বার্থ ও ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া বন্ধ, শ্মশানে বাড়ছে ভোগান্তি
এই সময়: বাবার মৃত্যু সংবাদ শুনে রাতের ফ্লাইটে কলকাতায় এসেছিলেন শিলাদিত্য লাহিড়ি। দক্ষিণ কলকাতার কেওড়াতলা শ্মশানে শেষকৃত্যের পরে তাঁকে না দেওয়া হয়েছে কোনও ক্রিমেশান সার্টিফিকেট না ডেথ সার্টিফিকেট (ডিসি)। এমনকী, শেষকৃত্যের পরে সাত দিন পেরিয়ে গেলেও তাঁর মোবাইলে কোনও লিঙ্কও আসেনি। আতান্তরে পড়েছেন শিলাদিত্য। বলছেন, ‘শ্রদ্ধানুষ্ঠানের পরেই মাকে নিয়ে বেঙ্গালুরু ফিরে যাব। কিন্তু, ডেথ সার্টিফিকেট না নিয়ে কী করে যাব? অনির্দিষ্টকাল তো কলকাতায় বসে থাকতে পারব না। এই অবস্থায় মাকে একা রেখেও যেতে পারব না। ওদিকে ডিসি ছাড়া ব্যাঙ্ক–সহ অন্য জায়গার কাজও করা যাবে না।’
শ্মশানে এ নিয়ে প্রশ্ন করলে অত্যন্ত রূঢ় কণ্ঠে উত্তর এসেছে, ‘কর্পোরেশনে গিয়ে খোঁজ নিন।’ শ্মশানের অফিসঘরের দেওয়ালে সাঁটা একটি ল্যান্ডলাইন নম্বর দেখিয়ে বলা হয়েছে, ‘এখানে পরের সপ্তাহে ফোন করে খোঁজ নিতে পারেন।’ বালিগঞ্জের বাসিন্দা পরাগ সেনের অভিযোগ, ‘দিন সাতেক আগে এক আত্মীয় মারা যান। কেওড়াতলা শ্মশানের অফিস থেকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচের স্লিপ ধরিয়ে বলা হয়েছে, ডেথ সার্টিফিকেটের জন্য পুরসভায় যোগাযোগ করতে। অথচ ধর্মতলায় পুরসভার অফিসে এখন ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার কাজ বন্ধ রয়েছে বলেই শুনেছি।’
মৃত্যুর পরে অনেকেরই পেনশন বন্ধ করতে এই ডিসি লাগে। অনেকের ক্ষেত্রে অবিলম্বে ফ্যামিলি পেনশন চালুর প্রয়োজন হয়। কারও এলআইসি–সহ অন্য বিমা অথবা ব্যাঙ্কে জমা থাকা এফডি–র টাকা ফেরত পেতেও ডিসি প্রয়োজন। সম্পত্তির হাতবদলের প্রয়োজন হয়। কী করবেন তাঁরা? সদুত্তর নেই।
এই ভুক্তভোগীর সংখ্যাটা প্রতি দিন লাফিয়ে বাড়ছে। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, কেওড়াতলায় দিনে গড়ে ৮০ থেকে ১০০টি মরদেহ দাহ হয়ে থাকে। উত্তর কলকাতার নিমতলা শ্মশানে ১০০ থেকে ১২০টি। এ ছাড়াও গড়িয়া, বিরজুনালা, কাশী মিত্রর মতো ছোট শ্মশানে সবমিলিয়ে দিনে গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি মৃতদেহ দাহ হয়। সবমিলিয়ে কলকাতা পুর এলাকায় গড়ে প্রতি দিন প্রায় ২৫০টি দেহ দাহ হয়। জুলাইয়ের শেষ থেকে কেউই ডিসি পাচ্ছেন না।
একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বার্থ সার্টিফিকেট নিয়েও। পুরসভা সূত্রে খবর, কলকাতা পুরসভার সদর এবং বিভিন্ন বোরো অফিস মিলিয়ে দিনে গড়ে ১২৫ থেকে ১৪০টি বার্থ সার্টিফিকেটের আবেদন জমা পড়ে। মানিকতলার বাসিন্দা রাজা সরখেল বলেন, ‘মেয়ের পাসপোর্ট রিনিউ করতে ডিজিটাল বার্থ সার্টিফিকেটের জন্য কলকাতা পুরসভায় প্রায় মাস খানেক আগে আবেদন করেছিলাম। পাইনি।’
পুর আধিকারিকদের যুক্তি, জন্ম ও মৃত্যুর নথি সংক্রান্ত পোর্টালটাই বন্ধ রয়েছে। কেন? অফিসারদের দাবি, রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘সার’ চলাকালীন অনেকের ক্ষেত্রে জন্ম ও মৃত্যু নিয়ে যে সার্টিফিকেট জমা পড়েছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সন্দেহ। তারই তদন্তে নেমেছে পুলিশ। তারই অঙ্গ হিসেবে বন্ধ রাখা হয়েছে পোর্টাল। ফলে, নতুন করে কেউই জন্ম ও মৃত্যুর সার্টিফিকেট পাচ্ছেন না। শুধু সদ্যোজাতর ক্ষেত্রেই নয়, অনেকেই বিভিন্ন প্রয়োজনে বার্থ সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেন। তাঁরাও আতান্তরে পড়েছেন। শিলাদিত্যর কথায়, ‘হতে পারে কোনও দুর্নীতি নিয়ে তদন্তের জন্য এটা বন্ধ রয়েছে। তার জন্য আমরা কেন সাফার করব বলতে পারেন?’
কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে পুরসভা স্পষ্ট বার্তা দিতে পারছে না। এ দিকে বার্থ ও ডেথ সার্টিফিকেট পেতে প্রতি দিন পুরসভার সদর দপ্তরের পাশাপাশি ও বোরো কার্যালয়গুলিতে মানুষের ভিড় বাড়ছে। সল্টলেক–সহ রাজ্যের অন্যত্রও চিত্রটা এক। আগামী সোমবার, ১০ অগস্ট পোর্টাল ফের চালু হতে পারে বলে পুরসভার শীর্ষ স্তরের খবর। তবে এ নিয়ে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত কোনও নিশ্চিত বার্তা মেলেনি।