বারদীর আশ্রমে ‘রাখের উপবাস’, বাংলাদেশে হিন্দুদের আলোর শিখায় ভক্তির নিবেদন
কুদ্দুস আফ্রাদ, ঢাকা
গোধূলির আলো যখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসতে থাকে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বারদীতে শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রমে জড়ো হতে শুরু করে অগণিত ভক্ত। দিনভর উপবাস করে থাকা এই সব ভক্ত সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালিয়ে প্রিয়জনদের মঙ্গল কামনায় ও ঈশ্বরের কৃপা পাওয়ার প্রত্যাশায় প্রার্থনা শুরু করেন। তার আগে, আশ্রম প্রাঙ্গণে আসা নারী-পুরুষেরা সারিবদ্ধ ভাবে বসে সাজিয়ে নেন সঙ্গে আনা মাটির প্রদীপ, ফুল, ধূপকাঠি ও পূজার আরও নানা উপকরণ। স্বতন্ত্র এই ধর্মীয় আচার ‘রাখের উপবাস’ নামে পরিচিত।
এটি ‘কার্তিক ব্রত’, ‘গোসাঁইয়ের উপবাস’ ও ‘ঘৃত প্রদীপ জ্বালানো’ নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় রীতি। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের বারদী আশ্রমে সেই রীতি পালনের গুরুত্ব ও আবেদন অনেক বেশি। বাংলা ক্যালেন্ডারের কার্তিক মাসের শেষ পক্ষের মঙ্গলবার ও শনিবার এই ব্রত পালন করা হয়।
এক নজরে
-
রাখের উপবাস ‘কার্তিক ব্রত’। ‘গোসাঁইয়ের উপবাস’ ও ‘ঘৃত প্রদীপ প্রজ্বলন’ নামেও পরিচিত।
-
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বারদী লোকনাথ আশ্রমে এই ব্রত উপলক্ষে সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক সমাবেশ ঘটে।
-
কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহের মঙ্গলবার এবং শনিবার দিনভর উপবাস রেখে এই পুজো করা হয়।
-
লোকবিশ্বাস, লোকনাথ বাবার নির্দেশে পরিবারকে রোগব্যাধি, মহামারী ও যাবতীয় সংকট থেকে মুক্ত রাখতেই ভক্তরা শত শত ঘৃত প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন।
-
নীরব প্রার্থনা ও প্রদীপের আলোর মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই আয়োজনটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভক্তি, পারিবারিক বন্ধন ও সাম্প্রদায়িক প্রীতির প্রতীক হিসেবে টিকে রয়েছে।
দিনভর উপবাসের পর সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন ভক্তরা। উপবাস, ভক্তি আর ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালানো—এই তিনের সমন্বয়েই পালিত হয় রাখের উপবাস। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সাধক বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর নাম। তার স্মৃতি ও আদর্শকে ঘিরেই আজও বারদী আশ্রমে সমবেত হন অসংখ্য ভক্ত। রাখের উপবাস কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; তা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেরও অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই উৎসব মানুষকে একত্র করে বিশ্বাস, পারিবারিক বন্ধন ও সামষ্টিক ভক্তির বন্ধনে।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, রোগব্যাধি ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় কার্তিক মাসে উপবাস পালন এবং আশ্রমে প্রদীপ ও ধূপ জ্বালানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন বাবা লোকনাথ। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আশ্রমে শুরু হয় আলোর মেলা। সারি সারি মাটির প্রদীপ জ্বলে ওঠে। সেই আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো আশ্রম। প্রার্থনায় মগ্ন ভক্তদের মুখে ফুটে ওঠে গভীর বিশ্বাস ও ভক্তির ছাপ।
প্রতিটি প্রদীপ যেন একেকটি প্রার্থনার প্রতীক। কেউ পরিবারের সুস্থতা কামনা করেন, কেউ প্রিয়জনের নিরাপত্তা চান, আবার কেউ জীবনের নানা সংকট থেকে মুক্তির আশায় প্রদীপ জ্বালান। প্রতিটি শিখার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একেকটি মানুষের ব্যক্তিগত আশা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা। নীরবতা ও গভীর ভক্তির মধ্য দিয়ে চলতে থাকে এই আয়োজন। প্রার্থনা শেষে ভক্তরা উপবাস ভঙ্গ করেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী, এ সময় তাদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
বারদী আশ্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার যখন শত শত প্রদীপের আলোয় দূর হয়ে যায়, তখন প্রতিটি শিখা যেন একটি বার্তাই বহন করে— প্রিয় মানুষগুলো ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক, নিরাপদে থাকুক।
FAQs
প্রশ্ন: ‘রাখের উপবাস’ কী এবং এটি কার স্মৃতিতে পালিত হয়?
উত্তর: রাখের উপবাস হলো বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক ব্রত, যা মহাপুরুষ ও সাধক শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর স্মৃতি এবং উপদেশ অনুসরণে পালিত হয়।
প্রশ্ন: ‘রাখের উপবাস’ কখন এবং কোথায় বিশেষ ভাবে উদযাপিত হয়?
উত্তর: বাংলা কার্তিক মাসের শেষ দিকের মঙ্গলবার ও শনিবার এটি পালিত হয়। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বারদীতে অবস্থিত লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রমে এই উৎসব সবচেয়ে আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে উদযাপিত হয়।
প্রশ্ন: এই ব্রতের মূল আচার ও বিশ্বাস কী?
উত্তর: ভক্তরা দিনভর উপবাস থেকে সন্ধ্যায় ঘিয়ের প্রদীপ, ধূপকাঠি ও ফুল সাজিয়ে প্রিয়জনের কল্যাণ ও রোগব্যাধি-বিপদ থেকে মুক্তির আশায় প্রার্থনা করেন এবং প্রার্থনা শেষে উপবাস ভঙ্গ করেন।