ভালো মন্দ যাহাই আসুক, তথ্যেরে লও সহজে - 24 Ghanta Bangla News
Home

ভালো মন্দ যাহাই আসুক, তথ্যেরে লও সহজে

Spread the love

একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক তথ্য সঠিক এবং বিশ্বাসযোগ্য হওয়া জরুরি। ভুল তথ্য বাস্তবের বিকৃত চিত্র তুলে ধরে। সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধি এবং সার্বিক উন্নয়ন কার্যত অসম্ভব। লিখছেন হিরণ্য মুখোপাধ্যায়

নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর অফিশিয়াল স্ট্যাটিস্টিক্স-এর (আইএওএস) একটি গবেষণাপত্রে বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ব্যবহার করে দেখা হয়েছে যে, বেশি স্ট্যাটিস্টিক্যাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (এসপিআই) যে দেশগুলোর, তাদের সাধারণত মাথাপিছু আয় বেশি, দারিদ্র্য কম এবং তারা উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফলতর। প্রশ্ন হলো, দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য আর্থ-সামাজিক তথ্য ঠিক কী উপায়ে একটি দেশের বৃদ্ধি ও উন্নয়নকে বাধা দেয়।

সঠিক আর্থ-সামাজিক তথ্য একটি দেশের কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সুশাসনের ভিত্তি। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং উৎপাদন সম্পর্কিত পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করেই সরকার বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে, সম্পদ বণ্টন করে এবং উন্নয়নমূলক নীতি প্রণয়ন করে। কিন্তু যখন এই তথ্যগুলো ভুল, অসম্পূর্ণ বা তার প্রকাশ বিলম্বিত হয়, তখন এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর ও সুদূরপ্রসারী হতে পারে। নিম্ন মানের তথ্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি বিকৃত চিত্র তুলে ধরে, যার ফলে নীতিনির্ধারকেরা প্রকৃত সমস্যার পরিবর্তে ভুল সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেন অথবা সমস্যার প্রকৃত গভীরতা অনুধাবনে ব্যর্থ হন।

একটি ব্যক্তির অবয়র
নিজস্ব ছবি

উদাহরণ, যদি বেকারত্বের হার প্রকৃত অবস্থার তুলনায় কম দেখানো হয়, তা হলে নীতিনির্ধারকেরা মনে করতে পারেন যে, শ্রমের বাজার সন্তোষজনক ভাবে কাজ করছে এবং সে কারণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ করা না-ও হতে পারে। একই ভাবে, যদি দারিদ্র্যের হার কম দেখানো হয়, তা হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পর্যাপ্ত না-ও হতে পারে। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে উন্নতির চিত্র দেখা গেলেও বাস্তবে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সমস্যা বহাল থাকে।

দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান সম্পর্কিত উচ্চ মানের তথ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। প্রথমত, সরকারি সংস্থাগুলোর দ্বারা সংগৃহীত তথ্য কর্মসূচি পরিচালনা, সঠিক প্রাপকের কাছে লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়নে সহায়তা করা। দ্বিতীয়ত, নাগরিক সমাজ ও অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এই তথ্য ব্যবহার করে সরকারি কর্মসূচি ও নীতির প্রভাব বিশ্লেষণ করতে পারে। একই সঙ্গে, সাধারণ মানুষও এই তথ্যের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনের উপযোগী সরকারি ও বাণিজ্যিক পরিষেবায় আরও সহজে যোগদান করতে পারে।

ভুল অর্থনৈতিক তথ্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মূল্যস্ফীতির তথ্য মুদ্রানীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদি মূল্যস্ফীতির হার প্রকৃত অবস্থার তুলনায় কম দেখানো হয়, তা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সুদের হার অস্বাভাবিক ভাবে কম রাখতে পারে, যা মূল্যবৃদ্ধিকে আরও উৎসাহিত করবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করবে। একই ভাবে, রাজস্ব ঘাটতি বা সরকারি ঋণের প্রকৃত তথ্য গোপন করা হলে অর্থনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলো আড়ালে থেকে যায় এবং ভবিষ্যতে আর্থিক সঙ্কটের ঝুঁকি বাড়ে।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যদি কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ প্রকৃত অবস্থার তুলনায় বেশি দেখানো হয়, তা হলে সরকার সম্ভাব্য খাদ্য-সঙ্কটের ঝুঁকি বুঝতে পারবে না। এর ফলে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি, আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং নিম্ন-আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেতে পারে।

বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প সঠিক লক্ষ্যভিত্তিক করতে আর একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়োপযোগী ও নির্ভুল কনজ়িউমার এক্সপেন্ডিচার সার্ভে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত জরুরি, কারণ এর মাধ্যমে জনগণের ভোগব্যয়, জীবনযাত্রার মান এবং দারিদ্র্যের প্রকৃতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।

একই সঙ্গে, পারিবারিক ভোগব্যয় জিডিপি-র একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হওয়ায় এই সংক্রান্ত তথ্য জাতীয় আয় নিরূপণ, এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য অপরিহার্য। ২০১৭-১৮ সালে ভারতের কনজ়িউমার এক্সপেন্ডিচার সার্ভের সমীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়নি, কারণ তথ্যে কিছু সমস্যা ছিল। এই সমীক্ষার ফল প্রকাশ না হওয়ায় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও নীতি নির্ধারণে নানা সমস্যা দেখা দেয়।

সঠিক তথ্যের অভাব শুধু সরকারি নীতি নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের উপর নির্ভর করেন। যখন সরকারি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যসম্পন্ন দেশগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েন।

