বিপুল বাজেট, টিকিটের দামও চড়া, ‘রামায়ণ’ দেখে কি পয়সা উসুল হলো? - 24 Ghanta Bangla News
Home

বিপুল বাজেট, টিকিটের দামও চড়া, ‘রামায়ণ’ দেখে কি পয়সা উসুল হলো?

Spread the love

ধর্মের যে বিস্তারিত আর উদার ধারণা আমাদের চেতনে ছিল, এতকাল, সেটা কিঞ্চিৎ ঘেঁটে গিয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি কতখানি উদ্দাম হল? পৃথিবীর আগাপাশতলা একবার চোখ বুলিয়ে নিলেই, দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। এও টের পাচ্ছি, আমাদের কোনও আশ্রয় নেই। যে দুটি মহাকাব্য ভারতবর্ষের মাথার ওপরে জ্বলজ্বল করছে, নক্ষত্রসম, ইচ্ছে করে সেখানে ফিরে যাই। নীতেশ তেওয়ারি আদতেই যেন ফিরে গেলেন সেই নক্ষত্রদেশে! মুক্তি পেল, রামায়ণ: পার্ট ওয়ান।

আমরা যে সমাধানের প্রত্যাশী হয়েছিলাম, সেটার আদৌ কোনও জবাব পাওয়া গেল? আপাতত, হ্যাঁ! পাওয়া গিয়েছে। কারণ ছবির শুরুতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে: কর্তব্য, সত্য এবং ন্যায়পরায়ণতার যে মহার্ঘ পথ, সেটারই নাম ধর্ম। এই বেকুব সময়ে, এই শব্দগুলোর অভিঘাত ভীষণরকম!

রামায়ণের এই আখ্যানের সঙ্গে আমরা সকলেই প্রায় পরিচিত। শৈশব থেকেই। সেই যে ঋষি বাল্মীকির রামায়ণ অথবা রামানন্দ সাগরের তৈরি বিপুল জনপ্রিয় টেলিভিশান সিরিজ—সমস্তটাই তো মগজস্থ হয়ে গিয়েছে। তা হলে নীতেশ তিওয়ারির এই অ্যাডাপ্টেশানে নতুন কী খুঁজে পেলাম? সম্প্রতি আমূল কম্পানির যে নতুন বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ পেয়েছে, সেখানে ‘আমূল গার্ল’-এর আদলে আঁকা রাম এবং রাবণের দুটি ছবি। ওপরে লেখা: Motion Epicture! এহেন মেতে ওঠার কারণ আলবাত আছে। একেক করে বলি।

প্রথমেই, এ ছবির ঐশ্বরিক ভিএফএক্স। দায়িত্বে কে ছিলেন? নমিত মালহোত্রার কম্পানি, ডিএনইজি। যে কম্পানির সিনেমার লিস্টে আছে তাবড় তাবড় সমস্ত নাম। যেমন? ক্রিস্টোফার নোলানের ইন্টারস্টেলার। টেনেট। ইন্সেপশান। রয়েছে আরও একটি দুর্দান্ত সায়েন্স-ফিকশান ছবি, ব্লেড রানার ২০৪৯। রয়েছে, অ্যাভেঞ্জার্স এন্ডগেম। সেইসমস্ত ভিস্যুয়াল দেখে আক্ষরিক অর্থেই রোমাঞ্চ জাগে মনে। তাই কাহিনির চেয়ে, কাহিনির যে অপূর্ব চিত্রায়ণ, সেটাতেই একেবারে মজে যায় দর্শক।

এই যেমন রামায়ণ: পার্ট ওয়ান ছবির একটি দৃশ্যের কথা বলি। সীতাকে হরণ করার পরে, রাবণ ফিরছেন লঙ্কাপুরীতে। সঙ্গী, পুষ্পক রথ। যা উড়তে পারে আকাশে। এখনও পর্যন্ত, যে-ধরণের পুষ্পক রথের নিদর্শন আমরা সিনেমায় অথবা টেলিভিশানে পেয়েছিলাম, সেগুলোকে একটা শব্দে বললে হয়, ট্যাকি। মোটে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। আমাদের ইম্যাজিনেশানের সঙ্গে খাপ খায়নি। আসলে একটা মহাকাব্য যতখানি গভীর তার ভাষায়, দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমেও ঠিক ততটাই দড় হওয়াটাই কাম্য।

