বেদ, উপনিষদ ও মহাভারতে কালীর পরিচয়। Ei Samay - 24 Ghanta Bangla News
Home

বেদ, উপনিষদ ও মহাভারতে কালীর পরিচয়। Ei Samay

Spread the love

এখানে দেবীর উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি আর যজ্ঞাগ্নির একটি নামমাত্র নন। তিনি হত্যাযজ্ঞের মধ্যে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ মৃত্যুশক্তির প্রতিমূর্তি। তাঁর সঙ্গে রাত্রির সম্পর্কও গভীর। দিনের আলোয় যে সভ্যতা ধর্ম, নীতি ও বীরত্বের কথা বলে, নিশীথের হত্যাক্ষেত্রে তার সমস্ত আবরণ ছিন্ন হয়ে যায়।

সেই অন্ধকারে কালী যেন মানবসভ্যতার অন্তর্নিহিত ধ্বংসপ্রবৃত্তিরই ভয়াল প্রতিচ্ছবি।

মহাকাব্যোত্তর সংস্কৃত সাহিত্যে কালীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি পাওয়া যায় কালিদাসের কুমারসম্ভব-এ। শিবের বিবাহযাত্রার অনুষঙ্গে নীলমেঘরাশির মধ্যে বলাকার উপমাsoho কালীর উল্লেখ রয়েছে। শশিভূষণ দাশগুপ্ত এই বর্ণনার দিকে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এখানে কালী শিবের পত্নী হিসেবে নয়, বিবাহযাত্রার অনুষঙ্গের একটি চরিত্র হিসেবে উপস্থিত। ফলে পরবর্তী শাক্তধর্মে শিব ও কালীর যে সুপরিচিত দাম্পত্যসম্পর্ক, তা এই বর্ণনায় প্রতিফলিত হয়নি। এখানে বলাকার উপমাটিও গুরুত্বপূর্ণ। নীলমেঘের পটভূমিতে বলাকার শুভ্র উপস্থিতি সংস্কৃত কাব্যে পরিচিত অলংকার। কিন্তু এই উপমার সঙ্গে বাংলার প্রাচীন পক্ষীমাতৃকার কোনও সম্পর্ক আছে কি? কুলচূড়ামণি তন্ত্র-এ কালীর পঞ্চদশ নিত্যার মধ্যে ‘বলাকা’ নামের উপস্থিতিও প্রণিধানযোগ্য।

মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে যে রক্তমালিনী, পাশহস্তা কালীর আবির্ভাব ঘটেছিল, পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর সংস্কৃত সাহিত্যে সেই ভয়াল দেবীকল্পনা ক্রমশ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। তবে এই পর্যায়ে কালী, চণ্ডী, করালা কিংবা পর্ণশবরীকে সর্বত্র একই দেবী বলে চিহ্নিত করা কঠিন। বরং তাঁদের মধ্যে লক্ষ করা যায় একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য—অরণ্য, শ্মশান, রক্ত, বলি এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক।

মহাভারতের পরিশিষ্ট হিসেবে পরিচিত হরিবংশ-এ এমন এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি মদ্য ও মাংসের উপচার গ্রহণ করেন এবং যাঁর উপাসনার সঙ্গে তথাকথিত ‘বর্বর’ জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। এখানে ‘বর্বর’ শব্দটির ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে এই জাতীয় শব্দ অনেক সময় মূলধারার বৈদিক আচারব্যবস্থার বাইরে অবস্থানকারী জনগোষ্ঠীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এই বর্ণনা কেবল দেবীর উপাসনাপদ্ধতির পরিচয় দেয় না, সমকালীন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও ইঙ্গিত বহন করে।

যে দেবীকে কোনও জনগোষ্ঠী নিজেদের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে উপাসনা করত, অন্য একটি ধর্মীয় পরিসরের চোখে তিনিই হয়ে উঠতে পারতেন ভয়ঙ্করী, অনার্য কিংবা অশুচি আচারের অধিষ্ঠাত্রী। ভারতীয় মাতৃকাধর্মের ইতিহাসে এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।

পরবর্তী পর্যায়ে সুবন্ধুর বাসবদত্তা কাব্যে গঙ্গাতীরবর্তী কুসুমপুরে পূজিতা এক ভয়াল দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি শুম্ভ-নিশুম্ভের বিনাশকারিণী, বেতালের সঙ্গে সম্পর্কিত এক উগ্র দেবী। এখানে পুরাণের অসুরবিনাশিনী মহাশক্তির সঙ্গে স্থানীয় ভয়াল দেবীকল্পনার একটি সংযোগ লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে শুম্ভ-নিশুম্ভের উল্লেখ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় দেবীমাহাত্ম্য-এর কথা। সেখানে চণ্ডিকার ললাট থেকে কালীর আবির্ভাব এবং চণ্ড-মুণ্ড বধের কাহিনি দেবীর সংহারিণী রূপকে সুস্পষ্ট করেছে। সুবন্ধুর বর্ণনায় সেই পুরাণপ্রসিদ্ধ দেবীর সঙ্গে বেতালসংক্রান্ত ভয়াল কল্পনার সহাবস্থান লক্ষণীয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *