সম্মোহনী ভূতকে কুর্নিশ, স্টোরি তৈরির গল্প - 24 Ghanta Bangla News
Home

সম্মোহনী ভূতকে কুর্নিশ, স্টোরি তৈরির গল্প

Spread the love

হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়

অফিসে প্রধান সম্পাদকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছেন কুমার শানু। দেখা করাতে নিয়ে গেলেন গৌতম ভট্টাচার্য। গল্পটা গৌতমদার মুখেই শোনা।

বলিউড ইন্ডাস্ট্রি, হিন্দি ফিল্ম, তার মিউজ়িক ইত্যাদি নিয়ে অনেক কিছু বলে গেলেন সম্পাদক মহাশয়। শানু যারপরনাই ইমপ্রেসড। বলে ফেললেন, ‘বাবা, আপনি এত ফিল্ম দেখেন নাকি!’ সম্পাদকের সপ্রতিভ জবাব, ‘না না। আমি গত ২০ বছর বাংলা-হিন্দি কিছুই দেখিনি। শুধু হলিউড দেখি।’ এ কথায় যারপরনাই বিস্মিত শানুর মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল, ‘ও আপনি না দেখেই এত কিছু বুঝে ফেললেন?’ পাশে বসে কিঞ্চিৎ বিব্রত বোধ করলেন গৌতমদা। উদাসীনতাই বর্ম আমাদের ‘বস্‌’-এর। তাই তাঁর কোনও তাপোত্তাপ হলো না। মুচকি হাসলেন।

সে হেন অভীক সরকার মধ্য এপ্রিলের (২০১২) এক মধ্যাহ্নে হঠাৎ তাঁর ঘরে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘অনীক দত্ত একটা ফিল্ম বানিয়েছে। দেখেছ? ভূতের ভবিষ্যৎ।’ বললাম, ‘না দেখিনি। তবে জেনেছি ছবিটা বেশ সেরিব্রাল। দর্শক নিচ্ছেন।’ ওঁর পরামর্শ, ‘অবশ্যই দেখবে। একবার নয় একাধিকবার।’ এবং তার পরে বললেন, ‘আমি এই ফিল্মটাকে অ্যাকনলেজ করতে চাই। ফ্রন্ট পেজে বড় করে। কিন্তু আমি গড়পড়তা রিভিউ চাই না। কে লিখতে পারবে?’

সত্যি বলতে কি, উনি ঠিক কী চাইছেন বুঝতে পারিনি তখনই। তবে বললাম, ‘এই লেখা ঠিকঠাক ভাবে কেউ করতে পারলে, সেটা গৌতম চক্রবর্তী পারবে। আমার কনফিডেন্স আছে।’

গৌতমকে নিউজরুম থেকে ডেকে আনলাম। টি.এস. এলিয়ট খ্যাত জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক–এর মতো রোল করা ট্রাউজার্স পরে ধীর পদক্ষেপে ঘরে বিশাল গোল টেবিলের একটি চেয়ারে বসতেই অভীকবাবু ওকে বললেন, ‘শোনো, লেখাটায় আমি কী চাই, তোমাকে আগে বুঝতে হবে। ফিল্মটা কেমন হয়েছে, তার বিশ্লেষণ চাই না। কে কেমন অভিনয় করল, সে সবও নয়। লেখাটার মাধ্যমে আমি বুঝতে ও বোঝাতে চাই, এক অচেনা পরিচালকের প্রথম কাজ কেন ও কী ভাবে বাঙালি সমাজকে আলোড়িত করল।’

‘আলোড়িত’ তো বটেই। যখন এই সব আলোচনা হচ্ছে, ততদিনে বিজ্ঞাপন ও প্রচারের ঘনঘটা ছাড়াই ছয় সপ্তাহ রমরম করে চলছে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’। শনি–রবিবার হাউসফুল হচ্ছে। অন্য দিনেও হল প্রায় ৮০ শতাংশ ভর্তি। কলকাতা কাঁপিয়ে পাড়ি দিচ্ছে দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু।

সম্পাদকের ব্রিফিং শুনে ‘চেষ্টা করছি’ বলে বিদায় নিল গৌতম, এবং পরবর্তী সাতদিন ধরে, যাকে বলে, প্রবল ধস্তাধস্তি চলল সেই স্টোরি নিয়ে। কিছুতেই লেখা পছন্দ হচ্ছে না ওঁর। ঠিক যা চাইছিলেন, সেটা হচ্ছে না। গৌতমের নিজের স্মৃতিচারণ, ‘১৪ বছর আগের কথা। যতদূর মনে পড়ছে, বার পাঁচেক লিখিয়েছিলেন উনি। বারবারই একটু রিভিউ–ঘেঁষা হয়ে যাচ্ছিল লেখাটা।’

অবশেষে যে লেখা ওঁর মনঃপূত হলো, সেটা প্রকাশিত হলো রবিবার, ২৯ এপ্রিল। প্রথম পাতার অনেকখানি জুড়ে ‘ফ্লায়ার’ হয়ে। শিরোনাম—ভূতেই ভবিষ্যৎ বাঙালির, দেখাল ব্যতিক্রমী ছবির বেনজির সাফল্য। একটা ফিল্মের এমন সার্বিক সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বাংলা সংবাদমাধ্যমে অন্তত হয়নি। মাস ছয়েক আগে এক কথোপকথনে অনীক বলেছিলেন, সে দিন তিনি অভিভূত হয়েছিলেন। একজন পরিচালকের কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি কী হতে পারে!

স্টোরির অন্বেষণে কী-কী উঠে এসেছিল? মেধাবী, নাগরিক উইট। অনেক দিন পরে প্রাণ খুলে হাসার মতো ফাটাফাটি ডায়ালগ। এমন কিছু ওয়ান লাইনার যা প্রথম বার মিস করে যাওয়ার পরে সে গুলো শুনতে দ্বিতীয় বার টিকিট কাটতে হচ্ছে। সংলাপে ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ থাকার যাবতীয় বাঙালি হিসেব এক ধাক্কায় তছনছ করার সাহস। অনাবিল আনন্দের মধ্যে ভাবনার রসদ। উচ্চবিত্তের ড্রইংরুম পেরিয়ে ইনক্লুসিভ হওয়ার বার্তা।

গণেশ ভূতোড়িয়ার প্রোমোটিং কোম্পানির নাম মনে আছে তো? ম্যাজিক রিয়েলটি। প্রতীকী। অনীক দত্তর ম্যাজিক রিয়্যালিজ়ম আজও সম্মোহিত করে রেখেছে বাঙালিকে। রাখবেও।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *