School Dropout Rate in India: কোন বয়সে ভারতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পড়ুয়া স্কুলছুট হচ্ছে? | At what age does india start losing its own children from school
১৪ থেকে ১৬ বছর বয়স কেন হয়ে উঠছে শিক্ষার পথে বড় বাধা?Image Credit: TV9 Bangla
একটি গ্রামের ছেলে অষ্টম শ্রেণি পাশ করেছে। প্রতিদিন বাড়ির কাছাকাছি স্কুলে হেঁটেই যেত সে। কিন্তু নবম শ্রেণিতে উঠতে হলে এবার তাকে যেতে হবে পাশের শহরের একটি মাধ্যমিক স্কুলে। একা এতটা পথ যাওয়ার অভ্যাস তার নেই। যাতায়াতের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাও নেই। তার উপর স্কুলের খরচও পরিবারের বাজেটের বাইরে। শেষ পর্যন্ত সে আর স্কুলে যায় না। স্কুল ছাড়ার কোনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তও নেয় না সে। নিঃশব্দে পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়। ঠিক যেভাবে বন্যার মতো নয়, বরং ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায় কোনও নদী।
পরিসংখ্যান বলছে, শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ভারতের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিশু হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে ঠিক এই সময়েই। আর এই বয়সকে ঘিরে থাকা পরিসংখ্যানের ছবিটা অধিকাংশ পরিবারের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগজনক।
অষ্টম শ্রেণির পর থেকেই হঠাৎ বাড়ে স্কুলছুটের হার-
কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বশেষ স্কুলশিক্ষা সংক্রান্ত সমীক্ষা UDISE+ অনুযায়ী, ভারতে শিশুদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলছুটের হারও ক্রমশ বাড়তে থাকে। প্রাথমিক স্তরে, অর্থাৎ প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলছুটের হার মাত্র ০.৩ শতাংশ। শিশুদের স্কুলে ভর্তি করা এবং তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই এই হার এতটা কমেছে।
উচ্চ প্রাথমিক স্তরে, অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলছুটের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩.৫ শতাংশে। এই হার এখনও তুলনামূলকভাবে কম হলেও বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে, অর্থাৎ নবম ও দশম শ্রেণিতে স্কুলছুটের হার এক ধাক্কায় বেড়ে ১১.৫ শতাংশে পৌঁছয়। উচ্চ প্রাথমিক স্তরের তুলনায় যা প্রায় চার গুণ এবং প্রাথমিক স্তরের তুলনায় ৩০ গুণেরও বেশি।
একই ছবির আরেকটি দিক উঠে আসে এক শ্রেণি থেকে পরবর্তী স্তরে যাওয়ার পরিসংখ্যানে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা শিশুদের মধ্যে ৯২.২ শতাংশ উচ্চ প্রাথমিক স্তরে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। এই হার যথেষ্ট সন্তোষজনক। উচ্চ প্রাথমিক স্তর শেষ করার পর ৮৬.৬ শতাংশ শিশু মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হয়। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছনোর পর উচ্চ মাধ্যমিক, অর্থাৎ একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা চালিয়ে যায় মাত্র ৭৫.১ শতাংশ।
সহজ কথায়, দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছনো প্রতি চারজন ভারতীয় শিশুর মধ্যে প্রায় একজন পরের বছর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় না।
১৪ থেকে ১৬ বছর বয়স কেন হয়ে উঠছে শিক্ষার পথে বড় বাধা?
প্রশ্ন হল, ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সের এই নির্দিষ্ট সময়টাতেই কেন এত বেশি সংখ্যক শিশু পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে? যেখানে তার আগের শ্রেণিগুলিতে এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যাওয়ার ছবিটা তুলনামূলকভাবে মসৃণ। এর পিছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত কারণ।
প্রথমত, প্রাথমিক স্কুলের তুলনায় মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা অনেক কম এবং সেগুলি অনেক বেশি দূরে দূরে অবস্থিত। ফলে যে শিশুটি এতদিন হেঁটে স্কুলে যেতে পারত, নবম শ্রেণিতে ওঠার পর তাকেই অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়। কখনও বাসভাড়া লাগে, কখনও প্রয়োজন হয় সাইকেলের। কিন্তু পরিবারের পক্ষে সেই খরচ বহন করা সবসময় সম্ভব হয় না।
দ্বিতীয়ত, এর পিছনে রয়েছে আর্থিক কারণ। এই বয়সে কিশোর-কিশোরীরা কাজ করার মতো বয়সে পৌঁছে যায়। আর্থিক অনটনে থাকা পরিবারগুলির কাছে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে সন্তানের উপার্জন বা সংসারের কাজে তার অবদান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বড় পরিবারের ক্ষেত্রে পরিবারের বড় সন্তানের উপর এই চাপ আরও বেশি থাকে।
তৃতীয়ত, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে রয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। স্কুলের দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় যাতায়াতের পথে নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ বাড়ে। এই বয়সে সামাজিক চাপ এবং নানা বিধিনিষেধও অনেক বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।
২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কি আরও কঠিন হয়ে উঠছে?
এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞদের একাংশের উদ্বেগ, বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্কুলশিক্ষার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা ভারতের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হার এখন ১১.৫ শতাংশ। অন্যদিকে, এই স্তরে পড়াশোনা শেষ করা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার হার বা রিটেনশন রেট মাত্র ৪৭.২ শতাংশ। অর্থাৎ, মাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়াদের অর্ধেকেরও কম শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পূর্ণ করতে পারছে।
সর্বজনীন স্কুলশিক্ষার লক্ষ্য জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) ২০২০-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। কিন্তু বর্তমান পরিসংখ্যান সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর পথ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
একবার ভাবুন, ১১ বছর বয়সে একই উচ্চ প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষে পাশাপাশি বসে পড়াশোনা করত দু’জন শিশু। দু’জনের পড়াশোনার মানও প্রায় সমান। কিন্তু একজনের বাড়ি মাধ্যমিক স্কুলের কাছাকাছি। তার পরিবার যাতায়াত, বইপত্র এবং পড়াশোনার অতিরিক্ত খরচ সামলাতে সক্ষম। অন্য শিশুটির বাড়ি অনেক দূরে। তার পরিবারের কাছে স্কুলের জন্য অতিরিক্ত প্রতিটি টাকা খরচ করার অর্থ হল বাড়িভাড়া কিংবা খাবারের খরচে টান পড়া। ১৬ বছর বয়সে পৌঁছতে পৌঁছতে সম্ভবত দেখা যাবে, দু’জনের মধ্যে মাত্র একজন স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই পার্থক্যের সঙ্গে তাদের মেধা কিংবা পরিশ্রমের কোনও সম্পর্ক নেই।
দশম থেকে একাদশ শ্রেণির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতি চারজনের একজন-
দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছনো ভারতীয় কিশোর-কিশোরীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ একাদশ শ্রেণিতে ওঠার আগেই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এই একটি পরিসংখ্যানই জনসাধারণের আরও বেশি মনোযোগ দাবি করে। কারণ, বিষয়টি আসলে মেধা, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কিংবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারের উদাসীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
বরং এর পিছনে রয়েছে কয়েকটি নির্দিষ্ট এবং চিহ্নিত সমস্যা—স্কুলের দূরত্ব, পড়াশোনার খরচ এবং নিরাপত্তার অভাব। আর এই সমস্যাগুলি সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে একটি নির্দিষ্ট বয়সে।
একজন সচেতন নাগরিক কিংবা স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছে তাই প্রশ্নটা শুধু স্কুলছুটের সমস্যা রয়েছে কি না, তা নয়। কারণ, এই সমস্যা যে রয়েছে, তা নিয়ে মোটামুটি সকলেই একমত। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, নিজেদের এলাকায় স্কুলছুটের পিছনে থাকা নির্দিষ্ট সমস্যাগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে কি না।
বাসের রুট নেই, স্কুলের ফি বহন করা সম্ভব হচ্ছে না, কিংবা স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নিরাপদ নয়—এই সমস্যাগুলির সমাধানে আদৌ কোনও পদক্ষেপ করা হয়েছে? নাকি প্রতিদিনের মতোই নীরবে, একজনের পর একজন কিশোর-কিশোরী পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে, আর বিষয়টি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে?
সূত্র: Unified District Information System for Education Plus (UDISE+), ২০২৪-২৫, স্কুলের বিভিন্ন স্তরে স্কুলছুট ও পরবর্তী স্তরে উত্তরণের হার সংক্রান্ত পরিসংখ্যান, কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক; National Education Policy 2020, সর্বজনীন স্কুলশিক্ষার লক্ষ্যমাত্রা।