Children in Relief Camps: থোইবার বাড়ি: পাঁচ বছরের যে শিশু নিজের বাড়ির চেয়েও বেশি চেনে ত্রাণশিবিরকে | Thoiba’s Home: The story of a five year old who knows a relief camp better than his own home - 24 Ghanta Bangla News
Home

Children in Relief Camps: থোইবার বাড়ি: পাঁচ বছরের যে শিশু নিজের বাড়ির চেয়েও বেশি চেনে ত্রাণশিবিরকে | Thoiba’s Home: The story of a five year old who knows a relief camp better than his own home

Spread the love

প্রতীকী ছবি। পড়ুন টিভি৯ বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন Image Credit: TV9 Bangla

থোইবা মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “মা, আমাদের যদি বাড়ি থাকে, তা হলে আমরা সেখানে থাকি না কেন?” রাতের খাবার তৈরির জন্য তখন চাল বাছছিলেন তাঁর মা। ছেলের প্রশ্ন শুনে হঠাৎ থেমে গেল তাঁর হাত। মাত্র পাঁচ বছরের একটি শিশু এমন প্রশ্ন করেছে, যার উত্তর দিতে চাইলেও কীভাবে বোঝাবেন, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি। যে সমস্যার সমাধান বড়রাই তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে খুঁজে পাননি, তা পাঁচ বছরের শিশুকে কীভাবে বোঝাবেন?

চালের মধ্যে থেকে একটি ছোট পাথর তুলে নিয়ে তিনি বললেন, “এখনও সেখানে ফেরা সম্ভব নয়, সোনা।” কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবল থোইবা। তারপর ফের প্রশ্ন করল, “তা হলে আমাদের বাড়িটাকেই এখানে নিয়ে আসছি না কেন?” ছেলের দিকে তাকালেন মা। শিশুর সরল প্রশ্নে হাসতে ইচ্ছে করছিল তাঁর। কিন্তু তার আগেই চোখে জল চলে এল। থোইবা ভাবল, নিশ্চয়ই সে কোনও ভুল কথা বলে ফেলেছে। চুপচাপ বাইরে চলে গেল সে। সেদিন দুপুরে এমন একটি বিষয় শিখল, যা কোনও শিশুর এত অল্প বয়সে শেখার কথা নয়। কিছু প্রশ্ন মাকে কষ্ট দেয়।

২০২১ সালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য মণিপুরের একটি ছোট শহরে জন্ম থোইবার। তার বাবা একটি ছোট দোকান চালাতেন। সেখানে চাল, রান্নার তেল, নুন, সাবান, বিস্কুট এবং রংবেরঙের মিষ্টি পাওয়া যেত। দোকানটি খুব বড় না হলেও সংসার চালানোর মতো আয় হত। সকালে মা রান্না করতেন। বাবা দোকান খুলতেন। আর ঠাকুমা বারান্দায় বসে যাতায়াত করা প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করতেন। তাদের বাড়ির দেওয়াল ছিল হালকা নীল রঙের। উঠোনে ছিল একটি পেয়ারা গাছ। পরিবারের কেউ ফল পাড়ার আগেই প্রায়ই পাখিরা সেই পেয়ারা খেয়ে নিত। বাবা মজা করে বলতেন, গাছটির আসল মালিক পাখিরাই। ঠাকুমা রাগ দেখিয়ে বলতেন, পরের বার তিনি নিজেই সব পেয়ারা পেড়ে নেবেন।

তাদের সংসারেও কিছু সাধারণ সমস্যা ছিল। কোনও দিন দোকানে বিক্রিবাটা কম হত। কখনও ক্রেতারা বাকির টাকা দিতে দেরি করতেন। আবার বৃষ্টির দিনে ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ত। কিন্তু রাত হলে সবাই একই ছাদের নীচে ঘুমোতে যেতেন। টাকা, ঋণ কিংবা সংসার চালানোর জটিলতা বোঝার মতো বয়স তখনও হয়নি থোইবার। সে শুধু জানত, কাঁদলেই কেউ না কেউ তাকে কোলে তুলে নেয়।

যেদিন নিজের বাড়ি হয়ে গেল অন্য কোথাও-

এরপর এল ২০২৩ সালের মে মাস। মণিপুরে শুরু হল জাতিগত হিংসা। নিরাপত্তার খোঁজে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করলেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। একদিন ঘর ছাড়তে হল থোইবার পরিবারকেও। সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল কিছু জামাকাপড় এবং প্রয়োজনীয় কয়েকটি জিনিস। তখন তার বয়স মাত্র ১৮ মাস। তাই সেই সময়ের খুব বেশি কিছু মনে নেই তার।

