AI-তে বিপুল বিনিয়োগ Microsoft-এর, কর্মীদের ক্ষোভ বাড়ছে কেন? - 24 Ghanta Bangla News
Home

AI-তে বিপুল বিনিয়োগ Microsoft-এর, কর্মীদের ক্ষোভ বাড়ছে কেন?

Spread the love


নিউইয়র্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-তে বিপুল বিনিয়োগের পথে হাঁটছে Microsoft। কিন্তু সংস্থার একাংশের বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মীদের অভিযোগ, AI-কে কেন্দ্র করে এই পরিবর্তনের মূল্য দিতে হচ্ছে কর্মীদেরই। তাঁদের দাবি, Microsoft-এ কাজের পরিবেশ ক্রমশ আনন্দহীন ও হতাশাজনক হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত কাজের চাপ, ঘন ঘন সাংগঠনিক রদবদল এবং AI-এর কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা কর্মীদের মনোবলে প্রভাব ফেলছে।

এই পরিস্থিতিতে ‘Concerned Microsoft Workers’ নামে একটি গোষ্ঠী সংস্থার বিরুদ্ধে খোলা চিঠি প্রকাশ করেছে। অভিযোগ, কর্মী, গ্রাহক এবং পরিবেশগত প্রতিশ্রুতির কথা যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়েই AI-নির্ভর ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে Microsoft। সম্প্রতি প্রায় ৬০,০০০ কর্মীকে Voluntary Exit Offer বা স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়ার পর এই চিঠি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংস্থার ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় Buyout Offer বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

The New York Times-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর Buyout Offer ঘোষণার আগেই কর্মীদের মধ্যে চিঠিটি ছড়াতে শুরু করেছিল। চিঠিতে AI তৈরি এবং ব্যবহারের সিদ্ধান্তে কর্মীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি AI ব্যবহারের সঙ্গে পুরস্কার বা শাস্তির বিষয়টি যুক্ত না করারও আবেদন জানানো হয়েছে।

বাধ্যতামূলক AI ব্যবহারে বাড়ছে কাজের চাপ?

খোলা চিঠিতে কর্মীদের অভিযোগ, কাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে AI টুল ব্যবহার করতে উৎসাহিত বা বাধ্য করা হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে না। দ্রুত কাজ শেষ করার প্রয়োজন ছাড়া AI ব্যবহারের পিছনে স্পষ্ট কারণও জানানো হচ্ছে না বলে তাঁদের দাবি।

কর্মীদের বক্তব্য, এর ফলে নতুন নতুন AI টুল শেখার জন্য সময় দিতে হচ্ছে। আবার AI তৈরি করা ভুল বা নিম্নমানের ফলাফল সংশোধন করতে হচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে দুর্বল ফিচার চালুর পর সেগুলি আবার সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ছে। সব মিলিয়ে কাজের গতি বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন ধরনের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ।

চিঠিতে শুধু কর্মক্ষেত্রের সমস্যাই নয়, Microsoft-এর AI গবেষণা এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে। স্বাক্ষরকারীদের দাবি, সংস্থার নিজস্ব গবেষণাতেই AI Agent-এর ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘাটতি দেখা গিয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনার নথিতে মানুষকে AI পণ্যের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তোলার কৌশল নিয়েও আপত্তি তুলেছেন তাঁরা।

পরিবেশ ও সামরিক চুক্তি নিয়েও আপত্তি

Microsoft-এর কিছু গোপনীয় Data Centre প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কর্মীরা। পাশাপাশি মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা ICE এবং ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংস্থার চুক্তি নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে।

AI শিল্পের কয়েকটি সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক বিনিয়োগের প্রবণতাকেও ‘Circular Investment’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন চিঠির লেখকরা। তাঁদের বক্তব্য, AI ব্যবসার সম্প্রসারণের পাশাপাশি এর সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কর্মীদের দাবিগুলি মূলত তিনটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি:

  • কর্মীদের অংশগ্রহণ ও সুরক্ষা: কর্মীদের মতামত এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত না করে AI ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
  • সমাজের সুরক্ষা: AI প্রকল্পের প্রভাব যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর নেতিবাচকভাবে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • পরিবেশের প্রতিশ্রুতি: AI সম্প্রসারণের জন্য পরিবেশ সংক্রান্ত লক্ষ্য থেকে সরে আসা যাবে না।

বিশেষ করে ২০৩০ সালের মধ্যে Carbon Negative, Water Positive এবং Zero Waste হওয়ার যে লক্ষ্য Microsoft নিয়েছিল, তা পুনরায় নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এই উদ্যোগে শুধু Microsoft-এর স্থায়ী কর্মীরাই নন, GitHub ও LinkedIn-এর মতো অধীনস্থ সংস্থার কর্মী, ভেন্ডর, ইন্টার্ন এবং কন্ট্রাক্টররাও অংশ নিতে পারবেন।

