এক ফোঁটা বৃষ্টিও নষ্ট নয়, পুরোনো কৌশলেই কি বাজিমাত করতে চাইছে ভারত?

রাজস্থানের একটা গ্রাম। গরম বাড়লেই শুকিয়ে যায় কুয়ো। পুকুরেও জল থাকে না। জলের জন্য বহু দূর হাঁটতে হয় মানুষকে। কিন্তু একসময় এই গ্রামেই ছিল বৃষ্টির জল ধরে রাখার নিজস্ব ব্যবস্থা। বৃষ্টি নামলেই জল আটকে রাখা হতো। ধীরে ধীরে সেই জল মাটির নীচে ঢুকত। ভরে উঠত কুয়ো। আজ সেই পুরোনো ব্যবস্থাই আবার ফিরছে। এ বার জলসঙ্কটের সঙ্গে লড়াইয়ে কাজে লাগছে কয়েকশো বছরের পুরোনো জ্ঞান।

গল্পটা রাজস্থানের আলওয়ারের মুসি রানি সাগর-এরও। ১৮০০-র দশকের গোড়ায় তৈরি হয়েছিল এই প্রাচীন স্টেপওয়েল। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামা যেত জলের কাছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জলাধারটি প্রায় শুকিয়ে যায়। জলও হয়ে পড়ে দূষিত। ২০২১ সালের পরে শুরু হয় সংস্কারের কাজ। তার পরে ধীরে ধীরে ফিরতে থাকে জল। ২০২৫ সালে ৩০ বছরেরও বেশি সময় পরে প্রথম বার জলাধারটি উপচে পড়ে।

স্টেপওয়েল শুধু জল রাখার জায়গা নয়। এখানে বৃষ্টির জল জমে। সেই জল ধীরে ধীরে মাটির নীচে পৌঁছতে পারে। ফলে বাড়তে পারে ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণও। ভারতে একসময় এমন হাজার হাজার জলাধার ছিল। অঞ্চলভেদে নামও ছিল আলাদা। কোথাও বাওরি। কোথাও জোহাড়। কোথাও আবার কুণ্ড বা টাঁকা। কাজ একটাই — জল ধরে রাখা এবং মাটির জলভাণ্ডার ভরানো।

এই পুরোনো ব্যবস্থাগুলি এখন আবার দরকার কেন? কারণ ভারতের জল পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। দেশে বিশ্বের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ বাস করেন। কিন্তু মিষ্টি জলের সম্পদ রয়েছে মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ। তার উপর পানীয় জল ও চাষের জন্য বহু জায়গায় ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরতা বেশি। সমস্যা হলো, যতটা জল মাটির নীচে থেকে তোলা হচ্ছে, সবসময় ততটা আবার ফিরে আসছে না। তাই বৃষ্টির জল ধরে রাখা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ।

আলওয়ারের গল্পটা তাই গুরুত্বপূর্ণ। একসময় সেখানে অসংখ্য জোহাড় ছিল। বর্ষার জল সেখানে আটকে থাকত। তার পরে ধীরে ধীরে সেই জল মাটির নীচে ঢুকত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জঙ্গল কমেছে। বেড়েছে খননকাজ। বেড়েছে বোরওয়েলের ব্যবহার। অনেক জোহাড় নষ্ট হয়ে যায়। কিছু এলাকা এমন জায়গায় পৌঁছয়, যাকে ‘ডার্ক জ়োন’ বলা হয়।

তার পরে আলওয়ারে এলেন সংরক্ষণকর্মী রাজেন্দ্র সিং। ১৯৮৫ সালে তিনি সেখানে যান। প্রথমে তাঁর অন্য পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষ তাঁকে বললেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় সমস্যা একটাই — জল। সেখান থেকেই শুরু হয় জোহাড় তৈরির কাজ। ১৯৮৬ সালের বর্ষায় একটি জোহাড় তৈরি হয়। বৃষ্টি এল। জল জমল। তার পর দেখা গেল, বহু বছর শুকিয়ে থাকা গ্রামের কুয়োগুলিতেও জল ফিরেছে। সেখান থেকেই শুরু হয় বড় পরিবর্তন।

সেখানেই থামেনি কাজ। এক গ্রামের পরে আর এক গ্রাম। তৈরি হতে থাকে ছোট ছোট জল সংরক্ষণ কাঠামো। ১৯৯৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে আলওয়ারে ১০ হাজারেরও বেশি জল সংরক্ষণ কাঠামো তৈরি বা পুনর্গঠন করা হয়। ফলও মিলল। একসময় মরশুমি হয়ে যাওয়া পাঁচটি নদীতে সারা বছর জলপ্রবাহ ফিরতে শুরু করল। উপকৃত হলো প্রায় ২৫০টি গ্রাম। অর্থাৎ, ছোট ছোট জলাধার মিলে বদলে দিতে পারে গোটা এলাকার জলচক্র।

এই ভাবনা এখন শুধু আলওয়ারে আটকে নেই। মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়াতেও বহু গ্রামে মাটি ও জল সংরক্ষণের কাজ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে পুরোনো পুকুর, কুণ্ড, টাঁকা ও অন্যান্য জলাধার। সরকারও বৃষ্টির জল ধরে মাটির নীচের জলভাণ্ডার ভরানোর উপর জোর দিচ্ছে। অর্থাৎ, নতুন প্রযুক্তির পাশাপাশি পুরোনো জ্ঞানও আবার কাজে লাগানো হচ্ছে। তবে শুধু জলাধার বানালেই হবে না। নিয়মিত পলি পরিষ্কার করতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণও করতে হবে।

তাই ভারতের জল ভবিষ্যতের উত্তর হয়তো শুধু নতুন প্রযুক্তিতে নেই। কিছু উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের অতীতেও। শত বছরের পুরোনো স্টেপওয়েল। জোহাড়। কুণ্ড। টাঁকা। এই ব্যবস্থাগুলি এখনও কাজে লাগতে পারে। শুধু সেগুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিতে হবে। পুরোনো জ্ঞানকে নতুন প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। তা হলেই হয়তো শুকিয়ে যাওয়া ভারতের জলভাণ্ডার আবার ভরতে শুরু করবে।