাসুয়াগাধি ড্রাই পোর্ট-সহ গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নেপাল সরকারের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি বা এনডিআরআরএমএ-র রিপোর্টে স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে বন্যার উৎস খতিয়ে দেখা হয়। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মার্চ থেকেই পিউরেপু হিমবাহে সুপ্রাগ্লেসিয়াল জলাশয় তৈরি হচ্ছিল। পরবর্তী মাসগুলিতে সেগুলি বড় হতে থাকে। ৭ জুলাই সম্মিলিত জলাশয়ের আয়তন প্রায় ০.৭৫ বর্গকিলোমিটার হয়ে যায়। ৮ জুলাই সেই জলাশয়ের আয়তন হঠাৎ কমে যায় এবং হিমবাহের উপরিভাগে জল বেরিয়ে যাওয়ার চিহ্ন দেখা যায়। এই তথ্য দ্রুত জল নিষ্কাশন এবং পরবর্তী বন্যার মধ্যে যোগসূত্রকে শক্তিশালী করে।

২০২৬-এ বদলে গেল বিপদের চরিত্র

কিন্তু ২০২৬ সালের ঘটনাটি আলাদা। এবার বিজ্ঞানীরা উচ্চভূমির লেহন্দে খোলা এলাকায় আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ-কে সম্ভাব্য ট্রিগার হিসেবে পরীক্ষা করছেন। প্রাথমিক তথ্য থেকে নদী সাময়িকভাবে আটকে যাওয়ার পর জলপ্রবাহ নীচের দিকে নেমে আসার সম্ভাবনাও উঠে এসেছে। অর্থাৎ, ২০২৫ সালে যেখানে হিমবাহের উপরিভাগের হ্রদ দ্রুত খালি হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, ২০২৬ সালে সম্ভাব্য প্রক্রিয়া ছিল বরফ-পাথরের ধস এবং নদী অবরুদ্ধ হওয়া। এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনও একটি নির্দিষ্ট বিপদ চিহ্নিত করে শুধু সেটির ওপর নজর রাখলে একই নদী ব্যবস্থার অন্য সম্ভাব্য বিপদ অদৃশ্য থেকে যেতে পারে।

শুধু হিমবাহের হ্রদ পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়

২০২৫ সালের ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই হিমবাহের উপর তৈরি জলাশয়গুলির দিকে নজর বাড়ানো জরুরি। কিন্তু শুধু সেগুলি পর্যবেক্ষণ করলে অস্থিতিশীল বরফ-পাথরের ঢাল বা আকস্মিক নদী অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনা আগে থেকে ধরা নাও পড়তে পারে। আবার যে বন্যার সূচনা উচ্চভূমিতে হঠাৎ কোনও ধস বা নদী আটকে যাওয়ার মাধ্যমে হচ্ছে, সেখানে শুধু বৃষ্টিপাত এবং নদীর জলস্তর পর্যবেক্ষণ করে যথেষ্ট আগাম সতর্কতা পাওয়া কঠিন হতে পারে।

তাই প্রয়োজন উজান থেকে ভাটির সম্পূর্ণ ঝুঁকি-পথ পর্যবেক্ষণ করা। হিমবাহের পরিবর্তন, অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল, ভূমিধস, নদী অবরুদ্ধ হওয়া এবং আকস্মিক জলমুক্তি, সবকিছুকেই একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

একই করিডোরে পরিকাঠামোর ঝুঁকি বাড়ছে

লেহন্দে-বোটেকোশি করিডোরে শুধু গ্রাম বা জনবসতি নেই। এখানে রয়েছে রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং সীমান্ত ও বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। তাই কোনও বিপদ যেখানে শুরু হচ্ছে, তার প্রভাব শুধু সেই জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পরিকাঠামো তৈরির সময় শুধু সাধারণ বন্যার ঝুঁকি বিবেচনা করলেই চলবে না। কোনও প্রকল্পের উজানে থাকা হিমবাহ, বরফ-পাথরের ঢাল, ভূমিধস বা সাময়িক নদী অবরোধ থেকে তৈরি জল ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত সেই প্রকল্পে পৌঁছতে পারে কি না, সেটিও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।

পুরনো বন্যার রেকর্ড অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধুমাত্র ঐতিহাসিক বন্যার তথ্য ভবিষ্যতের সব সম্ভাব্য বিপদের ছবি দিতে পারে না। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের লেহন্দে ঘটনা তার স্পষ্ট প্রমাণ। বিপদের প্রক্রিয়া বদলেছে, কিন্তু নদীর নীচের অংশে মানুষের ও পরিকাঠামোর ঝুঁকি একই রয়ে গিয়েছে।

সীমান্ত পেরিয়ে ঝুঁকি মোকাবিলার প্রয়োজন

লেহন্দে-বোটেকোশি নদী ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর আন্তঃসীমান্ত চরিত্র। ২০২৫ সালের বন্যার উৎস ছিল তিব্বতের দিকে, যার প্রভাব পরে নেপালে পড়ে। ২০২৬ সালের সম্ভাব্য ট্রিগারও উচ্চভূমির লেহন্দে খোলা অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ঝুঁকি বুঝতে হলে নদীর বিভিন্ন অংশের তথ্য একত্র করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় সীমান্ত পেরিয়েও তথ্য আদানপ্রদান জরুরি হতে পারে। হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢাল, নদীর জলপ্রবাহ, তুষার ও বরফের পরিস্থিতি, বৃষ্টিপাত এবং সম্ভাব্য নদী অবরোধ সম্পর্কে নজরদারির তথ্যকে দ্রুত নিচের দিকের জনবসতি ও পরিকাঠামো পরিচালনাকারীদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

হিমালয়ের জন্য বড় শিক্ষা

২০২৫ ও ২০২৬ সালের পরপর দুটি ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, হিমালয়ে ঝুঁকি শুধু ‘বন্যা বাড়ছে’ এই সরল সমীকরণে বোঝা যাবে না। একই নদী ব্যবস্থায় কখনও সুপ্রাগ্লেসিয়াল লেক দ্রুত খালি হয়ে বন্যা তৈরি করতে পারে, আবার অন্য সময়ে বরফ-পাথরের ধস নদী আটকে দিয়ে ভয়াবহ জলপ্রবাহ ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের আর্লি-ওয়ার্নিং সিস্টেম এবং পরিকাঠামো পরিকল্পনাকে একাধিক সম্ভাব্য ক্রায়োস্ফেরিক বা হিমবাহ-সম্পর্কিত প্রক্রিয়া বিবেচনায় নিতে হবে।

লেহন্দে-বোটেকোশি করিডোরের পরপর দুই বছরের অভিজ্ঞতা আসলে গোটা হিমালয়ের জন্য একটি সতর্কবার্তা: বিপদ কোথা থেকে শুরু হচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সেই বিপদ নদী ব্যবস্থার মধ্যে কীভাবে বদলে গিয়ে কত দূর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *