দীপাবলির আলো জ্বলে কেন? জানুন ইতিহাস, তাৎপর্য ও লক্ষ্মীপুজোর সময়

কলকাতা: অন্ধকারের উপর আলোর জয়, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং নতুন আশার সূচনা। এই বার্তাই বহন করে দীপাবলি (Diwali 2026) বা আলোর উৎসব। ভারতের অন্যতম বড় এই উৎসব ঘিরে প্রতি বছর মেতে ওঠেন দেশের কোটি কোটি মানুষ। বাড়ি সাজানো, প্রদীপ জ্বালানো, রংবেরঙের আলপনা, মিষ্টিমুখ এবং লক্ষ্মী-গণেশের পুজোয় উদযাপিত হয় দীপাবলি। তবে শুধু একটি পৌরাণিক কাহিনি নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই উৎসবের তাৎপর্য।
২০২৬ সালে দীপাবলি পালিত হবে ৮ নভেম্বর, রবিবার। হিন্দু চান্দ্র পঞ্জিকার কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে মূলত এই উৎসব উদযাপিত হয়। এই দিন সন্ধ্যায় দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের পুজো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস করা হয়, নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো এবং প্রদীপ জ্বালালে ঘরে সুখ, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্য আসে।
দীপাবলি ২০২৬: লক্ষ্মীপুজোর সময়সূচি
২০২৬ সালের ৮ নভেম্বর কার্তিক অমাবস্যায় পালিত হবে দীপাবলি। প্রদত্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুজোর শুভ সময়সূচি হল:
- লক্ষ্মীপুজো: ৮ নভেম্বর, রবিবার
- লক্ষ্মীপুজোর মুহূর্ত: বিকেল ৫টা ৫৪ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিট
- পুজোর সময়কাল: ১ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট
- প্রদোষ কাল: বিকেল ৫টা ৩১ মিনিট থেকে রাত ৮টা ৯ মিনিট
- বৃষভ কাল: বিকেল ৫টা ৫৪ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিট
- অমাবস্যা তিথি শুরু: ৮ নভেম্বর সকাল ১১টা ২৭ মিনিট
- অমাবস্যা তিথি শেষ: ৯ নভেম্বর দুপুর ১২টা ৩১ মিনিট
কেন পালিত হয় দীপাবলি? রয়েছে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি
দীপাবলির মূল বার্তা হল অন্ধকারের উপর আলোর জয়, অজ্ঞতার উপর জ্ঞানের জয় এবং অশুভের উপর শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা। তবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসব পালনের পিছনে রয়েছে আলাদা আলাদা ধর্মীয় বিশ্বাস ও কাহিনি।
রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন
দীপাবলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামায়ণের একটি জনপ্রিয় কাহিনি। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, ১৪ বছরের বনবাস শেষ করে স্ত্রী সীতা এবং ভাই লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন ভগবান রাম। তার আগে লঙ্কার রাজা রাবণকে পরাজিত করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি।
কথিত আছে, রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে অযোধ্যার মানুষ গোটা নগরী প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে তুলেছিলেন। সেই থেকেই দীপাবলিতে সারি সারি মাটির প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা প্রচলিত হয়েছে বলে মনে করা হয়। এই কাহিনি ন্যায় ও ধর্মের জয়ের প্রতীক।
নরকাসুর বধ ও কৃষ্ণের বিজয়
দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলে দীপাবলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভগবান কৃষ্ণের নরকাসুর বধের কাহিনি। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, নরকাসুর অত্যাচারী শাসকে পরিণত হয়েছিল এবং বহু নারীকে বন্দি করে রেখেছিল। ভগবান কৃষ্ণ তাকে পরাজিত করে বন্দিদের মুক্ত করেন এবং শান্তি ফিরিয়ে আনেন।
এই ঘটনাকে স্মরণ করা হয় নরক চতুর্দশীতে, যা অনেক জায়গায় ছোট দীপাবলি নামেও পরিচিত। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং নতুন আশার সূচনাই এই উদযাপনের মূল বার্তা।
লক্ষ্মী-গণেশের পুজোর তাৎপর্য
দীপাবলির অন্যতম প্রধান আচার হল দেবী লক্ষ্মী এবং ভগবান গণেশের পুজো। দেবী লক্ষ্মীকে সম্পদ, সৌভাগ্য, প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির দেবী হিসেবে মানা হয়। অন্যদিকে, ভগবান গণেশ বিঘ্নহর্তা এবং জ্ঞান ও শুভ সূচনার প্রতীক।
বিশ্বাস করা হয়, দীপাবলির সন্ধ্যায় ঘর পরিষ্কার করে প্রদীপ জ্বালিয়ে লক্ষ্মী ও গণেশের পুজো করলে পরিবারে সুখ-সমৃদ্ধি আসে। কিছু প্রথায় সম্পদের দেবতা কুবেরেরও পুজো করা হয়।
শিখ ও জৈন ধর্মেও দীপাবলির বিশেষ গুরুত্ব
দীপাবলি শুধু হিন্দু ধর্মের উৎসব নয়। শিখ ও জৈন সম্প্রদায়ের কাছেও এই দিনটির আলাদা ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে।
শিখ ধর্মে বন্দি ছোড় দিবস: দীপাবলির দিন শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ বন্দি ছোড় দিবস পালন করেন। এই দিনটি ষষ্ঠ শিখ গুরু গুরু হরগোবিন্দ সাহিবজির গ্বালিয়র দুর্গ থেকে মুক্তির স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। শিখ ঐতিহ্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে ৫২ জন হিন্দু রাজাও মুক্তি পেয়েছিলেন। এই দিন স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতার বার্তা বহন করে। গুরুদ্বারগুলি আলোয় সাজানো হয় এবং বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
জৈন ধর্মে মহাবীরের নির্বাণ: জৈন সম্প্রদায়ের কাছে দীপাবলি হল ২৪তম তীর্থঙ্কর ভগবান মহাবীরের নির্বাণলাভের স্মরণদিবস। জৈন বিশ্বাস অনুযায়ী, বর্তমান বিহারের পাপাপুরীতে তিনি মোক্ষ লাভ করেছিলেন। তাঁর অহিংসা, সত্য, আত্মসংযম এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির শিক্ষাকে স্মরণ করেন ভক্তরা। এই দিন প্রদীপ জ্বালানোর মধ্যেও অজ্ঞতা দূর করে অন্তরের জ্ঞানের আলো জ্বালানোর প্রতীকী অর্থ রয়েছে।
দীপাবলি শব্দের অর্থ কী?
‘দীপাবলি’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘দীপাবলী’ থেকে। এর অর্থ প্রদীপের সারি বা একাধিক প্রদীপের সমাহার। সময়ের সঙ্গে ‘দীপাবলি’ থেকেই ‘দেওয়ালি’ বা ‘দীপাবলি’ নামটি প্রচলিত হয়েছে।
এই উৎসবে বাড়ির প্রবেশপথ, জানলা, বারান্দা, উঠোন এবং পুজোর জায়গায় মাটির প্রদীপ সাজানো হয়। পাশাপাশি রঙিন আলপনা, আলো, মিষ্টি এবং উপহারের মাধ্যমে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন পরিবারের সদস্যরা।
পাঁচ দিন ধরে চলে দীপাবলির উৎসব
দীপাবলি সাধারণত পাঁচ দিনের উৎসব হিসেবে পালিত হয়। প্রতিটি দিনের রয়েছে নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। ধনতেরস, নরক চতুর্দশী, দীপাবলি, গোবর্ধন পুজো এবং ভাইফোঁটা বা ভাইদূজ, এই পাঁচটি পর্ব ঘিরে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। অঞ্চল ও পঞ্জিকাভেদে আচার-অনুষ্ঠানের তারিখে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে দীপাবলি উদযাপন
ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতিফলন দেখা যায় দীপাবলি উদযাপনের মধ্যেও।
- উত্তর ভারত: ভগবান রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের স্মরণে বাড়ি ও মন্দির প্রদীপ এবং আলোয় সাজানো হয়।
- দক্ষিণ ভারত: নরকাসুর বধের কাহিনি বিশেষ গুরুত্ব পায়। নরক চতুর্দশীতে ভোরের স্নান এবং নানা ধর্মীয় আচার পালিত হয়।
- পশ্চিম ভারত: লক্ষ্মীপুজোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের খাতা পুজো করেন। গুজরাতের অনেক জায়গায় দীপাবলির পর শুরু হয় নতুন বছর।
- পূর্ব ভারত: পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও অসমের বহু জায়গায় দীপাবলির সময় বিশেষ গুরুত্ব পায় কালীপুজো। দেবী কালীর আরাধনায় মেতে ওঠেন ভক্তরা।
- শিখ সম্প্রদায়: বন্দি ছোড় দিবস উপলক্ষে গুরুদ্বার আলোয় সাজানো হয়।
- জৈন সম্প্রদায়: মহাবীরের নির্বাণ স্মরণ করে তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষা নিয়ে আলোচনা ও প্রার্থনা করা হয়।
প্রদীপ জ্বালানোর তাৎপর্য কী?
দীপাবলিতে মাটির প্রদীপ জ্বালানো শুধু একটি প্রথা নয়, এর রয়েছে গভীর প্রতীকী অর্থ। প্রদীপের আলো অন্ধকার দূর করে। একইভাবে মানুষের জীবন থেকে অজ্ঞতা, নেতিবাচকতা ও অশুভ চিন্তা দূর করে জ্ঞান, আশা এবং ইতিবাচকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেয় এই উৎসব।
বাড়ির প্রবেশপথ থেকে শুরু করে জানলা, বারান্দা, উঠোন ও মন্দিরে প্রদীপ সাজিয়ে রাখেন মানুষ। উৎসবের এই আলো পরিবার ও সমাজের মধ্যে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা এবং আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
দীপাবলি কেবল আলোর উৎসব নয়, এটি একসঙ্গে থাকার, পুরনো সম্পর্ক নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার এবং নতুন আশায় জীবন শুরু করার উপলক্ষ। রামের অযোধ্যায় ফেরা হোক, কৃষ্ণের নরকাসুর বধ কিংবা মহাবীরের নির্বাণ, প্রতিটি কাহিনির মধ্যেই রয়েছে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর জয় এবং সত্য ও জ্ঞানের পথে এগিয়ে চলার বার্তা।