৬০ হাজার কর্মীকে Buyout Offer, শেষ সিদ্ধান্ত ৯ ডিসেম্বর

Microsoft-এর Voluntary Exit Offer বা স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব পৌঁছেছে ভারত, আমেরিকা, ব্রিটেন এবং কানাডার নির্দিষ্ট কর্মীদের কাছে। সংস্থার বিভিন্ন অংশগ্রহণকারী টিমে Level 70 এবং তার নীচের যোগ্য কর্মীদের এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে Sales এবং কিছু Engineering টিমকে এই সুযোগের বাইরে রাখা হয়েছে।

যাঁরা প্রস্তাব গ্রহণ করবেন, তাঁরা অন্তত আট সপ্তাহের Basic Pay পাবেন। কর্মীর পদমর্যাদা এবং চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে এই অর্থের পরিমাণ বাড়বে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার শেষ দিন ৯ ডিসেম্বর। যাঁরা প্রস্তাব গ্রহণ করবেন, তাঁদের ৩১ ডিসেম্বর সংস্থা ছাড়তে হবে।

কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো বার্তায় Microsoft-এর Chief People Officer অ্যামি কোলম্যান এই সুযোগকে সহায়তার সঙ্গে সংস্থার বাইরে নতুন পথে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে যোগ্য কর্মীদের ৫ শতাংশেরও কম এই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন বলে সংস্থার প্রত্যাশা।

২০২৬ সালে Microsoft-এর এটি দ্বিতীয় Buyout Offer। এর আগে এপ্রিল মাসে আমেরিকায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত প্রায় ৮,৬০০ কর্মীকে আগাম অবসরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন।

এছাড়া জুলাই মাসে প্রায় ৪,৮০০ কর্মীকে ছাঁটাই করে Microsoft। তাঁদের মধ্যে Xbox বিভাগের কর্মী ছিলেন প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এর আগে ২০২৩ সালে ১০,০০০ এবং ২০২৫ সালে ১৫,০০০-এর বেশি কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জুনে সংস্থার মোট কর্মীসংখ্যা ছিল ২,২৩,০০০, যা আগের বছরের তুলনায় ৫,০০০ কম।

রেকর্ড মুনাফা, AI-তে বিপুল খরচ, তবু বেতন বৃদ্ধিতে অসন্তোষ

কর্মীদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে Microsoft-এর আর্থিক ফলাফল এবং বেতন বৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্য। Buyout Offer ঘোষণার দু’দিন পর সংস্থাটি ত্রৈমাসিক আর্থিক ফল প্রকাশ করে। সেখানে মুনাফা ৩২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬.৬ বিলিয়ন ডলারে। রাজস্ব ছিল ৯২.৩ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, মূলত Data Centre তৈরির জন্য Capital Expenditure বা মূলধনী ব্যয় ৩০ শতাংশ বেড়ে ৪৫.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি ক্যালেন্ডার বছরে এই খাতে মোট খরচ প্রায় ১৭০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে সংস্থার পূর্বাভাস।

এই বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, চলতি বছরে Merit-based Salary Increment বা কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে বেতন বৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে কম হয়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ১ শতাংশেরও কম।

গত মাসে একটি Town Hall বৈঠকে AI-তে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মীদের প্রায় অপরিবর্তিত বেতন বৃদ্ধির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই প্রশ্নে ৮০টিরও বেশি প্রতিক্রিয়া এসেছিল, যা সাধারণত অন্যান্য প্রশ্নের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

Microsoft-এর প্রাক্তন Design Leader ৫৭ বছর বয়সি গ্রেচেন থমাস সেপ্টেম্বর মাসে পাঁচ বছর কাজ করার পর সংস্থা ছেড়েছেন। তাঁর দাবি, কাজের গতি এবং AI নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগ্রহ ধারাবাহিকভাবে না দেখানোর কারণেও তাঁর Stock Award কমানো হয়েছিল। The New York Times-কে তিনি জানান, গত তিন বছরে সংস্থার কাজের পরিবেশের অবনতি তাঁকে হতাশ করেছে।

AI-এর কারণে কি আরও ছাঁটাই হতে পারে?

অ্যামি কোলম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, এই Buyout Offer-এর সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে AI-এর পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে ভবিষ্যতে আরও ছাঁটাই হবে কি না, সেই সম্ভাবনাও তিনি পুরোপুরি নাকচ করেননি।

অন্যদিকে, সংস্থায় থেকে যাওয়া কর্মীদের একাংশের আশঙ্কা, যাঁরা চাকরি ছাড়বেন তাঁদের জায়গায় নতুন কর্মী নিয়োগ করা হবে না। ফলে কাজের চাপ আরও বাড়তে পারে। AI-তে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্প্রসারণ চলতে থাকলে কর্মীদের দায়িত্বও বাড়বে বলে তাঁদের ধারণা।

Microsoft-এর সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে AI-তে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার লক্ষ্য, অন্যদিকে কর্মীদের মনোবল, কাজের পরিবেশ এবং পরিবেশগত প্রতিশ্রুতি বজায় রাখা। সংস্থার বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মীদের খোলা চিঠি সেই দ্বন্দ্বকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

Get your daily dose of tech news and insight.  Follow us on X, Facebook, WhatsApp and Google News for instant updates. Catch all the action on our YouTube channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *