তপনের জেলযাত্রার জল্পনায় বাম-পদ্মের সংঘাত
সুমন ঘোষ, খড়্গপুর
রাজনৈতিক হিংসা ও অস্থিরতায় এক সময়ে দিনের পর দিন খবরের শিরোনামে থাকত গড়বেতা-কেশপুর। বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে গড়বেতার বিজেপি বিধায়ক প্রদীপ লোধা ঘোষণা করেন, গড়বেতা এ বার সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও শান্তির পীঠস্থান হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই শান্তি বিঘ্নিত করতেই কি সংখ্যালঘু এলাকায় ‘হার্মাদ বাহিনী’ তৈরি করছেন তপন ঘোষ! সেই কারণেই কি তাঁকে জেলে ভরার জন্য খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হুঁশিয়ারি!
প্রদীপের অভিযোগ, ‘গণতান্ত্রিক ভাবে পরাজয় মানতে না পেরে তপন ঘোষ সংখ্যালঘুদের নিয়ে হার্মাদ বাহিনী তৈরির চেষ্টা করছেন। বলে বেড়াচ্ছেন, হার্মাদ বাহিনী গড়বেতা দখল করবে। আর তাই গড়বেতায় ফের রাজনৈতিক হিংসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।’ বিজেপির দাবি, সংখ্যালঘু গ্রামগুলিতে গিয়ে তপনের ‘হার্মাদ বাহিনী’ তৈরির খবর গোয়েন্দাদের কাছেও রয়েছে।
বাম আমলে যে ২৫ জন দলীয় কর্মী খুন হয়েছিলেন, তাঁদের পরিবারও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছেন, খুনের পিছনে যাঁরা ছিলেন সেই সিপিএম নেতা তপন ঘোষ, সুকুর আলি, সুশান্ত ঘোষরা কেন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবেন? প্রদীপের কথায়, ‘গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং খুন, ধর্ষিতা হওয়া ওই সব পরিবারের অনুরোধে মুখ্যমন্ত্রী বিচলিত। প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে তাই তিনি বলেছেন, তপন ঘোষের জেলে থাকা উচিত।’
গড়বেতায় গেরুয়া শিবিরের উত্থান ১৯৮৯ তে। ১৯৯৮ তে দলের জেলা সভাপতি রমাপ্রসাদ তিওয়ারির হাত ধরে গড়বেতা, সানমুড়া, ধাদিকা ও শ্যামনগর–– এই চারটি গ্রাম পঞ্চায়েত দখল করেছিল বিজেপি। পরে অবশ্য রমাপ্রসাদ তৃণমূলে চলে যান। বিজেপিকে দমাতে রাজনৈতিক সংঘর্ষ থেকে খুনের ঘটনাও ঘটে। এ প্রসঙ্গে রমাপ্রসাদ বলেন, ‘বামেদের অত্যাচারের প্রতিবাদে প্রথম বিজেপিই লড়াই শুরু করেছিল গড়বেতায়। সিপিএমের রক্তচক্ষুকে অবহেলা করেও মানুষ ১৯৯৮তে চারটি পঞ্চায়েতে বিজেপিকে জিতিয়েছিল।’
পরবর্তী কালে তৃণমূল-বিজেপির জোটে ধীরে ধীরে এলাকায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে বিজেপি। তবে প্রদীপের মতো কয়েক জন দলের পতাকা ধরে রেখেছিলেন। তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনে অবশ্য সিপিএম তেমন কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারেনি। তাদের অস্তিত্ব বলতে ছিল গড়বেতার জোনাল অফিস। দলের বেশিরভাগ নেতাই তখন মেদিনীপুর বা অন্য শহরে চলে গিয়েছিলেন। রাজ্যে পালাবদলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এলাকায় ফের মাথা তুলতে চাইছে সিপিএম। মুখ্যমন্ত্রীও ইতিমধ্যেই বলেছেন, ‘আজ তৃণমূলের নামও নেই, নিশানও নেই। মুছে গিয়েছে। তারই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে কঙ্কালকান্ডের নায়করা।’
গড়বেতা দেখেছে ছোট আঙারিয়ার গণহত্যা। যেখানে গুলি চালানোর পরে বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে কয়েকজনকে মেরে ফেলার অভিযোগ উঠেছিল। দেখেছে দেশি কামান ভক্সল–এর (পা দিয়ে চাপলে দূরে গিয়ে পড়ত গোলা। তারপর ফাটত। একবার ব্যবহারে এতটাই গরম হয়ে যেত যে বেশ কিছুক্ষণ পরে দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা যেত) আমদানি। সাক্ষী থেকেছে ঘর পোড়ানো, ধর্ষণ, খুন, লুটপাট, কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে এলাকা পাহারার ছবির। স্থানীয়দের দাবি, এ সব কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে তপন ঘোষের নাম। এক সময় এখানে চালু ছিল, ‘তপন-সুকুরের কথা ছাড়া গড়বেতায় গাছের পাতাও নড়ে না’। বিজেপির বক্তব্য, তারা চায় না সেই সব কালো দিন আর ফিরুক।
গেরুয়া শিবিরের এ সব অভিযোগের জবাবে সিপিএমের পাল্টা দাবি, তপন ঘোষের নেতৃত্বে মানুষ ধীরে ধীরে সিপিএমের দিকে ঝুঁকছে। সেটা বুঝেই বিজেপি রাষ্ট্রক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এমন হুমকি দিচ্ছে। শুধু গড়বেতা নয়, কেশপুর-সহ পশ্চিম মেদিনীপুরের সমস্ত বিধানসভায় সিপিএমকে ভয় দেখাতেই এমন হুঁশিয়ারি। যাতে আতঙ্কিত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও। বিজেপি মনে করছে এতে সিপিএমের রাজনৈতিক কার্যকলাপ থমকে যাবে। কারণ, ওরা জানে গড়বেতায় তপন ঘোষের জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা কতটা।
সিপিএমের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সম্পাদক বিজয় পাল বলেন, ‘আসলে লালঝান্ডাকে ভয় পাচ্ছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রীর নিজের ফাইলও তো ওপেন রয়েছে। উনি আইন মেনে সব রি-ওপেন করুন না। তার আগে উনি প্রতিশ্রুতি মতো উন্নয়নের কাজগুলো করে দেখান। আমাদের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। এ ভাবে আখেরে আটকানো যাবে না।’