হিস্ট্রি ভুলে বর্তমানেই চোখ রাখছে ইংল্যান্ড, আর্জেন্তিনা
সব্যসাচী সরকার, আটলান্টা
ক্রমশ চড়চড় করে বেড়ে চলেছে টিকিটের দাম। মাত্র তিন দিন আগে যে টিকিট ২ হাজার ডলারের কমে পাওয়া যাচ্ছিল, এখন সেটাই বেড়ে ২,৯৬৬ ডলার।
রাতারাতি ম্যাচের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সচেতনতা ‘এপিডি’, মানে আটলান্টা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের। উন্মাদনার পারদ বিচার করলে হেলায় স্পেন-ফ্রান্স ম্যাচকে পিছনে ফেলছে আজের্ন্তিনা-ইংল্যান্ড দ্বিতীয় সেমিফাইনাল।
কানসাস সিটি থেকে হাজারে হাজারে আজের্ন্তিনীয় সমর্থক ঢুকে পড়েছেন শহরে। আবার মায়ামি থেকে এসেই চলেছেন ইংল্যান্ডের সাপোর্টারেরা। এমনিতে দু’পক্ষই মহাযুদ্ধের আগে আপাতত শান্ত, কিন্তু রেকর্ড বলছে, এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বিয়ার উড়িয়ে দেওয়ার দৌড়ে যথারীতি এক নম্বরে থ্রি লায়ন্স (ইংল্যান্ড টিমের ডাকনাম) সমর্থকেরা। গ্যালারিতে এখানে বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে খেলা দেখায় কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে এই ম্যাচের যা অতীত ইতিহাস, ‘পেটে পানি’ একটু বেশি পড়লে কী হতে পারে, তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কায় প্রশাসন। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই নিরাপত্তা নিয়ে কোনওরকম ঝুঁকি নেয়নি প্রশাসন। এখন টুনার্মেন্টের একেবারে শেষে এসে কড়াকড়ি আরও বেড়েছে। ফলে লাল-নীল আলো জ্বলা ‘এপিডি’ লেখা পুলিশের গাড়ি ডাউনটাউনে ছুটে বেড়াচ্ছে, রাস্তা আটকে চলছে টহল।
দুটো দেশের অতীত ফুটবল ইতিহাসে গৌরব আর কলঙ্ক হাত ধরাধরি করে থাকলে কী হবে, এই সেমিফাইনালে এখন সেগুলো স্রেফ পুরোনো অলঙ্কার বিশেষ। আলমারিতে সাজানো। যে ২২ জন আটলান্টার মাঠে থাকবেন, তাঁদের কাছে ইতিহাস একেবারেই গুরুত্বহীন। স্বয়ং মেসি ইতিহাস না টেনে বলছেন, ‘সত্যিটা হলো, এটা স্পেশ্যাল ম্যাচ, কারণ সব টিমের বিরুদ্ধে খেললেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আমি কখনও খেলিনি। বিগ টিম, পাওয়ার হাউস। সেটা মাথায় আছে টিমের।’ আবার ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার ওরিলির বক্তব্য, ‘মেসির বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পাওয়াটা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু ইংল্যান্ডকে জেতাতে মাঠে আসুন।’
২০০২ সালে যখন বেকহ্যামের পেনাল্টিতে ইংল্যান্ড জিতেছিল, জুড বেলিংহ্যাম জন্মাননি, মেসির বয়স ছিল ১৫! মোট ২০৫টা আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১২৫ গোল, কিন্তু আজের্ন্তিনার জার্সি গায়ে কোনওদিন মেসিকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নামতে হয়নি। বিশ্বকাপে টানা আটটা ম্যাচে গোলের পরে নয় নম্বর ম্যাচে সুইসদের বিরুদ্ধে প্রথমবার গোল আসেনি। মেসিকে সামান্য ক্লান্তও দেখিয়েছে। ওয়েন রুনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন সে কথা, ‘মেসি ডিফেন্সকে সাহায্য করতে নীচে নেমে আসে না। মেসি মানে মুহূর্তের মনোসংযোগ ও কমিউনিকেশন। এমন জায়গায় পৌঁছে যাওয়া, যা কেউ ভাববে না। এখানেই সতর্ক থাকতে হবে ইংল্যান্ডকে।’
প্রাক্তন ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার মিকা রিচার্ডস আবার বলছেন, ‘মেসিকে মার্ক করে আটকানো অসম্ভব। কারণ ও অদ্ভুত জায়গায় বিচরণ করে। ঠিক সময়ে সুইচ অন করতে পারে।’
মেজর লিগ সকার টিম আটলান্টা ইউনাইটেড এফসি-র ফ্যান বেস এখানে খুব জোরালো। গত নভেম্বরে আবার টিমের কোচ হয়েছেন আজের্ন্তিনার প্রাক্তন জাতীয় ম্যানেজার হেরার্দো তাতা মাতির্নো। তিনি আবার বলছেন, ‘মেসি বিশ্বের বিস্ময়। শুধু আর্জেন্তিনা নয়, সারা বিশ্ব ওর পাশে আছে।’
ফিফার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এ বার বারবার আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে উঠেছে। কিন্তু সে সব ছাপিয়ে টিম শেষ চারে পৌঁছেছে। বিশ্বকাপে টানা ১২ ম্যাচে অপরাজিত থাকাটা ফ্লুকে অসম্ভব। গোটা টিম মেসিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, গোটা টিম আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, যাতে ফুটবল ঈশ্বরের জীবনের শেষ বিশ্বকাপ হঠাৎ যেন শেষ না হয়ে যায়। কোচ স্কালোনি বলছেন, ‘এই টিম কী করে কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসে, আমি নিজেই বলতে পারব না। একটাই বোধহয় ব্যাখ্যা হয়। এরা জানে, জেতা ছাড়া আর্জেন্তিনার কোনও বিকল্প নেই।’
১৯৬৬ সালের পরে ৬০ বছর পরে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে ইংল্যান্ড। সে দেশের মিডিয়াই মেনে নিচ্ছে, জুড বেলিংহ্যাম না থাকলে ইংল্যান্ড মোটেই সেমিফাইনালে যায় না। হ্যারি কেন নন, রিয়াল মাদ্রিদের মিডফিল্ডারই এ বার থ্রি লায়ন্সের আসল নায়ক। মেক্সিকো এবং নরওয়ে, পরপর দুটো ম্যাচে ব্রেস (জোড়া গোল), ১৯৮৬ সালে মারাদোনার পরে একটা বিশ্বকাপে পরপর দুটো নক আউটে জোড়া গোল করার রেকর্ড এখন বেলিংহ্যামের।
‘আলটিমেট গ্রাজ ম্যাচ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হলেও দুটো টিমের ফুটবলাররা সেই রাস্তায় যাবেন কি না সন্দেহ। ভিএআর প্র়যুক্তির যুগে সামান্য অভিনয়ও টিমকে ডুবিয়ে দিতে পারে। এই আর্জেন্তিনা টিমের একঝাঁক প্লেয়ার খেলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে। গোলকিপার মার্তিনেস থেকে রোমেরো, লিসান্দ্রো মাতির্নেস থেকে এন্সো ফের্নান্দেস। কেন, বেলিংহ্যাম, রাইসদের সঙ্গে সবারই ভালো সম্পর্ক।
আবার দুই কোচের সামনে দুই স্বপ্ন। টিমকে ফাইনালে তুললে পরপর দুটো বিশ্বকাপে টিমকে ফাইনালে তুলবেন স্কালোনি। কার্লোস বিলাদোর্র পরে সে ক্ষেত্রে প্রথম হবেন, যিনি ১৯৮৬ সালে কাপ জিতেছিলেন আর ১৯৯০ সালে পৌঁছেছিলেন ফাইনালে। আবার ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠলে ৬০ বছর পরে টিমকে ফাইনালে তুলবেন তাদের জার্মান কোচ টমাস তুচেল।
যে-ই ফাইনালে যাক, দুর্ধর্ষ একটা থ্রিলারের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।