মাঠে 'নতুন' হয়েও জয় নিয়ে আশাবাদী প্রার্থীরা
দিব্যেন্দু সরকার, আরামবাগ
মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার ঠিক আগের মুহূর্তে ছাত্রছাত্রীদের যে অবস্থা হয়, ঠিক সেই অবস্থাই হয়েছে নির্বাচনে লড়াইয়ের একেবারে নতুন প্রার্থীদের। রাজনৈতিক জীবনে বৈতরণী পার হওয়ার টেনশনেই রয়েছেন প্রার্থীরা। পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদদের কথা ছেড়ে দিলেও, যাঁরা এ বারে নতুন প্রার্থী, তাঁরা কোন মুডে আছেন, কী করলেন সারা দিন, সেই খোঁজই নিল ‘এই সময়’।
হুগলির আরামবাগ মহকুমায় চার বিধানসভায় এ বার প্রার্থী হিসেবে নবাগতদের রমরমা। আরামবাগ বিধানসভায় তৃণমূলের প্রার্থী মিতা বাগ, আবার বিজেপির প্রার্থী হেমন্ত বাগ, দু’জনেই এ বারে নতুন মুখ। গোঘাটের বিজেপি প্রার্থী প্রশান্ত দিগারও একেবারেই নতুন মুখ। আর তৃণমূলের প্রার্থী নির্মল মাজি প্রার্থী হিসেবে নতুন নন, ঠিকই। আগে হাওড়ার উলুবেড়িয়ার দু’বারের বিধায়ক পদ সামলেছেন ।কিন্তু এ বার গোঘাটে তিনি নতুন মুখ। পুরশুড়ার তৃণমূল প্রার্থী পার্থ হাজারিও একেবারে নতুন মুখ। তিনি ভূমিপুত্রও। খানাকুলে তৃণমূলের পলাশ রায় নতুন মুখ। আইএসএফ প্রার্থী সাদ্দাম হোসেনও নতুন। বয়সেও তাঁরা নবীন। প্রতিবাদী।
আজ, সোমবার সকাল আটটা থেকেই গণনা শুরু। তার কয়েক ঘণ্টা আগে রবিবার গোঘাটের বিজেপি প্রার্থী প্রশান্ত দিগার সকাল থেকে বেশ মুক্ত মনেই ছিলেন। নো টেনশন। জেতার বিষয়ে সিংহভাগই নিশ্চিত। তাঁর মতে, বিজেপিই এ বার সরকার গঠন করছে। এ দিন তিনি কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠ, জয়রামবাটি মাতৃ মন্দির, তাঁর গ্রাম সেলামপুরের শিব মন্দির ও কাঁঠালি এলাকায় কালী মন্দিরে যান, পুজো দেন। মহারাজদের থেকে আশীবাদ নেন। সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ান। কর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন। প্রশান্ত বলেন, ‘বিজেপিই সরকার গঠন করছে। আর আমি ব্যক্তিগত ভাবেও জিতছি। তাই কর্মীদের বলেছি, হিংসা নয়। বিজেপি হিংসা চায় না। বিজেপি চায় দুর্নীতিমুক্ত, উদার রাজনীতি। যে কেউ যে কোনও দল করতেই পারেন। রাজনৈতিক মতাদর্শে আমরা পৃথক হলেও, দিনের শেষে আমরা মানুষ। তাই, মানুষ হয়ে মানুষের ক্ষতি চাই না। কর্মীদের বলেছি, সংযত থাকুন। আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা নিশ্চয়ই পালন করব।’
তৃণমূলের প্রার্থী নির্মল মাজিকে নিয়ে ইতিমধ্যে বিচ্ছিন্ন কিছু রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভোটের আগেই। উলুবেড়িয়ায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত হলেও, গোঘাট তাঁর কাছে নতুন মাটি। এ দিন তিনি বলেন, ‘আমাদের দিদিমনিই আবার চতুর্থ বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন। নিজের জেতার বিষয়ে নিশ্চিত। কাঁটাছেঁড়া চলছে। তবে আমি বলব, গোঘাটের উন্নয়নের কোনও খামতি থাকবে না।যা, যা বলেছি, সেগুলোই করব। তবে ফলাফলের আগে টেনশন থাকলেও, সেই ভাবে চাপ নেই। কর্মীদের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে।’
খানাকুলের আইএসএফ প্রার্থী সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘এ দিন সারাক্ষণই কর্মীদের সঙ্গে মিটিং করেছি। আশা করছি, ফল ভালোই হবে। আমাদের আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা রুখে দিয়েছি অনেক ক্ষেত্রে। তৃণমূল কিছু জায়গায় আমাদের ভোট সরিয়ে নিয়েছে। এখন দেখা যাক কী হয়। মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন, এটাই বড় কথা।’
আরামবাগের তৃণমূল প্রার্থী মিতা বাগও সকাল থেকে গৃহকর্মেই নিযুক্ত। কিন্তু দুপুরে নিজের জামাইবাবুর শারীরিক অসুস্থতার খবর পান।তাই তিনি চলে যান সেখানেই। তবে ফলাফলের আগের দিন টেনশন নেই তাঁর। তাঁর বক্তব্য, ‘আমিই জিতছি। মানুষ দিদিকে ভোট দিয়েছেন। মানুষ উন্নয়নকে ভোট দিয়েছেন। তাই দিদিই মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন। আর উন্নয়নের ঝড়ে সব বিরোধের চক্রান্ত ভেস্তে যাবে। খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। এই বাংলায় দিদিই হবেন শেষ কথা।’ রবিবার কর্মীদের সঙ্গেও আলোচনা হয় তাঁর। তিনি বলেন, ‘মানুষকে বলব, শান্ত থাকবেন। উন্নয়নের কথাটা মাথায় রাখবেন।’
অন্য দিকে, বিজেপির প্রার্থী হেমন্ত বাগ বলেন, ‘রবিবার কিছুটা দলীয় কর্মসূচি করেছি। বাড়ির কিছু কাজ বাকি ছিল। সেগুলো করেছি পুজো দিয়েছি। পরিবারের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে আনন্দেই ছিলাম। কোনও টেনশন নেই। কারণ, বিজেপিই সরকার গঠন করছে। এটা যেমন একশো শতাংশ নিশ্চিত, তেমনই আরামবাগ বিধানসভায় আমিই জিতছি।’ পুরশুড়ার তৃণমূল প্রার্থী পার্থ হাজারিও একেবারে নতুন মুখ। তাঁর আশা, তিনি ভূমিপুত্র। আর এলাকার মানুষ ভূমিপুত্রকেই চেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রায় ২৪ হাজার ভোটে পিছিয়েছিল। আর ২০২১-এ বিজেপি ২৮ হাজারের কিছু বেশি ভোটে জিতেছিল। এত পরিমাণ ঘাটতি কোন ম্যাজিকে পূরণ করে জিতবেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পার্থ বলেন, ‘আমি ভূমিপুত্র। প্রতিটি এলাকায় বাড়ি বাড়ি ঘুরেছি। সেখানে মানুষের যেভাবে সাড়া পেয়েছি, যে ভাবে মানুষ আশীর্বাদ করেছেন, তাতে আমি নিশ্চিত, আমিই জিতছি।’
অন্য দিকে, এ বারে হুগলির সবচেয়ে আকর্ষণীয় কেন্দ্র ছিল তারকেশ্বর। সেখানে একেবারে তরুণ, লড়াকু সাংবাদিক সন্তু পান এ বারে একেবারে নতুন মুখ। তাঁর বক্তব্য, তিনিই জিতছেন। কোন ম্যাজিকে জিতবেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সন্তু বলেন, ‘মানুষের ভালোবাসার ম্যাজিকই বলে দিচ্ছে, আমি জিতছি। আমি ঈশ্বরকে, তারকনাথকে ও নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ দেবো, কারণ তাঁরা রক্তক্ষয়ী নির্বাচন করতে দেননি। আমি এখানে পাঁচটি মন্দিরে পুজো দিয়েছি। খোশ মেজাজেই আছি। কর্মীদের বলেছি, কোনও হিংসা নয়। হিংসামুক্ত সমাজ, হিংসামুক্ত সরকার গড়ব। অথচ তৃণমূল বলেছে, এখানে শুধু মার হবে। আমরা সেটা চাই না। বিজেপি মারদাঙ্গা চায় না। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন যেমন হয়েছে, ভোট পরবর্তীতেও যেন কোনও অশান্তি না হয়। আমি করতে দেবো না।’