ফলে বিনিয়োগ হ্রাস পায়, উৎপাদনশীলতা কমে যায়, প্রযুক্তির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয় এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি মন্থর হয়ে পড়ে। দুর্বল তথ্যের ফলে তথ্যের অসমতা (‘ইনফরমেশন অ্যাসিমেট্রি’) তৈরি হয়, এবং এর ফলে একটি দেশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে পড়তে পারে। এই ‘ইনফরমেশন অ্যাসিমেট্রি’ তখন সৃষ্টি হয়, যখন অর্থনীতির বিভিন্ন অংশগ্রহণকারীর কাছে একই পরিমাণ বা একই মানের তথ্য থাকে না। এটি দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আলোচনা করা যাক, জিডিপি সংক্রান্ত তথ্যের নিম্ন মান বা ভুল পরিসংখ্যান একটি দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে কী ভাবে ব্যাহত করতে পারে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন-এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। জিডিপি-র ভবিষ্যৎ বৃদ্ধি নিয়ে অত্যধিক প্রত্যাশা ব্যবসা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে। আইএমএফ জিডিপি-র বৃদ্ধির পূর্বাভাসের তথ্য ব্যবহার করে দেখিয়েছে যে, যে সব দেশ অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিয়ে অবাস্তব বা অত্যধিক আশাবাদী প্রত্যাশা পোষণ করে, পরবর্তী সময়ে সে সব দেশে মন্দা এবং আর্থিক সঙ্কট এবং বৈদেশিক খাতে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি বেশি থাকে। এর মূল কারণ অত্যধিক ঋণ গ্রহণ, যা আদতে ভবিষ্যৎ আয় ও অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা নিয়ে অবাস্তব প্রত্যাশা ।

এ প্রসঙ্গে গ্রিসের উদাহরণটি বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক। ২০১০ সালের গ্রিসের ঋণ সঙ্কটটি অতিরঞ্জিত বা ভুল অর্থনৈতিক তথ্যের কারণে দেখা দেয়। সঙ্কটের আগে, গ্রিস তার জিডিপি-র স্থিতিশীলতা অতিরঞ্জিত করে এবং বিশাল বাজেট ঘাটতি গোপন রেখে নিজেদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়টি আড়াল করেছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক ঋণ বাজারে তথ্যের ক্ষেত্রে এক তীব্র ‘ইনফরমেশন অ্যাসিমেট্রি’ তৈরি হয়। সরকারি তথ্যের ওপর আস্থা রেখে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীরা গ্রিসকে কম ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করেছিল, এবং অত্যন্ত কম সুদের হারে ঋণ দিয়েছিল।

কিন্তু ২০০৯ সালের শেষের দিকে যখন গ্রিস স্বীকার করে যে, তাদের সরকারি তথ্যে প্রচুর ভুল ছিল, তখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থা ও গোপন ঝুঁকির মধ্যে পার্থক্য করতে না পেরে ঋণদাতারা গ্রিসের সব বন্ডকেই (সরকারি ঋণপত্র) ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে এবং অত্যধিক উচ্চ সুদের হার দাবি করে। এই পরিস্থিতি বাজারে এক ভয়াবহ সঙ্কটের জন্ম দেয়, যার ফলে গ্রিস বেসরকারি পুঁজির বাজার থেকেও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হয়।

ফলে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০০৮ সালে ২১.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১১ সালে ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। তাদের ক্ষোভ রাস্তায় সহিংস প্রতিবাদের রূপ নেয়, যা দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দেয়। সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধে আপৎকালীন আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার ওপর গ্রিস নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

চিনের জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে অ্যাকাডেমিক বিতর্ক চলছে। তাদের সরকারি অর্থনৈতিক তথ্যের গুণমান ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বহু গবেষক প্রশ্ন তুলেছেন। একটি গবেষণা প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে, ১৯৭৮ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত চিনের অর্থনীতি সরকারি হিসাব অনুযায়ী বার্ষিক ৯.৬ শতাংশ নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে গড়ে ৭.৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

একই ভাবে, আঞ্চলিক তথ্যের ঘাটতি বা ত্রুটির কারণে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। উন্নয়ন তহবিল ও সরকারি বিনিয়োগ এমন এলাকায় কেন্দ্রীভূত হতে পারে যেখানে উন্নয়নের মাত্রা এমনিতেই বেশি, অথচ অনুন্নত অঞ্চলগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এই বৈষম্য সামাজিক অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে এবং সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

সরকারি কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও নির্ভরযোগ্য তথ্য অপরিহার্য। সঠিক তথ্য ছাড়া কোনও কর্মসূচি তার লক্ষ্য অর্জন করছে কি না, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ফলে অকার্যকরী কর্মসূচিগুলো দীর্ঘ দিন ধরে সরকারি সম্পদের অপচয় ঘটাতে পারে, অন্য দিকে সফল উদ্যোগগুলো প্রয়োজনীয় সম্প্রসারণের সুযোগ না-ও পেতে পারে। এর ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা হ্রাস পায় এবং অপ্রতুল সরকারি সম্পদের অযৌক্তিক বণ্টনও ঘটে।

সার্বিক ভাবে, ত্রুটিপূর্ণ আর্থ-সামাজিক তথ্য একটি অশুভ চক্রের সৃষ্টি করে। ভুল তথ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার ভুল নির্ণয়ের দিকে নিয়ে যায়— ভুল নির্ণয় থেকে আসে ভ্রান্ত নীতিনির্ধারণ ও সম্পদের অদক্ষ বণ্টন— আর এই নীতিগত ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে শ্লথ করে, বৈষম্য বৃদ্ধি করে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করে। তাই তথ্যের গুণগত মান, স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা স্রেফ পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধি, কার্যকর সুশাসন এবং জাতীয় উন্নয়নের মৌলিক পূর্বশর্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *