কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের চোখে ঋত্বিক ঘটক |Ei Samay
ছিন্নমস্তান
কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়
আদ্রিয়ান মার্টিন ঋত্বিকবাবুর কাজগুলোকে বোধহয় ঠিকই ধরেছেন : ‘a poetic rupture’।ঋত্বিক ঘটক আমার কাছে সর্বাগ্রে একজন দার্শনিক – পরে ফিল্মমেকার, নাট্যকার, গল্পকার, শিক্ষক বা অভিনেতা। কমিউনিস্ট ঋত্বিক, প্রতিবাদী ঋত্বিক, সাহসী ঋত্বিক, অভিমানী ঋত্বিক। Ghatak operates in extremes – বেশ করেন। বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে গেলে সেটা করতে হয়। ‘elite intellectual’রা যা ইচ্ছে বলুন।
রাজশাহীতে পড়াকালীন ঋত্বিক ঘটকের প্রযোজনা রবি ঠাকুরের ‘বিসর্জন। তখন এবং আজকের খুব দরকারি একটা কাজ। আর, সেই নাটক করা থেকেই আমরা তাঁর ভবিষ্যৎ চলনের দিকনির্দেশ পাচ্ছি। প্রথমত, রবীন্দ্র-দর্শন তাঁকে অনুপ্রাণিত করছে; দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার সম্ভাবনা মাথাচাড়া দিচ্ছে তাঁর মধ্যে। তিনি রঘুপতি। কিন্তু, তিনিই অনুশাসন ভাঙবেন। তিনি তো ছোটবেলায় বাড়ি থেকে পালিয়ে ছিলেন – অবাধ্য। সেই অবাধ্যতাই আছড়ে পড়বে প্রতিষ্ঠানের কাঁটাতারের ওপর। ‘স্ট্রাকচার’ তিনি ভাঙবেন নিশ্চয়ই। এই মানুষটি মহীরুহ। তাঁকে গাছের টাবে পুঁতে আটকে রাখা যাবে না। ঠিক যেমন মাইকেল মধুসূদন, পিয়ের পাওলো পাসোলিনি কিংবা মানিক বাঁড়ুজ্জ্যে – ভয় ডর নেই কোনো !
এহেন ‘dramatis personae’ এলেন তাঁর ‘given circumstance’ কলকাতায়। কোন কলকাতায় ? দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর, কালোবাজারি ও মন্বন্তর পরবর্তী, দাঙ্গা বিধ্বস্ত বাংলার কেন্দ্রবিন্দু শহরে। ‘আর্ট রেবেল সেন্টার’, ‘প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’, ‘গণনাট্য সঙ্ঘ’, ‘পিপলস রিলিফ কমিটি’ সমৃদ্ধ প্রতিবাদী শহরে। একদিকে নৌ বিদ্রোহের ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’, কিংবা তেভাগার আঁচ – অন্যদিকে, ভারত ছাড়ো আন্দোলন। এরকম একটা সময়ে ঋত্বিক ঘটক যোগ দিলেন গণনাট্য সংঘে। ‘কালো সায়র’ বা (দ্বিতীয়বারের প্রযোজনা) ‘নবান্ন’ – যা বাংলা নাটকের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। আর পেছনে তাকানোর সময় ছিল না। সে ‘অচলায়তন’, ‘দলিল’, ‘খড়ির গন্ডি’, ‘জ্বলন্ত’ বা ‘গ্যালিলিও’ হোক বা ‘ভোটের ভেট’, ‘ঢেউ’ অথবা ‘ম্যাকবেথ’। হয়েছে ‘নীলদর্পণ-এর মতো কালজয়ী নাটকের কাজ। কলকাতায় অর্থনৈতিক কারণে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনাকে আলম্ব করে তৈরি করেছেন ‘জ্বালা’নাটক, গড়ে উঠছে ‘সাঁকো’। নবদ্বীপের মহিলাকে অত্যাচার করে পুড়িয়ে মারার ঘটনার তীব্র বিরোধিতা ফুটে উঠছে তাঁর ‘সেই বিষ্ণুপ্রিয়া’ নাটকে, যা আজও একইরকম প্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ, ঋত্বিক রিঅ্যাক্ট করছেন এবং করবেনই। কিন্তু, প্রশ্ন হলো – মহিলার চরিত্রের নাম ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’ রাখা হলো কেন ? নবদ্বীপের ঘটনা বলে ? এর উত্তর খোঁজা খুব জরুরি।