একসঙ্গেই হাঁটুন না বঙ্গে, তিরে বিরোধীরা
এই সময়, কলকাতা ও শিলিগুড়ি: মাত্র ছ’মাস আগে বঙ্গে বিধানসভা ভোটের কোন্দল ভুলে দিল্লিতে বাম–কংগ্রেসের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে ‘মমতা তৃণমূল’। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে দিল্লির রাজপথে মিছিল–সমাবেশ করেছে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ শিবির। এই আবহে বিরোধীদের পারস্পরিক তিক্ততার ইতিহাস মনে করিয়ে বাংলায় ‘ইন্ডিয়া’ ব্লককে চাপে ফেলার কৌশল নিল বিজেপি।
সেই কৌশলের অঙ্গ হিসেবেই এ বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অধীর চৌধুরী এবং মহম্মদ সেলিমকে একসঙ্গে কলকাতার রাজপথে মিছিল করার পরামর্শ দিলেন শমীক ভট্টাচার্য, স্মৃতি ইরানির মতো বিজেপির শীর্ষ নেতানেত্রীরা। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) সঙ্গে জোট বেঁধে বাম–কংগ্রেস–তৃণমূল ‘ঘোঁট পাকানো’র চেষ্টা করছে বলে এ দিন উত্তরবঙ্গের সভা থেকে তোপ দেগেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।
দিল্লির রামলীলা ময়দান থেকে রবিবার এককাট্টা লড়াইয়ের বার্তা দিতে চেয়েছিল ‘ইন্ডিয়া’ শিবির। কিন্তু বিরোধীরা কি আদৌ একজোট? ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকে চিড় ধরাতে এই প্রশ্নটাই বিভিন্ন মঞ্চ থেকে তুলতে শুরু করেছেন বিজেপির নেতানেত্রীরা। শুধু প্রশ্ন তোলা নয়, ‘ইন্ডিয়া’র শরিকদের পারস্পরিক তিক্ততার ইতিহাসও দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা।
রবিবার রামলীলা ময়দানের বিরোধী সমাবেশে সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে একান্তে কথা বলতে দেখা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। একই মঞ্চে মমতার কানে কানে সিপিএমের এমএ বেবির কথা বলার ছবিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এই সম্প্রীতির ছবিগুলির আড়ালে রেষারেষির গল্পই বেশি— এমনটাই বিজেপি প্রচার করতে শুরু করেছে। তাদের যুক্তি, দিল্লিতে গিয়ে সনিয়া–রাহুলের সঙ্গে মমতা যৌথ আন্দোলন করলেও করলেও বাংলায় প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি অধীর চৌধুরীর সঙ্গে মমতার সম্পর্ক মোটেই ততটা সরল নয়। এ নিয়েই মঙ্গলবার আক্রমণ শাণাতে দেখা যায় বিজেপিকে।
সল্টলেকের একটি হোটেলে মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠক করেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেত্রী স্মৃতি ইরানি এবং রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। সেখানে তাঁরা দু’জন একসুরে প্রশ্ন তোলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অধীর চৌধুরী একসঙ্গে কেন হাঁটছেন না পশ্চিমবঙ্গে?’ স্মৃতির দাবি, ‘পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার আসার পরে কংগ্রেস কর্মীরা নিজেদের অফিস খুলতে পারছেন।’ তাঁর কটাক্ষ, ‘তৃণমূল জমানায় কংগ্রেস কর্মীদের কেন মারা হয়েছে— সেই প্রশ্ন কি (দিল্লির) মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে মমতাকে করেছেন রাহুল গান্ধী? বাংলায় কেন আন্দোলন করছেন না মমতা?’
শমীকের খোঁচা, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয়, যাঁরা এখান থেকে দিল্লি গিয়ে আন্দোলন করছেন, তাঁরা দিল্লি থেকে কলকাতায় ফিরে কোনও আন্দোলন করতে পারছেন না।’ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, ‘অধীর চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় আন্দোলন করুন।’ তাঁর সংযোজন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মহম্মদ সেলিম, অধীর চৌধুরী একটা যৌথ পদযাত্রা করুন। সবাই দেখুক।’
শুভেন্দু এ দিন ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শিলিগুড়িতে মিছিল করেন। মিছিল শেষে তিনি তোপ দাগেন বিরোধী দলগুলির মধ্যে বন্ধুত্বের সমীকরণ নিয়ে। বিশেষ করে ‘মমতা তৃণমূল’কে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘লুঙ্গিবাহিনী আর গুন্ডাবাহিনী ঘরে ঢুকে গিয়েছে। ওরা বাইরে বেরোতে পারছে না। তাই এখন দিল্লিতে গিয়ে লাল–গুন্ডা, ককরোচ, ছারপোকা, ডেঙ্গি-ম্যালেরিয়া, মশা সবাইকে নিয়ে ঘোঁট পাকাতে চাইছে। কোন ঘোঁট চলবে না। গুন্ডামি মেনে নেওয়া হবে না।’ তাঁর সংযোজন, ‘দিল্লিতে গিয়ে দেশে অস্থিরতা ছড়াতে চান পিসি-ভাইপো। কিন্তু মোদী যত দিন আছেন, একটি ভোটেও জিততে পারবেন না ওঁরা।’
‘লাল’দের সঙ্গে তৃণমূলের বন্ধুত্ব যে চিরকালীন নয়, তা সম্প্রতি গড়বেতার সভা থেকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়ে কী ভাবে সিপিএমের হাতে তৎকালীন তৃণমূল কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছিলেন— সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। এ দিন মমতার বিরুদ্ধে সুর আরও চড়িয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘উনি দিল্লিতে গিয়ে ইয়েস পাপা, ইয়েস পাপা করেন! আর বাংলায় এসে বলেন, ইয়েস ঘুসপেঠিয়া, ইয়েস ঘুসপেঠিয়া!’ সোমবার বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন কলকাতায় ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ মিছিলে অংশ নিয়ে বলেছিলেন, ‘ভোটের আগে রাহুল গান্ধী কড়া ভাষায় মমতাকে আক্রমণ করেছিলেন। তৃণমূল সরকারের পরিবর্তন চেয়েছিলেন। সেটা মনে আছে তো!’
যদিও ‘মমতা তৃণমূলে’র বর্ষীয়ান বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, ‘বিরোধীদের এত ভালো ঐক্য দেখে বিজেপি ভয় পেয়েছে। শুধু বাংলা নয়, সব রাজ্যেই ঐক্য হয়েছে। সেই ঐক্যে ফাটল আছে, এটা ভেবে বিজেপি আসলে নিজেরাই নিজেদের সান্ত্বনা দিচ্ছে।’ এক্স হ্যান্ডলে সিজেপির পোস্ট, ‘সিজেপিকে অপ্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করে আপনাদের নিরাপত্তাহীনতাকে আড়াল করতে পারবেন না। আপনাদের মরিয়া ভাব আপনাদের কথার থেকেও স্পষ্ট।’