Jhatka Meat: ঝটকা মাংস আসলে কী? ঝটকা মাংসের স্বাদ কি অন্য মাংসের তুলনায় ভালো? | Jhatka meat benefits and taste difference Bengali, Details About Jhatka Meat
রবিবারের অলস দুপুরে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের পাড়ে কষা মাংসের বাটি— ভোজনরসিক বাঙালির জীবনে এর চেয়ে বড় সুখ আর বোধহয় খুব কমই আছে। কিন্তু মাংসের সেই টুকরোটি কড়াইয়ে পড়ার আগে কীভাবে কাটা হয়েছিল, তা নিয়ে কি কখনও ভেবেছেন? সুপারমার্কেট বা রেস্তোরাঁয় ‘হালাল’ শব্দের পাশাপাশি আরও একটি শব্দ প্রায়শই আমাদের নজর কাড়ে, সেটি হল ‘ঝটকা’। বাজারে তো মাংসের হোম ডেলিভারির জন্য ঝটকা অ্যাপও রয়েছে। তবে কখনই কি ভেবেছেন, এই ঝটকা আসলে কি? শুধু কাটার কায়দাতেই কি এর মহিমা শেষ, নাকি স্বাদেও হয় রকমফের ? আসুন খোঁজ নেওয়া যাক সেই স্বাদ, বিজ্ঞান আর ঝটকার ইতিহাসের।
কোথা থেকে এল এই ঝটকা?
ব্য়াপারটা একটু বিশদে বলা যাক। ঝটকা শব্দের শিকড় লুকিয়ে আছে সংস্কৃত ‘ঝটিতি’ শব্দের ভেতরে, যার সহজ অর্থ ‘তৎক্ষণাৎ’ বা ‘এক পলকে’। সহজ কথায়, কোনও রকম দীর্ঘায়িত প্রক্রিয়া বা ধীর গতির রক্তক্ষরণ ছাড়া, এক কোপেই চোখের পলকে পশুর প্রাণহীন করাকে ‘ঝটকা’ বলা হয়। আর এর ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সপ্তদশ শতকের পাঞ্জাবে, গুরু গোবিন্দ সিং-এর সময়ে। শিখ ধর্মে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে যে নিজস্ব অনুশাসন রয়েছে, তারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হল এই ঝটকা মাংস। সেই সময়ে প্রচলিত ধীর গতিতে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে পশু জবাই করার রীতির বিপরীতে গিয়ে শিখ গুরুরা এই তাৎক্ষণিক পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করেছিলেন। এর পেছনে মূলত দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, কোনও পশুকে তিলে তিলে মারার অমানবিক কষ্ট থেকে রেহাই দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, ঈশ্বরের নামে কোনও পশুকে উৎসর্গ করার ধর্মীয় আচার বা বলিদানের বিরোধিতা করা। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলেও শিখরা নিজেদের এই অধিকার বজায় রাখতে আইনি লড়াই লড়েছেন। এমনকি ১৯৪২ সালে পাঞ্জাবের তৎকালীন সরকারের সঙ্গে আকালিদের যে চুক্তি হয়, সেখানেও শিখদের জন্য ঝটকা মাংসের আইনি স্বীকৃতি অন্যতম শর্ত ছিল।
তবে বিশ্বখ্যাত খাদ্য বিজ্ঞানী হ্যারল্ড ম্যাকগি তাঁর The Flavor of Meat and Meat Products বইটিতে সরাসরি কোনও ধর্মীয় রীতির পক্ষপাত না করে, পশু জবাইয়ের সময় তার মানসিক চাপ (Stress) কীভাবে মাংসের স্বাদে প্রভাব ফেলে তা বৈজ্ঞানিক নিখুঁত ব্যাখ্যা করেছেন। ম্যাকগি দেখিয়েছেন যে, কোনও পশুকে যখন দীর্ঘক্ষণ ধরে বা যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতিতে মারা হয়, তখন ভয়ের কারণে তার পেশিতে থাকা গ্লাইকোজেন দ্রুত ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়ে যায়। এর ফলে মাংসের পিএইচ স্তর দ্রুত নেমে যায়, যা মাংসকে ফ্যাকাসে, নরম (Pale, Soft, Exudative – PSE) অথবা অতিরিক্ত শক্ত ও শুকনো (Dark, Firm, Dry – DFD) করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, ঝটকা পদ্ধতির মতো যেখানে ‘তাৎক্ষণিক মৃত্যু’ ঘটে, সেখানে পশুর শরীরে এই স্ট্রেস হরমোন বা ল্যাকটিক অ্যাসিড জমা হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে মাংসের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা, স্বাদ (Flavor Profile) এবং রান্নার পর তার জুসিনেস (Juiciness) অক্ষুণ্ণ থাকে। ভোজনরসিকরা যে ঝটকা মাংসের আলাদা স্বাদের কথা বলেন, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি মূলত এটাই।
তাই প্লেটের ধোঁয়া ওঠা মাংসের সেই টুকরোটি কেবল একটি রেসিপি বা রসনাতৃপ্তির মাধ্যম নয়, বরং তার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে শতাব্দীর প্রাচীন ইতিহাস, মানুষের ধর্মীয় অধিকারের লড়াই আর চমৎকার এক বৈজ্ঞানিক সত্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খাদ্যাভ্যাস পাল্টাচ্ছে, বিশ্বায়নের যুগে সুপারমার্কেটের কাউন্টারে মাংসের গায়ে সেঁটে দেওয়া হচ্ছে নানা লেবেল। তবে পাত পেড়ে আহার করার সময়ে যদি জানা থাকে যে পেছনের গল্পটা ঠিক কী, তবে সেই স্বাদের পরিধিটা যেন আরও কিছুটা বিস্তার লাভ করে।
Food, Feasts, and Faith: An Encyclopedia of Food Culture in World Religions, Paul Fieldhouse
Food and Power: Expressions of Food-Politics in South Asia, K. Mukhopadhyay
The Sikh Religion: Its Gurus, Sacred Writings and Authors, Max Arthur Macauliffe