কৃষিকাজে যুক্ত ৫০% মহিলাই পরিবারের খামারে অবৈতনিক সহায়ক: রিপোর্ট
কলকাতা: ভারতের কৃষিক্ষেত্রে কাজ করা মহিলাদের (Women in Agriculture) ৫০.৫ শতাংশই পরিবারের খামারে অবৈতনিক সহায়ক হিসেবে কাজ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২১.৭ শতাংশ। কৃষিক্ষেত্রে মহিলাদের…
কলকাতা: ভারতের কৃষিক্ষেত্রে কাজ করা মহিলাদের (Women in Agriculture) ৫০.৫ শতাংশই পরিবারের খামারে অবৈতনিক সহায়ক হিসেবে কাজ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২১.৭ শতাংশ। কৃষিক্ষেত্রে মহিলাদের অদৃশ্য শ্রমের প্রকৃতি ও তার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রকাশিত আর্য.এজি-র নতুন রিপোর্ট ‘হার্ভেস্ট ২০২৬: দ্য হিডেন কস্ট অফ উইমেনস ইনভিজিবল ওয়ার্ক ইন ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচার’-এ এই তথ্য উঠে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারি পরিসংখ্যানে পরিবারের খামারে কাজ করা এই ধরনের সহায়কদের কৃষক বা চাষি হিসেবে গণ্য করা হয় না।
আর্য.এজি-র প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, রিপোর্টটি পিএলএফএস ২০২৩-২৪, কৃষি শুমারি ২০১৫-১৬, ফাও, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, ভারত সরকারের বিভিন্ন সূত্র, আইএফসি এবং আর্য.এজি-র প্রকাশিত তথ্য-সহ একাধিক সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যভাণ্ডারের উপর ভিত্তি করে তৈরি।
কৃষিক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়লেও মালিকানা কম
রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমানে ভারতের কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে মহিলাদের অংশীদারি প্রায় ৪৮ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালে এই হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে কৃষিজমি পরিচালনা ও মালিকানার ক্ষেত্রে ছবিটা আলাদা। ভারতে মহিলারা মাত্র ১৩.৯৬ শতাংশ কৃষি পরিচালনাধীন জমির মালিকানা বা পরিচালনার অধিকার রাখেন। বিশ্বব্যাপী এই গড় প্রায় ১৪.৫ শতাংশ।
ভারতে মহিলারা মোট কৃষিজমির প্রায় ১১.৭২ শতাংশ পরিচালনা করেন। তুলনায় ব্রাজিলে মহিলাদের অধীনে রয়েছে প্রায় ৮.৫ শতাংশ কৃষিজমি এবং আমেরিকায় মহিলা প্রধান পরিচালকদের অধীনে রয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ কৃষিজমি। নেপালে অবশ্য এই হার ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। সেখানে মহিলারা ৩২.৪ শতাংশ কৃষি পরিচালনাধীন জমির অধিকারী এবং মোট কৃষিজমির ২২.৩ শতাংশ পরিচালনা করেন।
মহিলা পরিচালিত খামারে উৎপাদনশীলতার ব্যবধান
রিপোর্ট অনুযায়ী, একই আকারের পুরুষ পরিচালিত খামারের তুলনায় মহিলা পরিচালিত খামারের উৎপাদনশীলতা ২৪ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। তবে রিপোর্ট এই ব্যবধানকে মহিলাদের দক্ষতার অভাব হিসেবে দেখছে না। বরং কৃষিঋণ, কৃষি উপকরণ এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল সম্পদে তুলনামূলক কম সুযোগ পাওয়াকেই এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থায় মহিলারা পুরুষদের প্রতি ১০০ টাকা আয়ের বিপরীতে প্রায় ৮২ টাকা আয় করেন। একই কাজের জন্য মহিলা কৃষিশ্রমিকরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২০-৩০ শতাংশ কম মজুরি পান বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহিলাদের পিছিয়ে থাকা সুযোগের কারণে বড় আর্থিক ক্ষতি
রিপোর্টে ফাও-এর একটি হিসাব ব্যবহার করে বলা হয়েছে, উৎপাদনশীল সম্পদে অসম সুযোগের কারণে কৃষি উৎপাদন ২.৫-৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ভারতের কৃষিক্ষেত্রের মোট স্থূল মূল্য সংযোজন বা জিভিএ প্রায় ৪৮.৭ লক্ষ কোটি টাকা ধরে রিপোর্টটির হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ১.২-২ লক্ষ কোটি টাকার কৃষি উৎপাদন হারিয়ে যেতে পারে। রিপোর্টের বক্তব্য, সমস্যাটি এই নয় যে মহিলারা কম কৃষিকাজ করেন। বরং তাঁরা কম সম্পদ ও সুযোগ নিয়ে কৃষিকাজ করেন।
অর্থ, প্রযুক্তি ও বাজারে সুযোগ বাড়ানোর দাবি
আর্য.এজি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী আধিকারিক প্রসন্ন রাও বলেন, মহিলা কৃষকরা অর্থ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি এবং সংগঠিত বাজারে পর্যাপ্ত সুযোগ পেলে তার সুফল শুধু সংশ্লিষ্ট কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারের পাশাপাশি গোটা সম্প্রদায় এবং কৃষি অর্থনীতিও লাভবান হয়।
তাঁর মতে, ২০২৬ সালকে মহিলা কৃষকদের আন্তর্জাতিক বছর হিসেবে পালন করার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার, যেখানে মহিলারা সমানভাবে অংশ নিতে, নেতৃত্ব দিতে এবং নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে পারেন।
মহিলা কৃষকদের জন্য রিপোর্টে কী কী সুপারিশ?
রিপোর্টে মহিলাদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। জমির দলিলে কার নাম রয়েছে, শুধু তার ভিত্তিতে কৃষক হিসেবে পরিচয় নির্ধারণ না করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও ঋণ, কৃষিপণ্য সংগ্রহ এবং কৃষক উৎপাদক সংগঠন বা এফপিও-র সদস্যপদ সংক্রান্ত তথ্য লিঙ্গভিত্তিকভাবে প্রকাশের সুপারিশ করা হয়েছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে:
- জামানত ছাড়াই বা কম জামানতে কৃষিঋণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
- গুদামজাত পণ্যের রসিদের ভিত্তিতে ঋণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
- মহিলাদের নামে কৃষিঋণ অ্যাকাউন্ট বাড়াতে হবে।
- জমির মালিকানার পরিবর্তে উৎপাদিত ফসলের ভিত্তিতেও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
- মহিলা কৃষকদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ড্রোন, কৃষি পরামর্শ এবং বাজার-প্রযুক্তির সুযোগ বাড়াতে হবে।
- মহিলা নেতৃত্বাধীন এফপিওগুলিকে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি বাজার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
রিপোর্টটির মূল বক্তব্য হল, কৃষিক্ষেত্রে মহিলাদের ভূমিকা শুধু শ্রমিক বা পরিবারের অবৈতনিক সহায়ক হিসেবে দেখলে ভারতের কৃষি অর্থনীতির একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। তাঁদের উৎপাদনশীল সম্পদ, ঋণ, প্রযুক্তি এবং বাজারের সুযোগ বাড়ানো গেলে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা এবং মহিলাদের আয়, দুটোই বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।