বাংলার ফুটবলের নতুন বিস্ময়? মুখোমুখি আরএফডিএলের সর্বোচ্চ গোলদাতা তানবীর দে - 24 Ghanta Bangla News
Home

বাংলার ফুটবলের নতুন বিস্ময়? মুখোমুখি আরএফডিএলের সর্বোচ্চ গোলদাতা তানবীর দে

Spread the love

নদিয়ার অরনঘাটা থেকে উঠে এসে RF Development League-এ ১৮ গোল। গোল্ডেন বুট জিতে ভারতীয় ফুটবলে নতুন আশার নাম তানবীর দে।

বিট্টু দত্ত, কলকাতা: নদিয়ার অরনঘাটা থেকে উঠে এসে ভারতীয় ফুটবলে নতুন স্বপ্নের নাম তানবীর দে। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন ডেভেলপমেন্ট লিগে ১৮ গোল করে জিতেছেন গোল্ডেন বুট। নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেডের এই তরুণ স্ট্রাইকার খেলেছেন ভারতীয় অনূর্ধ্ব-২০ দলেও। সংগ্রাম, পরিশ্রম আর সাফল্যের গল্প নিয়ে খোলামেলা আলোচনায় তানবীর দে।

প্রশ্ন ১: রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন ডেভেলপমেন্ট লিগে সর্বোচ্চ ১৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতার অনুভূতি কেমন?

তানবীর দে: এই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা খুব কঠিন। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম বড় মঞ্চে নিজের নাম তুলে ধরার, আর আজ সেই স্বপ্নের একটা বড় অংশ পূরণ হয়েছে। গোল্ডেন বুট জেতা শুধু ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়, এটা আমার পরিশ্রম, কোচদের বিশ্বাস, সতীর্থদের সহযোগিতা এবং পরিবারের ত্যাগের স্বীকৃতি। ১৮ গোল করতে গেলে শুধু ফিনিশিং নয়, ধারাবাহিকতা, আত্মবিশ্বাস আর মানসিক দৃঢ়তাও দরকার হয়। পুরো মরশুমে আমি চেষ্টা করেছি প্রতিটি ম্যাচে দলের জন্য অবদান রাখতে। যখন শেষ ম্যাচের পর জানলাম আমি সর্বোচ্চ গোলদাতা, তখন প্রথমেই বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে। তাঁদের কষ্ট না থাকলে আজ এখানে পৌঁছতে পারতাম না। এই পুরস্কার আমাকে আরও বড় লক্ষ্য দেখাচ্ছে। এখন চাই আগামী দিনে আরও ভালো খেলতে, দেশের জার্সিতে নিয়মিত সুযোগ পেতে এবং বাংলার নাম আরও উজ্জ্বল করতে।

প্রশ্ন ২: নদিয়ার অরনঘাটার মতো জায়গা থেকে উঠে এসে এই সাফল্য পাওয়ার পথটা কতটা কঠিন ছিল?

তানবীর দে: ছোট শহর বা গ্রামাঞ্চল থেকে উঠে আসা ফুটবলারদের জন্য পথটা সবসময় সহজ হয় না। বড় শহরের মতো সুযোগ-সুবিধা, আধুনিক ট্রেনিং ব্যবস্থা বা নিয়মিত প্রতিযোগিতা সবসময় পাওয়া যায় না। অরনঘাটায় ছোটবেলায় মাঠে খেলেই ফুটবলের প্রেমে পড়ি। তখন বুঝতাম না ভবিষ্যতে কী হবে, শুধু বল নিয়ে মাঠে নামতে ভালো লাগত। পরে যখন বুঝলাম ফুটবলকেই পেশা করতে চাই, তখন অনেক চ্যালেঞ্জ এসেছে। অনুশীলনের জন্য দূরে যেতে হয়েছে, পড়াশোনা সামলে সময় বের করতে হয়েছে, শারীরিক ক্লান্তি সামলাতে হয়েছে। অনেক সময় অর্থনৈতিক চাপও ছিল। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, যদি কঠোর পরিশ্রম করি তাহলে সুযোগ আসবেই। আমার পরিবারও কখনও হাল ছাড়তে দেয়নি। আজ যখন মানুষ আমার নাম জানছে, তখন মনে হয় সেই কষ্টগুলোই আমাকে শক্ত করেছে। আমি চাই আমার মতো ছোট জায়গার ছেলেরা বুঝুক—স্বপ্ন দেখলে আর লড়াই করলে সাফল্য সম্ভব।

প্রশ্ন ৩: নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেডের হয়ে খেলে এই মরশুমে কী কী শিখলেন?

তানবীর দে: নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেডে খেলা আমার ক্যারিয়ারের খুব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে এসে বুঝেছি পেশাদার ফুটবলের মানসিকতা কতটা আলাদা। শুধু প্রতিভা থাকলেই হয় না, প্রতিদিন নিজেকে উন্নত করতে হয়। ক্লাবে কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে ফিটনেস ট্রেনার, সবাই খেলোয়াড়দের উন্নতির জন্য কাজ করেন। আমি এখানে ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিন অনেক শিখেছি—কখন প্রেস করতে হবে, কখন স্পেসে দৌড়াতে হবে, কখন বল ধরে রাখতে হবে। এছাড়া ফিনিশিং নিয়েও আলাদা কাজ হয়েছে। আগে হয়তো সুযোগ তৈরি করতাম, কিন্তু এখন বুঝি কীভাবে ঠান্ডা মাথায় গোল করতে হয়। দলের সিনিয়ররাও অনেক সাহায্য করেছেন। তারা ম্যাচের চাপ কীভাবে সামলাতে হয়, সেটাও শিখিয়েছেন। এই মরশুম আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে যে আমি বড় স্তরেও পারফর্ম করতে পারি। একই সঙ্গে বুঝিয়েছে, এখানেই থেমে গেলে চলবে না। আরও পরিশ্রম করলে ভবিষ্যতে বড় লিগে এবং জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন ৪: আপনার সাফল্যের পিছনে বাবা-মা ও পরিবারের ভূমিকা কতটা?

তানবীর দে: আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি আমার পরিবার। বাবা-মা না থাকলে আমি কখনও এই জায়গায় পৌঁছতে পারতাম না। ছোটবেলায় যখন অনুশীলনে যেতাম, তখন অনেক কষ্ট করে তাঁরা সব সামলেছেন। অনেক সময় নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়ে আমার বুট, জার্সি, যাতায়াতের খরচ জুগিয়েছেন। যখন খারাপ সময় গেছে, দলে সুযোগ পাইনি বা খারাপ খেলেছি, তখনও তাঁরাই পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাবা সবসময় বলতেন, পরিশ্রম করলে ফল একদিন আসবেই। মা মানসিকভাবে আমাকে ভীষণ শক্তি দেন। ম্যাচের আগে আশীর্বাদ করেন, খারাপ খেললে সাহস দেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। অনেকেই শুধু সাফল্য দেখে, কিন্তু এর পিছনে পরিবারের ত্যাগ কেউ দেখে না। আমি প্রতিটা গোল করার পর মনে মনে তাঁদেরই ধন্যবাদ জানাই। ভবিষ্যতে যদি আরও বড় কিছু করতে পারি, সেটাও তাঁদের জন্যই হবে। আমার সাফল্য আসলে পুরো পরিবারের সাফল্য।

প্রশ্ন ৫: একটি এজেন্সি সংস্থার সহায়তার কথা বলেছেন। তারা কীভাবে সাহায্য করেছে?

তানবীর দে: বর্তমান ফুটবলে শুধু মাঠে ভালো খেললেই হয় না, সঠিক দিশা পাওয়াও খুব জরুরি। সেই জায়গায় এজেন্সি সংস্থার ভূমিকা আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। তারা আমার ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, সঠিক ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ, সুযোগ তৈরি করা এবং পেশাদার পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। একজন তরুণ ফুটবলারের অনেক সময় বোঝা কঠিন হয় কোন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে। তারা সেই জায়গায় পরামর্শ দিয়েছে। শুধু চুক্তি বা সুযোগের বিষয় নয়, মানসিক প্রস্তুতি, শৃঙ্খলা, মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলা—এসব বিষয়েও সাহায্য করেছে। অনেক সময় খেলোয়াড়রা মাঠের বাইরে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে পিছিয়ে পড়ে। আমি ভাগ্যবান যে এমন কিছু মানুষ পেয়েছি যারা আমার উন্নতি চেয়েছে। অবশ্যই শেষ পর্যন্ত মাঠে আমাকে খেলতে হয়েছে, কিন্তু সঠিক পথে এগোতে এই সহায়তা অনেক মূল্যবান। ভবিষ্যতেও আমি চাই তাঁদের সঙ্গে কাজ করে আরও বড় স্তরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে।

প্রশ্ন ৬: সাফ কাপ অনূর্ধ্ব-২০ রানার্সআপ ভারতীয় দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

তানবীর দে: দেশের জার্সি গায়ে চাপানো যেকোনো ফুটবলারের কাছে সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয়। যখন প্রথমবার ভারতীয় অনূর্ধ্ব-২০ দলে সুযোগ পেলাম, তখন মনে হয়েছিল জীবনের একটা বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। জাতীয় দলের পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা—এখানে প্রত্যেক খেলোয়াড়ই দেশের সেরাদের মধ্যে একজন। প্রতিযোগিতা খুব বেশি, কিন্তু শেখার সুযোগও অসাধারণ। সাফ কাপে খেলতে গিয়ে বুঝেছি আন্তর্জাতিক ফুটবলে গতি, শারীরিক শক্তি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। রানার্সআপ হওয়ার কষ্ট অবশ্যই ছিল, কারণ আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে চেয়েছিলাম। তবে সেই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও ক্ষুধার্ত করেছে। দেশের জন্য খেললে দায়িত্ববোধ আলাদা থাকে। স্টেডিয়ামে জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর মুহূর্তটা আজও ভুলতে পারি না। আমি চাই ভবিষ্যতে সিনিয়র ভারতীয় দলে খেলতে, দেশের হয়ে গোল করতে এবং বড় টুর্নামেন্টে সাফল্য এনে দিতে। এই স্বপ্নই আমাকে প্রতিদিন অনুপ্রাণিত করে।

প্রশ্ন ৭: একজন স্ট্রাইকার হিসেবে নিজের খেলায় কোন দিকগুলো আরও উন্নত করতে চান?

তানবীর দে: আমি বিশ্বাস করি একজন ফুটবলারের শেখার শেষ নেই। এই মরশুমে গোল করেছি ঠিকই, কিন্তু এখনও অনেক জায়গায় উন্নতির সুযোগ আছে। প্রথমত, ফিনিশিং আরও ধারালো করতে চাই। সব সুযোগকে গোলে পরিণত করার ক্ষমতা বড় স্ট্রাইকারদের আলাদা করে। দ্বিতীয়ত, হেডিং এবং বক্সের ভিতরে পজিশনিং আরও ভালো করতে চাই। অনেক সময় সঠিক জায়গায় থাকলে সহজ গোল পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, বল ছাড়া দৌড় এবং ডিফেন্ডারদের পিছনে স্পেস তৈরি করার কাজ আরও উন্নত করতে হবে। আধুনিক ফুটবলে স্ট্রাইকারকে শুধু গোল করলেই হয় না, দল গঠনের কাজেও ভূমিকা রাখতে হয়। তাই পাসিং, লিঙ্ক-আপ প্লে এবং প্রেসিং নিয়েও কাজ করছি। এছাড়া শারীরিক শক্তি ও গতি বাড়ানোও জরুরি। আমি চাই প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে উন্নত করতে। কারণ আজকের সাফল্য আগামীকালের নিশ্চয়তা নয়। ধারাবাহিক উন্নতিই আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

প্রশ্ন ৮: বাংলার তরুণ ফুটবলারদের জন্য আপনার বার্তা কী?

তানবীর দে: আমি শুধু একটা কথাই বলতে চাই—স্বপ্ন দেখো এবং সেই স্বপ্নের জন্য লড়াই করো। বাংলায় প্রতিভার অভাব নেই, দরকার সঠিক মানসিকতা আর ধারাবাহিক পরিশ্রম। অনেক সময় আমরা দ্রুত ফল চাই, কিন্তু ফুটবলে সাফল্য পেতে সময় লাগে। খারাপ ম্যাচ হবে, বাদ পড়তে হবে, সমালোচনা হবে—এসবই যাত্রার অংশ। তাই হতাশ না হয়ে কাজ করে যেতে হবে। কোচদের সম্মান করতে হবে, ফিটনেসের দিকে নজর দিতে হবে, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন করতে হবে। শুধু মাঠে ভালো খেললেই হবে না, মাঠের বাইরেও পেশাদার হতে হবে। আমি ছোট জায়গা থেকে উঠে এসে যদি এই পর্যায়ে পৌঁছতে পারি, তাহলে বাংলার আরও অনেক ছেলে পারবে। নিজের উপর বিশ্বাস রাখো, সুযোগ এলে প্রস্তুত থাকো। আর কখনও নিজের শিকড় ভুলে যেও না। বাংলার ফুটবল আবার বড় জায়গায় ফিরুক, এটাই আমার স্বপ্ন।

Read More

ঘরের মাঠে গুজরাটের জয়, শীর্ষে উঠতে পারল না বেঙ্গালুরু

ফাস্ট বোলার গড়ার বড় উদ্যোগ ! প্রজেক্ট ‘গতিতে’ গতি পাবে বাংলার ক্রিকেট?

বিশ্ব বিলিয়ার্ডস চ্যাম্পিয়ন সৌরভ কোঠারি, বাবাকে উৎসর্গ আবেগঘন জয়

ভিডিও নিউজ দেখুন

https://www.youtube.com/watch?v=videoseries

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *