কালী কি শুধুই হিন্দুদের, নাকি বিশ্বজুড়ে তাঁর মহিমা? চমকে উঠবেন ইউরোপ-আমেরিকার এই দেবীরদের কথা শুনলে
‘ওঁ অঞ্জনাদ্রিনিভাং দেবীং শ্মশানালয়বাসিনীম।
রক্তনেত্রাং মুক্তকেশীং শুষ্কমাংসাতিভৈরবাম।।
পিঙ্গাক্ষীং বামহস্তেন মদ্যপূর্ণং কপালকম।
সদ্যঃ কৃত্ব শিরো দক্ষহস্তেন দধতীং শিবাম।।
স্মিতবক্ত্রাং সদা চামমাংসচর্ব্বণতৎপরাম।
নানালঙ্কার ভূষাঙ্গীং নগ্নাং মত্তাং সদাশিবৈঃ।’
এই শ্লোকে বর্ণিত রয়েছে দেবী কালিকার আদি রূপ। আজ আমাদের কাছে যিনি পরিচিত শ্মশান কালী রূপে। এই শ্লোকের সহজ বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় যে দেবী অঞ্জন বা কালো জলের গাঢ় কৃষ্ণবর্ণা। শ্মশানে তাঁর বাস, তাঁর চোখ দুটি রক্তের মতো লাল, মুক্ত চুল। বাঁ হাতে মদ্য পূর্ণ নরমুণ্ড দিয়ে তৈরি পাত্র ধারণ করেছেন, ডান হাতে সদ্যচ্ছিন্ন নরমুণ্ড। মুখে মৃদু হাসি, যিনি সর্বদা কাঁচা মাংস চর্বণে তৎপর। নানা অলঙ্কারে ভূষিতা, দিগম্বরা, এবং সদাশিবের সঙ্গে আনন্দে মত্তা।
কালী একদিকে বাংলার ঘরের মেয়ে। সাধকদের স্নেহের মা। অন্যদিকে ভয়ঙ্করী, অসুরদলনী। এই বাংলায় কালী পুজোর ইতিহাস যতটা প্রাচীন, খুব কম পুজোর ততধিক অতীত ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। দয়াময়ী মা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি যুদ্ধের দেবীও বটে। তাই তো বোধহয় বাংলায় ডাকাতদের সর্বৈব পূজিত দেবীও ছিলেন কালী। তবে এই কালীর অস্তিত্ব কি কেবল ভারত আর ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু অংশেই? নাকি জাতি-ধর্ম-দেশ-কালের গণ্ডি পেরিয়ে সে বিরাজমান সর্বত্র?
ভারতের শ্মশানবাসিনী কালী থেকে মিশরের সেখমেত, গ্রিসের হেকাতে, মেসোপটেমিয়ার ইন্নানা, কেল্টিক সভ্যতার মরিগান কিংবা অ্যাজটেকদের কোয়াটলিকু—পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা দেবীদের গল্পে-চেহারায় রয়েছে কিছু আশ্চর্য সাদৃশ্য। কেউ যুদ্ধের দেবী, কেউ মৃত্যুর অধিষ্ঠাত্রী, কেউ অন্ধকারের প্রতীক, আবার কেউ সৃষ্টির আদি উৎস। তাঁদের প্রত্যেকের পরিচয় আলাদা হলেও কোথাও যেন মিলে যায় ভয়ঙ্করী মাতৃশক্তির এক চিরন্তন ধারণা। মিলে যায় দেবী শক্তির উদযাপনের ভাবনাও।
মা কালী শ্মশানবাসিনী, মুণ্ডমালিনী পরিহিতা, মুক্তকেশী এক ভয়ঙ্করী দেবী। তাঁকে অবশ্য ঘরের মেয়ে করেছিলেন সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। তবে সে অন্য কথা। কালীর মধ্যেই রয়েছে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের ব্যাখ্যা। তিনি শুধু ধ্বংসের দেবী নন, পুনর্জন্মের প্রতীক।
দেবীর সেই রূপই খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্বের নানা প্রান্তে নানা ভাবে, প্রাচীন সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে, পুরাণে। কোথাও দেবী যুদ্ধের আগুন, কোথাও মৃত্যুর অন্ধকার, কোথাও আবার রোগ, বিপর্যয় ও ধ্বংসের নিয়ন্ত্রক তিনি। আর এই সব ভয়ঙ্করী দেবীই সময়ের প্রয়োজনে কখনও হয়ে উঠেছেন রক্ষাকর্ত্রী। কখনও প্রকাশ পেয়েছে তাঁর মাতৃসত্তা। আবার কখনও পূজিত সৃষ্টির উৎস হিসেবে। অর্থাৎ বিনাশকারী ও মমতাময়ী— এই দুই বিপরীত সত্তার সহাবস্থান। ঠিক আমাদের কালীর মতো।