Sonia Gandhi: জরুরি অবস্থা জারি করা ভুল ছিল, স্বীকার সনিয়ার, গান্ধী পরিবারেও তৈরি হয়েছিল বিভাজন | Sonia Gandhi Admits Emergency Was a Mistake, Reveals Family Rift Over Indira Gandhi’s Decision
সনিয়া গান্ধী (বাঁদিকে), ইন্দিরা গান্ধী (ডানদিকে) (ফাইল ফোটো)
নয়াদিল্লি: কেটে গিয়েছে ৫০ বছরের বেশি। কিন্তু, আজও বিরোধীরা সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্রমণ শানায় কংগ্রেসকে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থা (Emergency) কংগ্রেসের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়। সেই অশান্ত সময়ের কথা স্মরণ করে কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধী জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থা জারি করার সিদ্ধান্ত ছিল একটি ‘ভুল’। তাঁর মতে, সঞ্জয় গান্ধীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে জরুরি অবস্থা জারির পর যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তার অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হত। নিজের স্মৃতিকথা Belonging: A Journey of Love প্রকাশের আগে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সনিয়া জানিয়েছেন, তাঁর শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীও জরুরি অবস্থা জারি করতে কখনও স্বচ্ছন্দ ছিলেন না।
জরুরি অবস্থা নিয়ে সনিয়া এই প্রথম মুখ খুললেন , এমন নয়। এর আগে ২০১৬ সালে সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেছিলেন, জরুরি অবস্থা জারি করে ইন্দিরা গান্ধী অস্বস্তিতে ছিলেন। কারণ, তিনি যদি সত্যিই এই সিদ্ধান্তে স্বচ্ছন্দ হতেন, তাহলে ১৯৭৭ সালে নির্বাচন ঘোষণা করতেন না। তবে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে সনিয়ার বক্তব্যে জরুরি অবস্থা জারি করা নিয়ে গান্ধী পরিবারের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের আরও বিস্তারিত ছবি উঠে এসেছে।
জরুরি অবস্থা নিয়ে রাজীব ও সঞ্জয়ের মধ্যে মতপার্থক্য-
নতুন বইয়ের কিছু অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন কংগ্রেস সভানেত্রী জানিয়েছেন, তাঁর বিশ্বাস, ইন্দিরা গান্ধী ‘মনেপ্রাণে একজন গণতন্ত্রী’ ছিলেন। সনিয়ার কথায়, “আমি জানি, অনেকেই হয়তো এই কথা শুনে হাসবেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস, জরুরি অবস্থা জারি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি কখনও স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। আমার মনে হয়, বিষয়টি তাঁকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।”
প্রায় দু’বছর (১৯৭৫-১৯৭৭) স্থায়ী হয়েছিল জরুরি অবস্থা। বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ এবং এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে রায়বরেলি কেন্দ্র থেকে ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সনিয়ার দাবি, জরুরি অবস্থা জারি করার সিদ্ধান্ত গান্ধী পরিবারের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করেছিল।
তিনি জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী রাজীব গান্ধী মাকে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, সঞ্জয় গান্ধী জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে ছিলেন। সঞ্জয়ের হাতে কোনও মন্ত্রিত্ব বা সরকারি পদ না থাকলেও, ইন্দিরা গান্ধীর উপর তাঁর প্রভাব ছিল অসাধারণ। সেই সময় তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবেও দেখা হত। সনিয়ার কথায়, এই মতপার্থক্য পরিবারের মধ্যেও উত্তেজনা তৈরি করেছিল।
সনিয়া জানিয়েছেন, এক পারিবারিক নৈশভোজের সময় সঞ্জয় গান্ধীর চাপেই জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছিল। বিরোধীদের প্রসঙ্গে সঞ্জয় ইন্দিরাকে বলেছিলেন, “ওদের থামাতেই হবে।” সনিয়ার দাবি, রাজীব গান্ধী মায়ের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলার এবং তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইন্দিরা তাঁর কথা শুনতে চাননি। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজের বইয়ে সনিয়া লিখেছেন, “সঞ্জয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে পরবর্তী সময়ে যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তার অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হত।”
‘দলের প্রবীণ নেতাদের থেকেও প্রবল চাপ ছিল’
তবে ‘দ্য হিন্দু’-কে দেওয়া অন্য একটি সাক্ষাৎকারে সনিয়া জানিয়েছেন, শুধু সঞ্জয় গান্ধী নন, কংগ্রেসের কয়েকজন ‘প্রবীণ নেতাও’ ইন্দিরা গান্ধীর উপর জরুরি অবস্থা জারি করার জন্য চাপ তৈরি করেছিলেন। সনিয়ার কথায়, “তাঁর কয়েকজন প্রবীণ সহকর্মীর কাছ থেকে প্রবল চাপ ছিল। রাজীবের মতো হাতে গোনা কয়েকজনই ছিলেন, যাঁদের মতামত ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।”
ইন্দিরা গান্ধীর ছোট ছেলে সঞ্জয় জরুরি অবস্থার সময় নেপথ্যে থেকে ব্যাপক ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিলেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নামে জোর করে নির্বীজকরণ বা নসবন্দি অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পাশাপাশি পুরনো দিল্লিতে বস্তি উচ্ছেদের অভিযানও সেই সময়ের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে উঠেছিল। ‘দ্য হিন্দু’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সনিয়া জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থার সময় অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধী নিজেও উপলব্ধি করেছিলেন এবং তার জন্য ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
সনিয়ার কথায়, “শেষ পর্যন্ত আমার শাশুড়ি নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছিলেন এবং ভুল সংশোধনের জন্য পদক্ষেপ করেছিলেন।” রাজ্যসভার সাংসদ সনিয়া আরও জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থা শেষ হওয়ার পরেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সেই সময় আসলে কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তাঁর কথায়, “গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছিল এবং হেবিয়াস কর্পাসের অধিকার স্থগিত রাখা হয়েছিল। তবে তা সাংবিধানিকভাবেই করা হয়েছিল।”
আগামী ১০ নভেম্বর প্রকাশিত হতে চলেছে সনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথা Belonging: A Journey of Love। এই বইয়ে ইটালিতে তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠার দিনগুলির পাশাপাশি রাজীব গান্ধীকে বিয়ে করার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের যাত্রাপথের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন তিনি।