পুরীতে কেন প্রতি বছর নতুন রথ তৈরি করা হয়? কী ভাবে তৈরি হয় সেই রথ?    - 24 Ghanta Bangla News
Home

পুরীতে কেন প্রতি বছর নতুন রথ তৈরি করা হয়? কী ভাবে তৈরি হয় সেই রথ?   

Spread the love

রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ভারতীয় ঐতিহ্য, ভক্তি ও প্রাচীন কারিগরি দক্ষতার এক অনন্য নিদর্শনও বটে। প্রতিবছর আষাঢ় মাসে পুরীতে মহাসমারোহে পালিত হয় জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। এই দিন জগন্নাথদেব, দাদা বলরাম এবং বোন সুভদ্রা তিনটি পৃথক রথে চড়ে শ্রীমন্দির থেকে মাসির বাড়ি গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। 

শাস্ত্রমতে, পুরী বিষ্ণুর চার ধামের মধ্যে অন্যতম। বাকি তিনটি ধাম হলো বদ্রীনাথ, দ্বারকা ও রামেশ্বরম। রথযাত্রার আগে জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে ১০৮ কলসি সুগন্ধি জল দিয়ে মহাস্নান করানো হয়। প্রচলিত বিশ্বাস, এই স্নানের পর তিন দেবদেবী ‘অনবাসর’ পর্বে প্রবেশ করেন। প্রায় ১৫ দিন তাঁরা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকেন এবং রাজবৈদ্যের দেওয়া ভেষজ পাঁচন সেবন করে সুস্থ হন। এরপরই মাসির বাড়ি গুণ্ডিচা মন্দিরে যাওয়ার জন্য রথে আরোহন করেন।

এই রথযাত্রার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, প্রতি বছর তিনটি নতুন রথ নির্মাণ করা হয়। অক্ষয় তৃতীয়া থেকেই এই নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং প্রায় দুই মাস ধরে চলে সেই রথ তৈরির প্রক্রিয়া। জগন্নাথের রথের নাম নান্দীঘোষ। প্রায় ৪৫ ফুট উঁচু এই রথের নাম দিয়েছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র, থাকে ১৬টি বিশাল চাকা। বলরামের রথের নাম তালধ্বজ এবং সুভদ্রার রথের নাম দর্পদলন বা পদ্মধ্বজ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই শাস্ত্রীয় বিধি মেনে তৈরি করা হয় এই তিন রথ। 

Rath Yatra Puri, Crowd of devotees
রথযাত্রা

কী ভাবে তৈরি হয় রথ? 

রথ নির্মাণে প্রয়োজন হয় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৮৩২টি কাঠের অংশ। এর জন্য ওডিশার বনাঞ্চল থেকে প্রায় ৮৮৪টি গাছের ১২ ফুট দৈর্ঘ্যের কাণ্ড সংগ্রহ করা হয়। তবে যে কোনও গাছের কাঠ ব্যবহার করা যায় না। শাস্ত্র অনুযায়ী শুধুমাত্র ফসি, ধৌসা, হাঁসি এবং নিম গাছের কাঠই রথ তৈরির জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হয়।

কাঠ সংগ্রহের নিয়ম

কাঠ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ নিয়ম। বন দপ্তরের অনুমতি পাওয়ার পর পুরীর প্রধান পুরোহিত নির্দিষ্ট গাছ চিহ্নিত করে শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী পুজো করেন। রথের কাঠ হতে হবে সোজা ও খাঁটি।এরপর বংশপরম্পরায় এই দায়িত্ব পালন করে আসা প্রধান ছুতোর সোনার জল করা কুঠার জগন্নাথের চরণে স্পর্শ করিয়ে প্রথম কাঠ কাটার কাজ শুরু করেন। প্রচলিত বিশ্বাস, জগন্নাথদেবই পুরীর রাজা, তাই তাঁর রথের কাঠ সাধারণ কুঠার দিয়ে নয়, বিশেষ ভাবে পূজিত কুঠার দিয়েই কাটা হয়।

থাকে না কোনও স্ক্রু

রথ নির্মাণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এত বড় কাঠামো তৈরিতে একটিও লোহার পেরেক বা স্ক্রু ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ রথটিই প্রাচীন ভারতীয় কাঠ-জোড়ার প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি হয়। নির্মাণকালে কারিগরদেরও কঠোর নিয়ম মানতে হয়। তাঁরা মন্দির চত্বরে থেকেই কাজ করেন, নিরামিষ আহার গ্রহণ করেন, ব্রহ্মচর্য পালন করেন এবং কোনও অশুভ ঘটনা ঘটলে সেই কাজ থেকে বিরত থাকেন।

কেন প্রতি বছর ভেঙে ফেলা হয় পুরোনো রথ? নির্মাণ করা হয় নতুন করে? 

এই ক্ষেত্রে রথকে জীবন দর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবা যেতে পারে। রথ আমাদের দেহ। আর সেই দেহকে চালনা করে আমাদের বুদ্ধি ও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের তালমিল। রথী হলো আমাদের আত্মা। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, মানুষের মৃত্যু হলেও আত্মার অবিনশ্বর। তার কেবল এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তর ঘটে মাত্র। প্রতি বছর এই রথ ভেঙে ফেলা আবার তা পরের বছর নতুন করে তৈরি করাও যেন সেই অনন্ত বিরামহীন চক্রের প্রতীক। তবে রথ ভেঙে ফেলা হলেও, তাতে উপস্থিত ঘোড়া বা দেবদেবীর মূর্তি ভাঙা হয় না। তা সযত্নে রেখে দেওয়া হয় মন্দিরেই।       

ভেঙে ফেলার পর কী কাজে ব্যবহার করা হয় সেই রথ? 

উল্টো রথের দিন জগন্নাথ চলে যান তাঁর নিজের ঘরে। আর এই দিকে তিন রথের সব কাঠ হুর হুর করে নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। মুখেভাত বা অন্নপ্রাশন ও বিয়ের সময় রথের কাঠে রান্না হয়। কোন মৃতদেহের সৎকার করতেও রথের কাঠ চিতা তৈরিতে ব্যবহার করতে দেখা যায়। কেউ বা আবার ভালো সাইজের কাঠ গুলো কেনেন বাড়ির ছাদে লাগানোর জন্য। বিশ্বাস এতে, জগন্নাথ সবসময় মাথার উপর বিরাজমান থাকবে। পুরীর মন্দিরে প্রসাদ রান্নাতেও এই কাঠ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এছাড়াও যে কোন শুভ কাজে উড়িষ্যাবাসী রথের কাঠ ব্যবহারের প্রথা রয়েছে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *