দীপাবলির কেনাকাটায় No Cost EMI নাকি নগদ পেমেন্ট, কোনটি সস্তা?

নয়াদিল্লি: দীপাবলির মরশুমে স্মার্টফোন, টিভি, ফ্রিজ থেকে শুরু করে একাধিক দামি ইলেকট্রনিক্স পণ্যে আকর্ষণীয় অফার দিচ্ছে সংস্থাগুলি। অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম এবং খুচরো বিক্রেতারাও নিয়ে এসেছে No Cost EMI-এর সুবিধা। ফলে একবারে পুরো টাকা না দিয়েও তিন, ছয় কিংবা ১২ মাসের কিস্তিতে পছন্দের পণ্য কেনার সুযোগ পাচ্ছেন ক্রেতারা।
কিন্তু No-Cost EMI কি সত্যিই সবসময় লাভজনক? নাকি এককালীন পুরো টাকা মিটিয়ে দিলে বেশি সাশ্রয় হবে? আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু মাসিক কিস্তির অঙ্ক দেখলে চলবে না। প্রসেসিং ফি, GST, ক্যাশব্যাক, ক্রেডিট কার্ডের রিওয়ার্ড পয়েন্ট এবং এককালীন পেমেন্টে অতিরিক্ত ছাড়ের বিষয়গুলিও হিসাব করতে হবে।
কীভাবে কাজ করে No-Cost EMI?
ব্যাঙ্কবাজারের CEO আদিল শেট্টির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, No-Cost EMI বেছে নিলে কেনাকাটার টাকা সাধারণত ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড অথবা কনজিউমার ডিউরেবল লোনের মাধ্যমে ঋণে পরিণত হয়। পরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমান মাসিক কিস্তিতে সেই টাকা পরিশোধ করতে হয়।
এক্ষেত্রে ঋণদাতা সংস্থা সুদ নেয়। তবে সেই সুদের খরচ সরাসরি ক্রেতাকে বহন করতে হয় না। সাধারণত পণ্য প্রস্তুতকারী সংস্থা অথবা বিক্রেতা ঋণদাতাকে সেই সুদের টাকা দিয়ে দেয়। কখনও আবার সুদের সমপরিমাণ ছাড় দিয়ে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে, কোনও স্মার্টফোনের দাম ৩০,০০০ টাকা হলে এবং সেটি তিন মাসের No-Cost EMI-তে কেনা হলে ক্রেতাকে প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা করে দিতে হবে।
DPDzero-র প্রতিষ্ঠাতা ও CEO অনন্ত শ্রফ জানিয়েছেন, সাধারণত প্রস্তুতকারী সংস্থা ঋণদাতাকে আগাম একটি নির্দিষ্ট অর্থ দেয়, যা সুদের খরচ মেটাতে সাহায্য করে। ফলে ক্রেতার কিস্তির মোট অঙ্ক পণ্যের তালিকাভুক্ত দামের সমান রাখা সম্ভব হয়।
তবে No-Cost EMI মানেই কোনও অতিরিক্ত খরচ নেই, এমনটা ভাবা ঠিক নয়।
এককালীন পেমেন্টে কতটা ছাড় মিলছে, হিসাব করুন
কোনও পণ্য No-Cost EMI-তে পাওয়া যাচ্ছে বলেই সেটি সবচেয়ে সস্তা হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় পুরো টাকা একসঙ্গে দিলে বিক্রেতারা অতিরিক্ত ছাড় বা ক্যাশব্যাক দেন। EMI-তে সেই সুবিধা নাও পাওয়া যেতে পারে।
আদিল শেট্টির মতে, ক্রেতার হাতে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে এবং এককালীন পেমেন্টে দাম কম পাওয়া গেলে পুরো টাকা দিয়ে কেনাই লাভজনক হতে পারে।
অনন্ত শ্রফের পরামর্শ, দোকানে সরাসরি গিয়ে এককালীন পেমেন্টের বিনিময়ে অতিরিক্ত ছাড় চেয়ে দেখতে পারেন ক্রেতারা।
ধরা যাক, কোনও টিভির দাম ৫০,০০০ টাকা। No-Cost EMI-তে একই দাম রাখা হয়েছে। কিন্তু পুরো টাকা একসঙ্গে দিলে বিক্রেতা অতিরিক্ত ছাড় দিতে রাজি। সেক্ষেত্রে EMI-তে মোট কত টাকা দিতে হবে এবং ছাড় পাওয়ার পর এককালীন দাম কত দাঁড়াচ্ছে, তা তুলনা করা জরুরি।
প্রসেসিং ফি ও GST-এর দিকে নজর দিন
No-Cost EMI-এর ক্ষেত্রে সুদের টাকা বিক্রেতা বা প্রস্তুতকারী সংস্থা বহন করলেও ক্রেতাকে কিছু অতিরিক্ত চার্জ দিতে হতে পারে। যেমন:
- প্রসেসিং ফি
- প্রসেসিং ফি-র উপর GST
- সুদের অংশের উপর GST
- প্ল্যাটফর্ম বা কনভিনিয়েন্স ফি
- আগাম ঋণ বন্ধ করার চার্জ
- অর্ডার বাতিল বা পণ্য ফেরতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য চার্জ
আদিল শেট্টি জানিয়েছেন, ঋণদাতা সংস্থা নির্দিষ্ট অঙ্কের প্রসেসিং ফি অথবা লেনদেনের পরিমাণের উপর নির্ভর করে একটি শতাংশ চার্জ করতে পারে। এর সঙ্গে প্রসেসিং ফি-র উপর ১৮ শতাংশ GST দিতে হয়।
ক্রেডিট কার্ডের EMI-তে সুদের অংশের উপরও ১৮ শতাংশ GST প্রযোজ্য হতে পারে, এমনকি বিক্রেতা সুদের খরচ বহন করলেও।
উদাহরণ হিসেবে, ৫০,০০০ টাকার কোনও পণ্য ছয় মাসের জন্য বার্ষিক ১৫ শতাংশ সুদের হারে EMI-তে কেনা হলে সুদের অঙ্ক প্রায় ২,১০০ টাকা হতে পারে। এর উপর GST-এর পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৩৮০ টাকা।
অনন্ত শ্রফের মতে, প্রসেসিং ফি, প্ল্যাটফর্ম চার্জ এবং ঋণ আগাম বন্ধ করার খরচের কারণে ছোট অঙ্কের কেনাকাটায় EMI-এর সুবিধা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
তাই কিস্তির অঙ্কের পাশাপাশি সমস্ত চার্জ ও কর যোগ করে মোট কত টাকা দিতে হবে, তা আগে হিসাব করা উচিত।
ক্যাশব্যাক ও ক্রেডিট কার্ডের রিওয়ার্ড পয়েন্ট হারাতে পারেন
এককালীন পেমেন্টে অনেক সময় অতিরিক্ত ক্যাশব্যাক বা ছাড় পাওয়া যায়। কিন্তু No-Cost EMI বেছে নিলে সেই সুবিধা নাও মিলতে পারে। কারণ বিক্রেতা EMI-র সুদের খরচ মেটাতে যে ছাড় দিচ্ছেন, তার সঙ্গে অন্য অফার যোগ করা সম্ভব নাও হতে পারে।
এছাড়া কিছু ক্রেডিট কার্ড সংস্থা EMI লেনদেনের ক্ষেত্রে রিওয়ার্ড পয়েন্ট দেয় না। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কার্ডের নিয়ম ও শর্তের উপর।
তাই কেনার আগে তিনটি বিষয় তুলনা করুন:
- এককালীন পেমেন্টে চূড়ান্ত দাম কত?
- EMI-তে সমস্ত ফি ও GST-সহ মোট খরচ কত?
- কোন পদ্ধতিতে ক্যাশব্যাক বা রিওয়ার্ড পয়েন্ট বেশি পাওয়া যাচ্ছে?
এককালীন পেমেন্টে উল্লেখযোগ্য ছাড় থাকলে সেটি বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে। অন্যদিকে, দুই পদ্ধতিতে মোট খরচের পার্থক্য কম হলে No-Cost EMI বেছে নিয়ে একবারে বেশি টাকা খরচের চাপ কমানো সম্ভব।
মাসিক বাজেট ও কিস্তি দেওয়ার ক্ষমতা বিবেচনা করুন
No-Cost EMI-তে বড় কেনাকাটার টাকা একসঙ্গে দিতে হয় না। ফলে পরিবারের মাসিক বাজেট সামলানো সহজ হতে পারে। তবে আগে থেকে কোনও ঋণের কিস্তি থাকলে নতুন EMI নেওয়ার আগে নিজের আর্থিক পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি।
বাড়ির খরচ, অন্যান্য ঋণের কিস্তি এবং জরুরি সঞ্চয়ের কথা মাথায় রেখেই নতুন কিস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সময়মতো EMI না দিলে লেট পেমেন্ট ফি, জরিমানা এবং অন্যান্য চার্জ দিতে হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে ক্রেডিট প্রোফাইলেও।
অনন্ত শ্রফ সতর্ক করে জানিয়েছেন, সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করলেই No-Cost EMI-এর সুবিধা বজায় থাকে। একটি কিস্তি মিস করলেও অতিরিক্ত খরচের বোঝা তৈরি হতে পারে।
পণ্য ফেরত দেওয়া বা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ঋণ বন্ধ করার নিয়মও আগে জেনে নেওয়া দরকার। আদিল শেট্টির মতে, EMI চলাকালীন পণ্য ফেরত দিলে বা ঋণ আগাম বন্ধ করলে ইতিমধ্যে দেওয়া সুদের টাকা পুরোপুরি ফেরত নাও পাওয়া যেতে পারে।
এককালীন পেমেন্ট নাকি No-Cost EMI, কোনটি বেছে নেবেন?
সিদ্ধান্তটি নির্ভর করছে পণ্যের চূড়ান্ত দাম এবং ক্রেতার আর্থিক অবস্থার উপর।
এককালীন পেমেন্ট বেশি লাভজনক হতে পারে যদি:
- পর্যাপ্ত সঞ্চয় থাকে।
- একসঙ্গে টাকা দিলে অতিরিক্ত ছাড় পাওয়া যায়।
- EMI-এর তুলনায় এককালীন পেমেন্টে মোট খরচ কম হয়।
- জরুরি সঞ্চয়ে হাত দিতে না হয়।
No-Cost EMI সুবিধাজনক হতে পারে যদি:
- এককালীন ও EMI পেমেন্টের মোট খরচ প্রায় সমান হয়।
- প্রসেসিং ফি ও অন্যান্য চার্জ কম থাকে।
- মাসিক কিস্তি সহজেই বাজেটের মধ্যে রাখা যায়।
- একবারে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে না চান।
দীপাবলিতে কেনাকাটার সময় শুধু কম EMI বা শূন্য সুদের বিজ্ঞাপন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। পণ্যের চূড়ান্ত দাম, সমস্ত চার্জ, ক্যাশব্যাক এবং মাসিক কিস্তির চাপ হিসাব করে তবেই পেমেন্টের পদ্ধতি বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সেরা অফার সেটিই, যেখানে মোট খরচ কম এবং পরিবারের মাসিক আর্থিক পরিকল্পনাও অক্ষুণ্ণ থাকে।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business