হরিয়ানার রাখিগড়ির প্রত্ন খননে পাওয়া কঙ্কাল আসবে কলকাতায়
এই সময়: হরিয়ানার রাখিগড়ি প্রত্নস্থল থেকে পাওয়া মানবকঙ্কালের অবশেষ তুলে দেওয়া হলো অ্যানথ্রোপলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (অ্যানএসআই)–র হাতে। গবেষণার কাজে কঙ্কালগুলো পরীক্ষা করা হবে কলকাতায়। সিন্ধু–সরস্বতী সভ্যতার বৃহত্তম এই প্রত্নক্ষেত্রে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার উদ্দেশ্যে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) এবং অ্যানএসআই–এর মধ্যে মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। কঙ্কালের হস্তান্তর সেই চুক্তিরই অন্যতম পদক্ষেপ। অ্যানএসআই–এর অধিকর্তা ভাল্লামুদি ভি শর্মা জানিয়েছেন, দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এই সমঝোতা চুক্তির ফলে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্র রাখিগড়ি সম্পর্কে গবেষণার মাত্রা আরও অনেকটাই এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হরিয়ানার প্রায় ৫৫০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত রাখিগড়ি স্বীকৃত হয়েছে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার বৃহত্তম জনবসতি হিসেবে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে এখানে হরপ্পা যুগ শুরুর আগে থেকে (৪৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) প্রারম্ভিক হরপ্পা যুগ (৩৩০০ থেকে ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এবং পরিণত হরপ্পা যুগ (২৬০০–১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) পর্যন্ত সময়ে ধাপে ধাপে ধারাবাহিক ভাবে মানব বসতির প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে রয়েছে সুপরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা, কারুশিল্প উৎপাদনকেন্দ্র, বাণিজ্যকেন্দ্র এবং সমাধিক্ষেত্র।
১৯৬০–এর দশকে এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান শুরু হয়। পরে, ১৯৯০–এর দশকে এবং তারও পরে ২০১২–তে বিশেষ গতি পায় সেই অনুসন্ধান। ২০২৫-’২৬–এর এক্সকাভেশন সিজ়নে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ৭ নম্বর স্তূপে (মাউন্ড–সেভেন) ৮টি সমাধি খুঁজে পান। ওই জায়গা অনেক আগে থেকেই একটি কবরস্থান বা সমাধিক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত ছিল। ওই সমাধিগুলোর মধ্যে থেকে উদ্ধার হওয়া তিনটি সম্পূর্ণ মানবকঙ্কাল এবং অন্যান্য সমাধি থেকে পাওয়া কঙ্কালের খণ্ডাংশগুলো সবিস্তার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য কলকাতায় অ্যানএসআই-এর মানবকঙ্কাল সংরক্ষণাগার ও গবেষণাগারে আনা হবে। তা ছাড়া, ওখান থেকে পাওয়া কঙ্কাল-সংক্রান্ত বাকি উপাদানগুলিও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অ্যানএসআই-এর হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর ফলে ভারতের প্যালিও-অ্যানথ্রোপলজিক্যাল গবেষণা আরও শক্তিশালী হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাঁদের ব্যাখ্যা, ‘মানব জীববিজ্ঞান ও অস্থিবিদ্যায় (অস্টিওলজি) অ্যানএসআই-এর বিশেষ দক্ষতা এ বার সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার মানুষের জনসংখ্যাগত ইতিহাস, স্বাস্থ্য, জীবনযাপন পদ্ধতি এবং পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের মানিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে কাজে লাগবে।’ অ্যানএসআই জানিয়েছে, ওই কঙ্কালগুলোর এডিএনএ (এনশিয়েন্ট ডিএনএ বা প্রাচীন ডিএনএ) বিশ্লেষণ, স্টেবল আইসোটোপ গবেষণা, অস্টিওলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট, প্রাচীন রোগতত্ত্ব বা প্যালিওপ্যাথোলজি সংক্রান্ত অনুসন্ধান এবং প্রাচীন পরিবেশ পুনর্গঠনের মাধ্যমে হরপ্পা সভ্যতার মানুষের বংশগত উৎস, অভিবাসনের ধারা, খাদ্যাভ্যাস, রোগব্যাধির বিস্তার, পরিবেশগত অভিযোজন কৌশল এবং মানুষ ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
অ্যানএসআই-এর অধিকর্তা জানিয়েছেন, এই গবেষণা লখনউয়ের বীরবল সাহানি ইনস্টিটিউট অফ প্যালিওসায়েন্সেস, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) এবং প্রাচীন ডিএনএ গবেষণায় বিশেষজ্ঞ বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইচইউ) গবেষক দলের মিলিত উদ্যোগে সম্পন্ন হবে।
হায়দরাবাদের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি (সিসিএমবি)–র বিজ্ঞানী কুমারস্বামী থঙ্গরাজ বলছেন, ‘রাখিগড়ি থেকে পাওয়া মানব দেহাবশেষে এডিএনএ প্রযুক্তির প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করতে পারে তাদের জিনগত ইতিহাস সম্পর্কে। একই সঙ্গে এটা খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ থেকে মানব জিনোম কী ভাবে বিবর্তিত হয়েছে এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে, সে বিষয়েও বিজ্ঞানীদের গভীরতর ধারণা দিতে সক্ষম হবে।’