একদিকে বন্ধ দোকান, অন্যদিকে উৎসবের মেজাজ
অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, নয়াদিল্লি
‘ইতনা সান্নাটা কিঁউ হ্যায় ভাই?’ দিওয়ালির ঠিক এক সপ্তাহ আগে দিল্লির বিখ্যাত পাইকারি বাজার চাঁদনি চকের সামনে দাঁড়িয়ে ‘শোলে’ সিনেমার এই সংলাপটাই মনে পড়ল৷ রবিবার দিল্লির চাঁদনি চক, চাওড়ি বাজার, সদর বাজার, খাড়ি বাওলি, কনৌট প্লেস মার্কেটগুলোতে সরকারি ছুটির দিন৷ তবে দিওয়ালির আগে সেখানে অন্য ছবি। সেই সময়ে রবিবার–সহ সপ্তাহের সাত দিনই খোলা থাকার কথা ওই অঞ্চলের সব দোকানপাট, কিন্তু রামলীলা ময়দানে বিরোধী সমাবেশের জেরে রবিবার দিল্লির এই সব বাজার পুরো সুনসান!
এক সপ্তাহ পরেই দিওয়ালি, বিক্রিবাটার সময়, কিন্তু বিরোধী সমাবেশকে ঘিরে অশান্তির ভয়ে চাঁদনি চক, সদর বাজার, কনট প্লেসে রবিবার দোকান খোলেননি অধিকাংশ ব্যবসায়ী৷ ফলে, বড় অঙ্কের ব্যবসায়িক ক্ষতি! এই আশঙ্কা থেকেই দিল্লির বণিক সংগঠন (সিটিআই) লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সনিয়া গান্ধীকে চিঠি লিখে রামলীলার সমাবেশের দিন পিছিয়ে দেওয়া বা সমাবেশের স্থান পরিবর্তন করার অনুরোধ জানিয়েছিল৷ কিন্তু চিঠিগুলোর জবাব দেননি রাহুল বা সনিয়া৷ উল্টে শনিবার রাতে নিজের এক্স হ্যান্ডলে রাহুল অনুরোধ করেছিলেন, মিছিলে যোগদানকারী জনতা যেন ব্যবসায়ীদের কথা ভেবে ফেরার আগে কিছু কেনাকাটাও করেন৷
রাহুলের এই আবেদন কাজে দেয়নি, কারণ অর্ধেক দোকানই বন্ধ! কংগ্রেস সাংসদ রাহুলের দাবি, ‘বিজেপি দোকানিদের ভয় দেখিয়ে জবরদস্তি দোকান বন্ধ করিয়েছে! আপনারাই বিচার করুন, কারা ব্যবসায়ীদের ক্ষতি করছে!’ ব্যবসায়ীরা অবশ্য এই রাজনৈতিক তরজায় জড়াতে নারাজ। ঝিমিয়ে থাকা চাঁদনি চকে রবিবার দোকান খুলেছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী হরিরাম শর্মা৷
তাঁর সাফ কথা, ‘বিরোধী দলগুলো বলছে আমাদের ভোট চুরি করা হয়েছে৷ যারা চোর তাদের বিচার করা হবে৷ খুব ভালো কথা৷ কিন্তু, রামলীলার সমাবেশের জন্য আমাদের একদিনের লাভের টাকাও তো চুরি হলো! এর বিচার কে করবে?’ নয়াদিল্লির বণিক সংগঠনের প্রেসিডেন্ট অতুল ভার্গবেরও দাবি, ‘ফের একবার রাজনৈতিক সমাবেশের জন্য ভুগতে হলো কনৌট প্লেসকে! অশান্তির ভয়ে কে আসবে? আমাদের রুটিরুজির কথা ভেবেই এখানে কোনও মিছিল–প্রতিবাদ করতে দেওয়া উচিত নয়, এই মর্মে কোর্ট অর্ডার জারি হওয়া উচিত।’
একদিকে যখন ব্যবসায়ী ক্ষোভের আঁচ, অন্যদিকে তখন রামলীলা ময়দানে পুরো উত্সবের আমেজ৷ রাহুলের ডাকে সাড়া দিয়ে রবিবার রামলীলায় এসেছিলেন হিমাচল প্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানার অসংখ্য মানুষ। যুব সমাজ এবং মহিলাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো৷ দুপুর ১২টায় রামলীলা ময়দানে সভা শুরুর কথা থাকলেও বিরোধী নেতানেত্রীরা দেরিতে আসার কারণে সভা শুরু হয় প্রায় দুপুর তিনটে নাগাদ৷ আসলে বিরোধী নেতাদের মিছিল আটকে গিয়েছিল জনতার ভিড়ে৷ কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবন থেকে হুডখোলা গাড়িতে রামলীলা ময়দানের দিকে রওনা দিয়েছিলেন বিরোধী শিবিরের নেতানেত্রীরা৷ চালকের পাশের আসনে ছিলেন রাহুল গান্ধী নিজে৷
তৃতীয় সারিতে সপা সুপ্রিমো অখিলেশ যাদবের সঙ্গে বসে ছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ বিরোধী শিবিরের হেভিওয়েট নেতাদের রামলীলায় পৌঁছতে দেরি হওয়ায় উদ্যোক্তারা একটা সময়ে রীতিমতো চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন৷ লাউড স্পিকারে একের পর এক গান দেশাত্মবোধক গান বাজিয়ে সমাবেশের আবহ ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান তাঁরা৷ গানের তালে আমজনতার পাশাপাশি তাল মেলাতে দেখা যায় তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের মতো বিরোধী শিবিরের রাজনীতিকদেরও৷
বিভিন্ন বিরোধী দলের নিশান এবং জাতীয় পতাকায় মোড়া রামলীলায় চোখে পড়েছে ‘সার’ এবং জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী প্রচুর পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন৷ সমাবেশ চলাকালীন পিকনিকের মুডে বিক্রি হতে থাকে বাদাম, পাঁপড়, কোল্ড ড্রিঙ্কসও৷ কংগ্রেস সেবাদলের কর্মীদের দেখা যায় পাঁপড়, প্যাটিস, জলের বোতল, জাতীয় পতাকা বিলি করতে৷ দিল্লি পুলিশও রামলীলার এ দিনের ফেস্টিভ মুডকে এনজয় করেছে৷ রাহুল অভিযোগ তুলেছিলেন, অমিত শাহের পুলিশ জনসাধারণকে রামলালী পর্যন্ত আসতে না দেওয়ার ছক কষছে। রবিবার কিন্তু তেমন কোনও ছবি দেখা গেল না। বরং চার হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীর বলয়ে মোড়া রামলীলায় সমাবেশ শেষ হয়েছে নিরাপদে, কোনও অশান্তি ছাড়াই। বিজেপির শুধু কটাক্ষ, ‘এত শোরগোল করেও অর্ধেক ময়দান তো ফাঁকা!’