নীতেশ তিওয়ারি ওই ইম্যাজিনেশানের খেলায় মোটামুটি বাজিমাত করেছেন। আমরা দেখছি, ফুলের পাপড়ি দিয়ে ঘেরা পুষ্পক রথের দুটি স্তর। একটি ঘুরছে। একটি স্থির। কিন্তু দৃশ্যের রোমাঞ্চ সেখান থেকেই শুরু। পুষ্পক রথের চারিদিক ঘিরে ফেলে অসংখ্য পাখি। পাখিগুলো উড়তে উড়তে যখন স্লো মোশানে চলে যায়, সেই এক আকাশ পাখির ভেতর থেকে আবির্ভূত হন জটায়ু। ঠিক যেভাবে কোনও হিরো এন্ট্রি নেয়! জটায়ুর কথা পড়তে পড়তে, ঠিক এই হিরোইজমের ছিটেফোঁটা আপনার চিন্তায় এসে লেগেছিল নিশ্চয়ই? সেটাই এখন চক্ষুগোচর। তারপরে, রাবণ বনাম জটায়ু। যুদ্ধের যে পাঁচ মিনিটের অসামান্য সিকোয়েন্স, সেটা দেখে মনে পড়ছিল অনেকগুলো হলিউড ছবির কথা—১৯৫৭ সালের ছবি ‘দ্য জায়ান্ট ক্ল’ থেকে শুরু করে ২০০১-এর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’-এর সেই প্রকাণ্ড ঈগলগুলো! একইরকম হিংস্র, ক্ষিপ্র আর প্রত্যয়ী। অসংখ্য এরকম দৃশ্য নিয়ে কাটাছেঁড়া আর অন্তহীন তর্ক-বিতর্ক, দুটোই সম্ভব।

কিন্তু শুধুই ভিস্যুয়ালের কথা বলে যাব? আজ্ঞে না! হে পাঠক, নীতেশ তিওয়ারির কাছে যেমন ৪০০০ কোটি টাকার বাজেট ছিল, রণবীর কাপূরের মতো অভিনেতা ছিলেন, ছিল সংগীত-দুনিয়ার দুই মসিহা—এ.আর.রহমান এবং হ্যান্স জিমার, তেমনই ছিল ব্যাপক একটা চাপ। যেহেতু তিন বছর আগে রামায়ণের যে অ্যাডাপ্টেশান মুক্তি পেয়েছিল, সেই ‘আদিপুরুষ’, আখেরে একটা উদ্ভট আর কিম্ভূতকিমাকার ছবি। বিস্তর বিতর্কও হয়েছিল।

এই সমস্তটার পরেও, নীতেশ তিওয়ারি বেশ সাবধানী তবু সাহসী পদক্ষেপ নিলেন। যেটার জন্য কুর্নিশ! কেন বলছি এ-কথা? সিনেমার প্রথম ৩৫ মিনিটে, দশরথ-পুত্রের নামোল্লেখটুকু নেই। আরও অবাক করে, দেবতা এবং অসুরের চিরন্তন দ্বন্দ্বের ভেতরে, অতি সূক্ষ্মভাবে, মিশিয়ে দেন শ্রেণিচিন্তা। নভীন ‘যশ’ কুমার অভিনীত রাবণের উত্থান, তপস্যা ও লঙ্কা বিজয়ের দুনিয়াটা নির্মাণ করলেন ধৈর্য নিয়ে। যত্ন করে। সোয়্যাগের সঙ্গে। আসলে একজন খলনায়কের দাপট আর দম্ভ—দুটোই যদি সঠিক ভাবে নির্মিত না হয়, তবে বিপরীতে যে হিরো দাঁড়িয়ে থাকবে, তার আশেপাশের আলোকছটা খানিক ম্রিয়মাণ ঠেকে না? নীতেশ তিওয়ারি বলতে চেয়েছেন, রাম এবং রাবণ—উভয়েই এ-ছবির চালিকাশক্তি। পরষ্পর-বিরোধী, তবুও পরিপূরক।

রণবীর কাপূর কেমন অভিনয় করলেন বৃদ্ধ পরশুরাম এবং রামের চরিত্রে? খুব ভাল। দশরথের সামনে সংযত। লক্ষণের কাছে বড়ভাইয়ের মতো দায়িত্বশীল। কখনও সীতার খোঁপায় ফুলও গুঁজে দেয়। জটায়ুর মৃত্যুর পরে কেঁদেও ফেলে। মর্যাদা পুরুষোত্তম চরিত্রের এই প্রতিটা স্তরেই, সিনেমা যত এগিয়েছে, একটা করে ফুল ফুটিয়েছে রণবীর কাপূর। ইমোশোনের যে ওঠানামা—চমৎকার ধরেছেন চোখে, মুখে, শরীরে। পাশাপাশি, রাম-কেন্দ্রিক যে একরোখা আর রিজিড ন্যারেটিভে ভরে গেছে সোশ্যাল মিডিয়া এবং চায়ের দোকান, রণবীর কাপূর অভিনীত রাম সেখানে স্বস্তি। দু’মিনিট জিরিয়ে দেওয়ার মুক্তক্ষেত্র। ধর্মের প্রকৃত পথেই সে হাঁটছে।

আর সীতা? ছবির দুই চিত্রনাট্যকার, শ্রীধর রাঘবন এবং নীতেশ তেওয়ারি—এখানেও স্টিরিওটাইপ ভেঙে ফেলেছেন। সাই পল্লবী কী অপূর্ব অভিনয় করেছেন সীতার চরিত্রে! তিনি কোমল, কিন্তু কখনোই ভঙ্গুর নন। দৃঢ়। দৃপ্ত। অধর্মের সামনে অনমনীয়। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে পড়ছে, ‘অদ্ভুত রামায়ণ’-এর কথা? যে রামায়ণে লেখা হয়েছিল, সীতার একটি বিধ্বংসী রূপের কথা। কালো শরীর, জ্বলন্ত কয়লার মতো দুটো চোখ, হাতে খড়্গ—সব মিলিয়ে সীতাই যেন স্বয়ং মহাকালী! ‘অদ্ভুত রামায়ণ’ থেকে নীতেশ তিওয়ারি সেই দৃঢ়তাটুকু সজ্ঞানে ধার নিয়েছেন। আর সেটাই চরিত্রে চমৎকার ধারণ করেছেন সাই পল্লবী। গোটা ছবিজুড়েই।

যতই রাবণের দুনিয়া নিখুঁতভাবে নির্মাণে প্রয়াস থাকুক, এ-সিনেমা রানিং টাইমের বিচারে খানিকটা দীর্ঘ। কখনও একঘেয়ে। কিছুক্ষেত্রে ভিস্যুয়ালের ত্রুটি এবং মারভেল ইউনিভার্স থেকে অনুপ্রাণিত রাক্ষসদের আকার ও আকৃতি—ছবির তাল কেটে দেয়। বিশেষ করে, দন্ডকারণ্যের দৃশ্যটা ভীষণরকম আরোপিত! আর সবশেষে, কৈকেয়ীর চরিত্রে লারা দত্ত একেবারেই বেমানান। আশা করি, পরবর্তী পর্বে এগুলো শুধরে নেবেন নীতেশ তিওয়ারি।

কিন্তু সিনেমা থেকে আর কী কী পেলাম? শূর্পনখার চরিত্রে রাকুল প্রীত সিং। মারীচের চরিত্রে সৌরভ সচদেভ। দুজনেই অনবদ্য। তেমনই, ততধিক জনপ্রিয় নয়, এমন এক চরিত্র। নাম, বিদ্যুৎজিহ্বা। আসলে সেই চরিত্রের মৃত্যু থেকেই রাম-রাবণের যুদ্ধ-পরিস্থিতির সলতে পাকানো শুরু। প্রথম পর্ব এখানেই শেষ। এই পর্যন্ত দেখার পরে, আপনার হয়তো আরেকটি মহাকাব্যের ফিল্ম-অ্যাডাপ্টেশানের কথা মনে পড়ে যাবে। ক্রিস্টোফার নোলানের ওডিসি। অন্তত ভিস্যুয়ালের নিরিখে, এমন দাবী অমূলক নয়। বিখ্যাত ব্রিটিশ সংবাদপত্র, দ্য গার্ডিয়ান, সম্প্রতি লিখেছে: ‘ওডিসি’-পরবর্তীকালে, মহাকাব্যের যে সিনেম্যাটিক এক্সপেরিয়েন্সের অভাব বোধ করছেন আপনি, তা পুষিয়ে দেবে রামায়ণ: পার্ট ওয়ান।

রাবণের দশ মাথার দুরন্ত দৃশ্যের বর্ণণা দিয়ে লেখাটা শেষ করি। শূর্পনখা বলছেন, আমার সঙ্গে যা হয়েছে, আপনি তার প্রতিশোধ নেবেন না? রাম-লক্ষণের থেকে? তখন রাবণের পৃথক পৃথক ব্যক্তিসত্ত্বা, শরীর পেয়ে এগিয়ে আসে। কেউ শিবের উপাসক। কেউ সংগীত সাধক। কেউ-বা বিদ্বান। কেউ ঋষি। কেউ ক্ষমতার নেশায় পাগল। দশখানা মাথার অর্থ হয়, দশরকম ব্যক্তিসত্ত্বা। কিন্তু প্রত্যেকটি সত্ত্বাই বলে, প্রতিশোধ নাও! সকলে যখন একত্র হয়, ক্রোধে উন্মাদ, তখনই রাবণ, রাবণের পর্যায়ে পৌঁছে যান। ইম্যাজিনেশানের এই খেলাটাও দিব্যি লাগে। রামায়ণের দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে প্রত্যাশার গ্রাফ কিন্তু ক্রমেই ঊর্ধ্বগামী হবে। ততদিনে হলিউডকে চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারব, সেলুলয়েডে আমাদেরও একটা মহাকাব্যিক উপাখ্যান আছে। দেখে যা!        

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *