জানেন ঘাম থেকে কেন দুর্গন্ধ বের হয়? | Why does sweat smell bad scientific reasons and remedies
তীব্র দাবদাহ আর প্যাচপ্যাচে গরমে শরীরের দুর্গন্ধ অনেকের জন্যই এক মস্ত বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাসে, ট্রেনে বা ভিড়ে ঠাসা জায়গায় এই সমস্যায় নাজেহাল হতে হয় অনেককেই। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই দুর্গন্ধ আসলে কীভাবে তৈরি হয়? সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ শেয়ার করা একটি ভিডিওতে এক চিকিৎসক এর পেছনের আসল বিজ্ঞানটি খোলসা করেছেন। তাঁর দাবি— ঘামের নিজস্ব কোনো দুর্গন্ধ থাকে না! তাহলে কেন বগল বা পায়ের মোজা থেকে এত তীব্র গন্ধ বেরোয়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আসল খলনায়ক হল আমাদের ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়া।
কী বলছেন চিকিৎসক?
ভিডিওটিতে চিকিৎসক অভিষেক শুক্লা জানান, আমাদের ত্বকে প্রাকৃতিকভাবেই লাখ লাখ ব্যাকটেরিয়া বাস করে। অন্যদিকে, শরীর থেকে যে ঘাম বেরোয়, তা মূলত লবন-জল ছাড়া আর কিছুই নয়। আসল খেলাটি শুরু হয় তখনই, যখন এই ব্যাকটেরিয়াগুলো ত্বকে থাকা ফ্যাট (চর্বি) এবং প্রোটিনকে নিজেদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সময় এক ধরণের রাসায়নিক উপজাত বা কেমিক্যাল প্রোডাক্ট তৈরি হয়, যা আমাদের শরীরে দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে।
এই গন্ধ কতটা তীব্র হবে, তা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে,
১. আপনার শরীরে কোন ধরণের ঘর্মগ্রন্থি (Sweat Gland) বেশি সক্রিয়।
২. আপনার ত্বকে ঠিক কোন প্রকৃতির ব্যাকটেরিয়া উপস্থিত রয়েছে।
৩. আপনার জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং চারপাশের পরিবেশ কেমন।
চিকিৎসকের মতে, আমাদের শরীরে মূলত দুই ধরণের ঘর্মগ্রন্থি থাকে, যার কার্যকারিতাও ভিন্ন।
এক্রাইন গ্রন্থি (Eccrine Glands):
আমাদের শরীরের খোলা অংশ, যেমন— মুখ, হাতের তালু এবং কপালে এই ধরণের ঘর্মগ্রন্থি থাকে। এগুলো কেবল জল ও লবণের মিশ্রণে ঘাম তৈরি করে। খুব গরমেও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই ঘাম সাহায্য করে। ত্বকে এই ঘাম জমলে তা বাষ্প হয়ে উড়ে যায় এবং শরীরের অতিরিক্ত তাপ সঙ্গে নিয়ে যায়। এর ফলে শরীর ঠান্ডা থাকে। এই কারণেই কপাল বা হাতের তালুর ঘাম থেকে সাধারণত কোনও দুর্গন্ধ ছড়ায় না।
অ্যাপোক্রাইন গ্রন্থি (Apocrine Glands)
এই ধরণের ঘর্মগ্রন্থি সাধারণত আমাদের বগল এবং কুঁচকির মতো ঢাকা অংশগুলোতে থাকে। শৈশব পেরিয়ে মানুষ যখন কৈশোর বা যৌবনে পদার্পণ করে, তখন এই গ্রন্থিগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার ফলেও এই গ্রন্থিগুলো তীব্রভাবে সক্রিয় হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শরীরের এই অংশগুলোর ঘাম বেশ ঘন হয় এবং এতে প্রোটিন ও ফ্যাটের পরিমাণও অনেক বেশি থাকে। ফলে, ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো খুব সহজেই সেখান থেকে নিজেদের খাবার পেয়ে যায় এবং দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এই প্রক্রিয়াই মূলত শরীরে তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত রাসায়নিক তৈরি করে।
চিকিৎসক অভিষেক শুক্লা জানান, আমাদের ত্বকে থাকা ‘স্ট্যাফিলোকক্কাস’ (Staphylococcus) এবং ‘করিনেব্যাকটেরিয়াম’ (Corynebacterium) নামের ব্যাকটেরিয়াগুলো ঘন ঘামকে ভেঙে ফেলে। এই ভাঙনের ফলে ‘প্রোপিওনিক অ্যাসিড’ (Propionic Acid) উৎপন্ন হয়, যা অত্যন্ত ঝাঁঝালো ও তীব্র দুর্গন্ধের আসল কারণ। আপনি যদি অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকেন, তবে তা অ্যাপোক্রাইন গ্রন্থিকে আরও বেশি উত্তেজিত করে তোলে এবং শরীরের দুর্গন্ধ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক জীবনযাত্রা ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখে শরীরের এই অস্বস্তিকর দুর্গন্ধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। গ্রীষ্মের এই মরশুমে ডায়েট থেকে অতিরিক্ত পেঁয়াজ, রসুন এবং বেশি মশলাদার খাবার বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। কারণ, এই ধরণের খাবার ঘামের গন্ধকে আরও উগ্র করে তোলে। প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়া এবং সুতির হালকা পোশাক পরার পাশাপাশি মানসিক চাপ মুক্ত থাকাই এই সমস্যা থেকে মুক্তির সহজ চাবিকাঠি।