বিশ্বমঞ্চে ভারতের জয়জয়কার! প্যারিসের ল্যুভরকে পিছনে ফেলে সেরার তালিকায় ‘বিহার মিউজ়িয়াম’
বিশ্ব মঞ্চে ঐতিহাসিক নজির গড়ল ভারতীয় ঐতিহ্য। ২০২৬ সালের বিশ্বের সেরা ১০০টি জাদুঘরের তালিকায় প্যারিসের ল্যুভর ও নিউ ইয়র্কের ‘দ্য মেট’-কে পেছনে ফেলে নবম স্থান ছিনিয়ে নিয়েছে পাটনার ‘বিহার মিউজ়িয়াম’। ‘ওয়ার্থ আ জার্নি’-র আন্তর্জাতিক তালিকায় এশিয়ার মধ্যে প্রথম স্থান দখল করেছে এই সংগ্রহশালা।
ভারত ও জাপানের যৌথ স্থাপত্যশৈলী
বেইলি রোডের উপর ১৩ একরের বেশি বিস্তৃত এই ক্যাম্পাস আধুনিক স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। প্রিটজকার পুরস্কারজয়ী (Pritzker Architecture Prize) জাপানি স্থপতি ফুমিহিকো মাকি এবং মুম্বইয়ের অপোলিস আর্কিটেক্টস যৌথ ভাবে এর নকশা করেছে। একটি বিশাল ভবনের পরিবর্তে এখানে তৈরি হয়েছে একাধিক প্যাভিলিয়ন।
প্রস্তরযুগ থেকে ১৭৬৪ সালের ইতিহাসের যাত্রা
জাদুঘরের গ্যালারিগুলি দর্শকদের সামনে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস তুলে ধরবে। প্রাগৈতিহাসিক প্রস্তরযুগ থেকে শুরু করে ১৭৬৪ সাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক বিবরণ এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ১৭৬৪ সালের পরের ঔপনিবেশিক ও আধুনিক যুগের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলি সংরক্ষিত রয়েছে পাটনা মিউজ়িয়ামে।

দুই জাদুঘরকে জুড়ছে ভূগর্ভস্থ টানেল
ইতিহাসের দুই ভিন্ন পর্বকে এক সুতোয় বাঁধতে তৈরি হচ্ছে ১.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ হেরিটেজ ট্রানজিট টানেল। এই সুরঙ্গপথ পুরনো পাটনা মিউজিয়াম এবং বিহার মিউজিয়ামকে সরাসরি যুক্ত করবে। এর ফলে দর্শকরা নির্বিঘ্নে হেঁটে বিহারের সম্পূর্ণ ইতিহাস একবারে দেখার সুযোগ পাবেন।

বিশ্বমঞ্চে সেরা ১০০-তে একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি
আন্তর্জাতিক এই তালিকায় বিহার মিউজিয়াম স্থান করে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। বিশ্বের সেরা ১০০টি জাদুঘরের তালিকায় জায়গা পাওয়া একমাত্র ভারতীয় প্রতিষ্ঠান হলো এই বিহার মিউজিয়াম। প্রাচীন স্থানীয় ইতিহাসকে বিশ্বমানের আধুনিক প্রদর্শনীর সঙ্গে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান মিলেছে।

প্রবাসী বিহারিদের ইতিহাস ও ডায়াসপোরা গ্যালারি
ঐতিহাসিক নিদর্শনের বাইরে এটি একটি অত্যন্ত সক্রিয় ও আধুনিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানে রয়েছে একটি বিশেষ ‘ডায়াসপোরা গ্যালারি’। দেশ ও সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিহারিদের ইতিহাস, তাঁদের জীবনসংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে এই বিভাগে।
শিশুদের গ্যালারি ও ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ
সাধারণ জাদুঘরের কড়া নিয়মের বাইরে এসে এখানে ছোটদের জন্য তৈরি হয়েছে ইন্টারঅ্যাকটিভ ‘চিলড্রেনস গ্যালারি’। স্পর্শযোগ্য নানা ঐতিহাসিক খেলার মাধ্যমে শিশুরা আনন্দ নিয়ে ইতিহাস শিখতে পারে। এ ছাড়া চত্বরে রয়েছে ‘পটবেলি’ নামের একটি আধুনিক রেস্তোরাঁ, যেখানে খাঁটি বিহারি আঞ্চলিক খাবারকে আধুনিক সাজে পরিবেশন করা হয়।

মৌর্য যুগের দিদারগঞ্জ যক্ষী ও অমূল্য প্রত্নসম্পদ
এই জাদুঘরের সবচেয়ে মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হলো মৌর্য যুগের বিশ্বখ্যাত ‘দিদারগঞ্জ যক্ষী’। চুনার বেলেপাথরে তৈরি এই পূর্ণাবয়ব ভাস্কর্যটি প্রায় ২,৩০০ বছরের পুরনো। হাজার হাজার বছর পেরিয়েও এর আয়নার মতো মসৃণ চকচকে পালিশ আজও অটুট। এ ছাড়াও এখানে রয়েছে প্রাচীন কুরকিহার ব্রোঞ্জ মূর্তি, ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি এবং শত শত বছরের পুরনো বৌদ্ধ ভাস্কর্য।

ভারতের প্রথম জাদুঘর বিয়েনালের আসর
আন্তর্জাতিক শিল্পকলার ক্যালেন্ডারে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে এটি ‘বিহার মিউজিয়াম বিয়েনালে’-র আয়োজন করে থাকে। এটি ভারতে কোনো জাদুঘরের উদ্যোগে হওয়া প্রথম বিয়েনালে। এই আন্তর্জাতিক উৎসবে যোগ দিতে বিশ্বের নানা প্রান্তের শিল্পী, কিউরেটর ও সাংস্কৃতিক নির্দেশকেরা পাটনায় আসেন। তাঁরা এখানে নানা মাস্টারক্লাস, বিশেষ প্রদর্শনী এবং জাদুঘর পরিচালনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন। এর মাধ্যমে সমকালীন বৈশ্বিক শিল্প ও ঐতিহ্যের আলোচনার এক প্রাণবন্ত আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে পাটনা।