মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের আজীবনের আইনি রক্ষাকবচ নিয়ে প্রশ্ন, কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে নোটিস সুপ্রিম কোর্টের
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের জন্য ২০২৩ সালের আইনে যে আইনি রক্ষাকবচের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। এই সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলায় বুধবার কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের (ECI) কাছে এই নিয়ম নিয়ে জবাব তলব শীর্ষ আদালতের। বুধবারই নোটিস জারি করা হয়েছে। তবে এখনই ওই আইনি সুরক্ষার উপর কোনও স্থগিতাদেশ জারি করেনি আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ এই মামলার শুনানি করে। আইনজীবী ও সমাজকর্মী অরুণ কুমার আগরওয়াল মামলাটি দায়ের করেছেন। তাঁর আর্জি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, কাজের শর্ত এবং মেয়াদ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হোক।
কী বলা রয়েছে ১৬ নম্বর ধারায়?
২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, দায়িত্ব পালনের সময়ে বা সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য কোনও কাজ, পদক্ষেপ কিংবা মন্তব্যের জন্য কোনও বর্তমান বা প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার অথবা নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা আদালত গ্রহণ করতে পারবে না। অর্থাৎ, সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজের ক্ষেত্রে এই আইনি সুরক্ষা অবসর নেওয়ার পরেও বজায় থাকবে।
আবেদনকারীর বক্তব্য, এই ধারায় কোনও ব্যতিক্রম রাখা হয়নি। কোনও কাজ অসৎ উদ্দেশ্যে করা হলেও, কিংবা সংশ্লিষ্ট আধিকারিক নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কোনও পদক্ষেপ করলেও, এই সুরক্ষার আওতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাঁর মতে, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা বজায় রাখার প্রয়োজন থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে, কমিশনের সদস্যদের আইনি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখা হবে।
কেন এই আইনি সুরক্ষাকে চ্যালেঞ্জ?
আবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের অন্যান্য সাংবিধানিক পদাধিকারীদের ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের সময়ে করা কাজের জন্য যে সুরক্ষা রয়েছে, তা সাধারণত সদিচ্ছা বা সৎ উদ্দেশে কাজের শর্তের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে ১৬ নম্বর ধারা কার্যত কোনও শর্ত ছাড়াই দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনি পদক্ষেপের পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
আবেদনকারীর যুক্তি, কোনও ভোটারের নাম ভুল করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে, কোনও প্রার্থী কমিশনের কোনও পদক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা কমিশনের কাজে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনি সাহায্য পাওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। অযথা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার হাত থেকে কমিশনারদের রক্ষা করতে চাইলে তার জন্য কম কঠোর বিকল্প ব্যবস্থা— যেমন ভিত্তিহীন অভিযোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা বা মামলা শুরুর আগে বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে বলেও আর্জিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগরওয়ালের আরও দাবি, সংসদে পেশ করা মূল বিলে এই ধরনের সম্পূর্ণ আইনি রক্ষাকবচের কথা ছিল না। পরে সংশোধনীর মাধ্যমে ধারাটি যুক্ত করা হয়। কেন এত কঠোর সুরক্ষা প্রয়োজন, তা যথেষ্ট যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়নি বলেও অভিযোগ আবেদনকারীর।
SIR বিতর্কের আবহে তাৎপর্য
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে যখন একাধিক প্রশ্ন উঠেছে, সেই সময়েই শীর্ষ আদালতে উত্থাপিত হলো এই মামলা। SIR প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ভোটারদের নাম বাদ পড়া এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে অ্যাসোসিয়েশন অফ ডেমোক্রেটিক রিফর্ম (ADR) এবং Lok Prahari-র মতো সংস্থাও ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। সেই মামলাগুলিও আদালতে বিবেচনাধীন। নতুন মামলায় কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের জবাব পাওয়ার পরে ধারাটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া এগোবে।
FAQ
প্রশ্ন ১: মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের আইনি রক্ষাকবচ নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট?
উত্তর: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজের জন্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার হাত থেকে যে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, তার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সুপ্রিম কোর্টে।
প্রশ্ন ২: ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারায় কী বলা রয়েছে?
উত্তর: ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও মেয়াদ সংক্রান্ত আইনের ১৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, দায়িত্ব পালনের সময়ে বা সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য করা কোনও কাজ, পদক্ষেপ কিংবা মন্তব্যের জন্য বর্তমান বা প্রাক্তন CEC ও নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা আদালত গ্রহণ করতে পারবে না।
প্রশ্ন ৩: এই আইনি সুরক্ষা কি অবসর নেওয়ার পরেও বহাল থাকে?
উত্তর: হ্যাঁ। আইনের ১৬ নম্বর ধারায় সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজের ক্ষেত্রে বর্তমান ও প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনারদের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, অবসরের পরেও এই আইনি রক্ষাকবচ বজায় থাকে।
প্রশ্ন ৪: কে এই আইনি রক্ষাকবচকে চ্যালেঞ্জ করেছেন?
উত্তর: আইনজীবী ও সমাজকর্মী অরুণ কুমার আগরওয়াল জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণার আবেদন জানিয়েছেন।
প্রশ্ন ৫: আবেদনকারীর প্রধান আপত্তি কী?
উত্তর: আবেদনকারীর বক্তব্য, এই ধারায় কোনও ব্যতিক্রম রাখা হয়নি। ফলে অসৎ উদ্দেশ্যে বা এক্তিয়ার বহির্ভূত কাজের ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি কমিশনারদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন ৬: সুপ্রিম কোর্ট কি আপাতত ১৬ নম্বর ধারার উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে?
উত্তর: না। বুধবার কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নোটিস পাঠিয়ে জবাব তলব করেছে শীর্ষ আদালত। তবে এই পর্যায়ে আইনের ১৬ নম্বর ধারার উপর কোনও স্থগিতাদেশ জারি করা হয়নি।
প্রশ্ন ৭: SIR বিতর্কের সঙ্গে এই মামলার সম্পর্ক কী?
উত্তর: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটারদের নাম বাদ পড়া এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটও আবেদনকারীর মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৮: ADR এবং Lok Prahari-ও কি এই আইনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে?
উত্তর: হ্যাঁ। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (ADR) এবং Lok Prahari-র মতো সংস্থাও ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। তাদের মামলাও বিচারাধীন।
প্রশ্ন ৯: নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: নির্বাচন কমিশনাররা যাতে দায়িত্ব পালনের সময় ভিত্তিহীন, হয়রানিমূলক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার চাপে না পড়েন, সেই উদ্দেশ্যে আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এই সুরক্ষার পরিধি ও সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েই আদালতে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশ্ন ১০: সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
উত্তর: কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জবাব পাওয়ার পরে আদালত আইনের ১৬ নম্বর ধারার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে শুনানি চালাতে পারে। তবে ধারাটি বাতিল হবে কি না, সে বিষয়ে এখনই কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।