EXPLAINED: শরীর, প্রেম… কীভাবে ISI-এর চক্রব্যূহে পড়েছিলেন ভারতীয় কূটনীতিক মাধুরী? – Bengali News | In Depth: how ex diplomat Madhuri Gupta turned ‘spy’ for Pakistan’s ISI?
কীভাবে পাকিস্তানের চর হয়ে উঠেছিলেন কূটনীতিক মাধুরী গুপ্তা?Image Credit source: TV9 Bangla
নয়াদিল্লি: ঘরশত্রু বিভীষণ। সরষের মধ্যে ভূত। ভারতের কূটনীতিকই যখন পাকিস্তানের আইএসআইয়ের হাতে গোপন তথ্য তুলে দেন, তখন তাঁকে কী বলা যায়? পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ইউটিউবার জ্যোতি মালহোত্রা-সহ কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর ১৫ বছর আগে ধৃত এক কূটনীতিকের কাহিনি ফের আলোচনার শিরোনামে। ১৫ বছর আগে ধৃত ওই কূটনীতিকের নাম মাধুরী গুপ্তা। ভারতের কূটনীতিক থেকে কীভাবে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের গুপ্তচর হয়ে উঠলেন তিনি? কোন প্রলোভনে পা দিয়েছিলেন? কীভাবে ধরা পড়লেন তিনি?
২০১০ সালের এপ্রিলের গোড়ার দিক। তখনও ২৬/১১ মুম্বই হামলার ভয়াবহ স্মৃতি টাটকা। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি)-র প্রধান তখন রাজীব মাথুর। ইসলামাবাদে ভারতীয় দূতাবাস থেকে তাঁর কাছে এল একটা খবর। যা শুনে প্রথমে চমকে উঠলেন তিনি। ইসলামাবাদের ভারতীয় দূতাবাসেরই এক আধিকারিক নাকি পাকিস্তানের আইএসআইয়ের কাছে ভারতের বিভিন্ন গোপন তথ্য পাঠাচ্ছেন। ওই আধিকারিকের সন্দেহজনক গতিবিধির ব্যাপারে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার পরই রিসার্চ ও অ্যানালিসিস উইংয়ের তৎকালীন প্রধান কেসি ভার্মাকে বিষয়টি জানালেন রাজীব মাথুর। জানানো হল তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব জিকে পিল্লাইকে। তারপর কীভাবে ধরা পড়লেন মাধুরী গুপ্তা? সেটাও একটা কাহিনি।
মাধুরী গুপ্তার ‘কীর্তি’-
ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের (IFS) গ্রেড বি অফিসার ছিলেন মাধুরী গুপ্তা। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। আইএফএস অফিসার হিসেবে ইরাক, লিবারিয়া, মালয়েশিয়া এবং ক্রোয়েশিয়া-সহ বিভিন্ন দেশে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০০৬-০৭ সালে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ছিলেন। তারপর ইসলামাবাদের ভারতীয় দূতাবাসের প্রেস ও ইনফরমেশনের সেকেন্ড সেক্রেটারির দায়িত্ব পান। আর সেখান থেকেই পাকিস্তানের আইএসআইয়ের ফাঁদে পড়েন তিনি।
কীভাবে আইএসআইয়ের চর হয়ে উঠলেন মাধুরী?
এই কাহিনি সিনেমার মতোই রোমাঞ্চকর। রোম্যান্সও রয়েছে। খুব ভাল উর্দু বলতে পারতেন মাধুরী। উর্দুতে স্কলারশিপও পেয়েছিলেন। সুফিবাদ ও কবিতায় আগ্রহী ছিলেন। সেটাই কাজে লাগিয়েছিল আইএসআই। প্রথমে এক মহিলা সাংবাদিককে কাজে লাগায় তারা। জঙ্গি নেতা মৌলানা মাসুদ আজহারের লেখা একটি বই খোঁজ করছিলেন মাধুরী। কিন্তু, পাচ্ছিলেন না। সেটাই তাঁকে পেতে সাহায্য করেন ওই পাকিস্তানি মহিলা সাংবাদিক। তারপর ধীরে ধীরে মাধুরীর সঙ্গে ওই মহিলা সাংবাদিকের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।
তখনই আসরে নামে পাকিস্তানের দুই এজেন্ট জামশেদ ও মুদাস্সর রাজা রানা। মাধুরীকে মধু-ফাঁদে ফেলেন পাকিস্তানি এজেন্ট জামশেদ। সেইসময় মাধুরীর বয়স ৫২ বছর। জামশেদ তাঁর চেয়ে অনেকটাই ছোট। তিরিশের কোঠায়। সুঠাম শরীর। জামশেদের প্রেমে পড়েন মাধুরী। পাকিস্তানি এই এজেন্টকে ভালবেসে ‘জিম’ বলে ডাকতেন। জামশেদের সঙ্গে মেইল ও ব্ল্যাকবেরি ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন ভারতীয় এই কূটনীতিক। মাধুরী তাঁর কাজের কথাও জানাতেন জামশেদকে। পাকিস্তানি এই এজেন্টকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন তিনি। এর জন্য ধর্মও পরিবর্তন করতে রাজি ছিলেন। ভালবাসার অভিনয় করে মাধুরীকে ফাঁদে ফেলার পর তাঁর কাছ থেকে গোপন তথ্য হাতাতে থাকেন পাকিস্তানি এজেন্ট। মাধুরীর ইমেইল থেকে জম্মু ও কাশ্মীরের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের তথ্যও পাঠানো হয়েছে পাকিস্তানের এজেন্টকে। এই তথ্য সংগ্রহে ২০১০ সালের মার্চে জম্মু ও কাশ্মীরে গিয়েছিলেন তিনি।
কীভাবে ধরা পড়লেন মাধুরী?
মাধুরীর ধরা পড়ার কাহিনিও যেন সিনেমার প্লট। ইসলামাবাদে ভারতীয় দূতাবাসে নিজের কাজ ছাড়াও অন্য বিষয়ে অযথা আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। যা দেখে সন্দেহ হয় দূতাবাসের কর্মীদের। তারপরই বিষয়টি জানানো হয়েছিল আইবি প্রধান রাজীব মাথুরকে। তিনি বিষয়টি জানান রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংয়ের তৎকালীন প্রধান কেসি ভার্মা ও তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব জিকে পিল্লাইকে।
এভাবে একজন কূটনীতিকের আইএসআইয়ের এজেন্ট হয়ে ওঠা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন সবাই। কিন্তু, ২ সপ্তাহ আরও নজরদারি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেইসময় ফাঁদও পাতা হয়। পরিকল্পিতভাবে একটা ভুয়ো তথ্য তাঁকে দেওয়া হয়। আর সেই তথ্য লিক হতেই মাধুরীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে দেরি করেনি সরকার।
ইসলামাবাদ থেকে তাঁকে দিল্লিতে ডাকা হয়। ২০১০ সালের শেষে ভুটানে SAARC সম্মেলন ছিল। মাধুরীকে সেই সম্মেলনে মিডিয়া রিলেশনে সাহায্য করার কথা বলে দিল্লিতে ডাকা হয়। ২০১০ সালের ২১ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে পৌঁছন মাধুরী। সেদিন রাতে পশ্চিম দিল্লিতে নিজের বাসভবনে কাটান। তখনও তিনি জানতে পারেননি, পরদিন কী অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য।
পরদিন সকালে সাউথ ব্লকে বিদেশ মন্ত্রকের অফিসে যান তিনি। সেখানে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল তাঁর জন্য অপেক্ষাই করছিল। মাধুরী সেখানে পৌঁছতেই ভারতের গোপন তথ্য পাকিস্তানের আইএসআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারী অফিসার পঙ্কজ সুদ জানান, ইসলামাবাদে ভারতীয় দূতাবাসের সমস্ত কর্মীর বায়োগ্রাফিক্যাল তথ্যও পাকিস্তানের এজেন্টের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মাধুরী।
২০১২ সালে তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম চার্জগঠন করা হয়। অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারায়। যাতে সর্বোচ্চ ১৪ বছর সাজা হয়। ২১ মাস তিহার জেলে ছিলেন তিনি। এরপর জামিন পান।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন মাধুরী। দাবি করেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফাঁসাচ্ছে। তাঁর যুক্তি অবশ্য ধোপে টেকেনি। ২০১৮ সালে দিল্লির নগর আদালত তাঁকে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দোষীসাব্যস্ত করে। ৩ বছর কারাদণ্ড দেয়। এর বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেন মাধুরী। ২০২১ সালের অক্টোবরে রাজস্থানের ভিওয়ান্ডিতে মৃত্যু হয় মাধুরীর। তখন তাঁর বয়স ৬৪ বছর। তখনও দিল্লি হাইকোর্টে তাঁর আবেদন ফয়সালার জন্য পড়েছিল।
একজন কূটনীতিকের এভাবে পাকিস্তানের এজেন্ট হয়ে ওঠা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল সেইসময়। এখন জ্যোতিরা পুলিশের জালে ধরা পড়ার পর মাধুরীর গুপ্তচরবৃত্তির সেই কাহিনি আবার সামনে এল। যার পরতে পরতে সাসপেন্স ও রোম্যান্স। ঠিক যেন কোনও সিনেমার কাহিনি।