পরে মায়ের মুখে শুনেছিল, কীভাবে ঠাকুমা তাড়াহুড়ো করে নিজের ওষুধ খুঁজছিলেন, কীভাবে দোকান বন্ধ করে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এসেছিলেন বাবা, আর মা শক্ত করে আগলে রেখেছিলেন তাকে। বাড়ি ছাড়ার আগে সদর দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। মা ভেবেছিলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই আবার ফিরে আসবেন। তাই রান্নাঘরের হাঁড়ি-পাতিল যেমন ছিল, তেমনই রেখে এসেছিলেন। বিছানার চাদরও সরানো হয়নি। দরজার পাশে পড়ে ছিল ঠাকুমার চটি। কেউ ভাবতেও পারেননি, কয়েক দিনের জন্য বন্ধ করে আসা সেই দরজার ওপারে তাঁদের পুরনো জীবন তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে আটকে থাকবে।

কিছুদিন তাঁরা একের পর এক অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে কাটান। শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হয় একটি ত্রাণশিবিরে। সেখানে থাকতেন বহু পরিবার। কারও বাড়ি পুড়ে গিয়েছিল, কেউ ফেলে এসেছিলেন দোকান, জমি কিংবা কাজের জায়গা। কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। প্রত্যেকের গল্প আলাদা হলেও একটা বিষয়ে মিল ছিল। তাঁরা কেউই আর নিজেদের বাড়িতে থাকতেন না।

ধীরে ধীরে ত্রাণশিবিরের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে থোইবা। মেঝেতে পাতা গদি, ঘুমোনোর জায়গার মাঝে ঝুলতে থাকা জামাকাপড়, জল সংগ্রহের পাত্র, বাইরে খেলতে থাকা শিশুরা এবং খাবার তৈরিতে ব্যস্ত মহিলারা—এটাই হয়ে ওঠে তার পরিচিত পৃথিবী। কেউ যখন তাকে জিজ্ঞাসা করত, কোথায় থাকে সে, তখন ত্রাণশিবিরের নাম বলত। মা তাকে শুধরে দিতেন না। তিনি বুঝেছিলেন, একটি শিশুর কাছে বাড়ি মানে প্রায়ই সেই জায়গা, যেখানে প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙে।

সেখানেই হাঁটতে শেখে থোইবা। কথা বলতে শেখে স্পষ্টভাবে। নিজের হাতে খেতে এবং অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলতেও শেখে। কখনও পুরনো চটিকে গাড়ি বানিয়ে খেলত, কখনও খালি টিনের কৌটো হয়ে উঠত তার বাজনা। একদিন কেউ তাকে একটি নীল রঙের পেনসিল দিয়েছিল। সেটি পেয়ে এতটাই আনন্দিত হয়েছিল যে, পেনসিলটি হাতেই নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

পরদিন সকালে কাগজের উপর চারটি আঁকাবাঁকা দাগ টেনে মাকে দেখায় সে। বলে, “এটা আমাদের বাড়ি।” মা জিজ্ঞাসা করেন, দরজাটা কোথায়? থোইবা আরও একটি দাগ টানে। মা জানালা কোথায় জানতে চাইলে একটি ছোট বর্গক্ষেত্র আঁকে সে।

“আর আমরা কোথায়?” জানতে চান মা।

কাগজের মধ্যে দু’টি গোল দাগ আঁকে থোইবা।

মা জিজ্ঞাসা করেন, “বাবা আর ঠাকুমা কোথায়?”

ছবির বাইরে আঙুল দেখিয়ে থোইবা বলে, “ওরা বাইরে। ভিতরে জায়গা নেই।”

কাগজের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন মা। ছেলে একটি বাড়ি এঁকেছে ঠিকই, কিন্তু এমন কোনও বাড়ির কথা হয়তো সে কখনও জানেইনি, যেখানে পরিবারের প্রত্যেকের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে।

বড় হয়ে ওঠার আগেই দারিদ্র্যের সঙ্গে পরিচয়-

সময় যত এগিয়েছে, পরিবারের সমস্যার ধরনও বদলেছে। প্রথম দিকে সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল বেঁচে থাকা এবং নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাওয়া। এরপর শুরু হয় সংসার চালানোর প্রতিদিনের লড়াই। বাবার দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জমানো টাকাও ছিল সীমিত। ত্রাণশিবির থেকে পাওয়া সাহায্যে কিছুটা সুরাহা হলেও শিশুদের জন্য জামাকাপড়, ওষুধ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দরকার ছিল। যাতায়াতেও খরচ হত। ছোটখাটো নানা খরচ লেগেই থাকত।

বাবা মাঝেমধ্যে কাজের খোঁজে বেরোতেন। কোনও দিন কাজ পেতেন, কোনও দিন খালি হাতেই ফিরে আসতেন। সংসারের হিসেবনিকেশ সম্পর্কে কিছুই বুঝত না থোইবা। কিন্তু বাবার পরিবর্তন তার চোখ এড়ায়নি। আগে ছোটখাটো কিছু চাইলেই বাবা হাসিমুখে রাজি হয়ে যেতেন। এখন প্রায়ই বলতেন, “পরের বার।”

একদিন বিকেলে বাবার কাছে বিস্কুট খেতে চায় থোইবা। পকেট হাতড়ে বাবা জানান, পরের দিন কিনে দেবেন। কিন্তু পরের দিনও বিস্কুট আসে না। তৃতীয় দিন মাকে আস্তে করে বলে, “বাবাকে বলো না যে আমি বিস্কুট চাই।”

মা জানতে চান, কেন?

থোইবা বলে, “বাবার কাছে টাকা নেই, তাই না?”

ছেলের এই বোধ দেখে গর্বিত হবেন, নাকি এত অল্প বয়সে দারিদ্র্যের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়েছে বলে কষ্ট পাবেন, বুঝতে পারেন না মা।

পুরনো বাড়ির কথা পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বলতেন ঠাকুমা। তাঁর স্মৃতিতে ছিল বাড়ির উঠোন, রান্নাঘর, প্রতিবেশীরা এবং ছাদে বৃষ্টির শব্দ। কখনও ভাবতেন, পেয়ারা গাছটি এখন কতটা বড় হয়েছে। কখনও চিন্তা করতেন, বাড়িটির কী অবস্থা হয়েছে।

ঠাকুমার মুখে এসব গল্প শুনত থোইবা। তার কাছে পুরনো বাড়ির বিবরণ যেন কোনও গল্পের বইয়ের বর্ণনা। সে জানতে চাইত, গাছটি কতটা উঁচু ছিল, সেখানে বাঁদর আসত কি না, বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল কি না, আর সেখানে সে দৌড়ে বেড়াতে পারত কি না। ঠাকুমা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতেন।

একদিন থোইবা জিজ্ঞাসা করল, “ঠাকুমা, ওই বাড়িতেও কি অনেক মানুষ একসঙ্গে ঘুমোত?”

মাথা নেড়ে ঠাকুমা বললেন, “না সোনা, আমাদের আলাদা আলাদা ঘর ছিল।”

কিছুক্ষণ ভেবে থোইবা আবার প্রশ্ন করল, “রাতে একা ঘুমোতে ভয় করত না?”

ঠাকুমা বললেন, “না।”

থোইবা ফের জানতে চাইল, “তুমি একা ঘুমোলেও ভয় পেতে না?”

নাতির মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন ঠাকুমা। যে বিষয়টিকে তিনি ব্যক্তিগত পরিসর বা নিজের মতো থাকার স্বাধীনতা হিসেবে মনে করতেন, নাতির কাছে সেটাই যেন একাকিত্বের সমার্থক। এক সন্ধ্যায় ত্রাণশিবিরের কাছাকাছি কোথাও হঠাৎ জোরে একটি শব্দ হয়। বেশ কয়েকজন ছুটে বাইরে বেরিয়ে আসেন। কেউ একজন চিৎকার করে জানান, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।

কিন্তু ততক্ষণে মায়ের পা জড়িয়ে ধরেছে থোইবা। কী হয়েছে, তা জানতে চায়নি সে। বাইরে যাওয়ার চেষ্টাও করেনি। মা তাকে কোলে বসিয়ে জল খাওয়ান এবং সব ঠিক আছে বলে আশ্বস্ত করেন। থোইবা মাথা নাড়লেও মায়ের জামা শক্ত করে ধরে রাখে। পরদিন আবার অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলতে শুরু করে সে। হাসে, অন্য শিশুর সঙ্গে ঝগড়া করে, খেলনা ভেঙে গেলে কাঁদেও। কিন্তু মা একটি বিষয় লক্ষ করেন। আশপাশে জোরে কোনও শব্দ হলেই খেলা থামিয়ে বড়দের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে থোইবা। তাঁরা শান্ত থাকলে আবার খেলায় মন দেয়। আর কাউকে ভীত দেখলে চুপ হয়ে যায়। কেউ তাকে শেখায়নি। নিজের মতো করেই সে বুঝতে শিখেছে, পৃথিবীটা কতটা নিরাপদ।

এমন একটি বাড়ি, যার দরজা সবার জন্য খোলা-

একদিন একটি মহিলা ত্রাণশিবিরে আসেন। শিশুদের অক্ষর, সংখ্যা এবং ছবি আঁকা শেখাতেন তিনি। থোইবা তাঁকে ‘দিদি’ বলে ডাকত। তিনি শিশুদের সূর্য, ফুলের ছবি এঁকে দেখাতেন এবং সেগুলির নাম জিজ্ঞাসা করতেন। একদিন সবাইকে নিজের সবচেয়ে পছন্দের জায়গার ছবি আঁকতে বলেন তিনি। কেউ আঁকে খেলার মাঠ, কেউ পাহাড়, কেউ আবার স্কুল।

থোইবা ফের একটি বাড়ির ছবি আঁকে। তবে এবার বাড়ির দরজাটি ছিল অস্বাভাবিক বড়।

দিদি জানতে চান, দরজাটি এত বড় কেন?

থোইবা বলে, “যাতে সবাই ভিতরে আসতে পারে।”

“সবাই বলতে কাদের কথা বলছ?”

“মা, বাবা, ঠাকুমা, তুমি আর যারা বাইরে ঘুমোয়, তাদের সবাইকে।”

থোইবার আঁকা ছবির প্রশংসা করেন দিদি। খুশি হয় সে। বাড়ি বলতে বড়রা জমি, টাকা, মালিকানা কিংবা সরকারি কাগজপত্রের কথা ভাবেন। কিন্তু থোইবার কাছে বাড়ি হল এমন একটি জায়গা, যেখানে কাউকে বাইরে পড়ে থাকতে হয় না।

২০২৬ সালে থোইবার বয়স পাঁচ বছর। আশপাশের মানুষের কথাবার্তা এখন সে কিছুটা বুঝতে পারে। কেউ বাড়ি ফেরার কথা বলেন। কেউ বলেন, এখনও সেখানে ফিরে যাওয়া নিরাপদ নয়। কেউ নতুন বাড়ি পাওয়ার আশায় রয়েছেন। আবার কেউ জানেন না, তাঁদের পুরনো বাড়ির আদৌ কিছু অবশিষ্ট রয়েছে কি না।

সব কথা না বুঝলেও একটি শব্দ বারবার শুনতে পায় থোইবা—’ফেরা’।

একদিন মাকে জিজ্ঞাসা করে, এর অর্থ কী?

মা বোঝান, “যেখান থেকে এসেছিলাম, সেখানে ফিরে যাওয়া।”

“তা হলে আমরা এখানে এলাম কেন?”

“কারণ ওখানে সমস্যা হয়েছিল।”

“সেই সমস্যা কি মিটে গিয়েছে?”

ছেলের দিকে তাকিয়ে মা বলেন, “পুরোপুরি নয়।”

আর কোনও প্রশ্ন করে না থোইবা। বরং বাইরে গিয়ে মাটির উপর আঙুল দিয়ে একটি রাস্তা আঁকতে শুরু করে। রাস্তার এক প্রান্তে একটি ছোট বাড়ি আঁকে, অন্য প্রান্তেও আরেকটি বাড়ি। তারপর আঙুল দিয়ে দু’টি বাড়িকে একটি লম্বা রেখায় যুক্ত করে।

পাঁচ বছরের জন্মদিনে মা চাল ও গুড় দিয়ে একটি ছোট মিষ্টি খাবার তৈরি করেন। ঠাকুমা আশীর্বাদ করেন। বাবা তাকে একটি খাতা কিনে দেন। প্রথম পাতায় লিখে দেন তার নাম।

থোইবা জানতে চায়, “আমার নাম লিখলে কেন?”

বাবা বোঝান, “যাতে সবাই বুঝতে পারে খাতাটা তোমার।”

কিছুক্ষণ ভেবে থোইবা প্রশ্ন করে, “আমাদের বাড়িতেও কি আমার নাম লেখা ছিল?”

বাবা বলেন, “না, সেখানে আমাদের পরিবারের নাম লেখা ছিল।”

বিষয়টি বুঝতে না পেরে থোইবা ফের জানতে চায়, “তা হলে কেউ বাড়িটার দেখাশোনা করল না কেন?”

কোনও উত্তর দিতে পারেন না বাবা। ছেলের হাতে খাতাটি ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকতে।

সেদিন রাতে ফের একটি বাড়ির ছবি আঁকে থোইবা। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে চারজন। এবার ঠাকুমাকেও ছবিতে রাখতে ভোলেনি সে। দরজাটিও খোলা রেখেছে।

পরদিন সকালে ছেলের বালিশের নীচে খাতাটি খুঁজে পান মা।

জিজ্ঞাসা করেন, “খাতাটা ওখানে রেখেছ কেন?”

থোইবা বলে, “যাতে হারিয়ে না যায়।”

মা হেসে বলেন, “ওটা তো শুধু একটা আঁকা ছবি, সোনা।”

খাতাটি খুলে মাকে বাড়ির ছবিটি দেখায় থোইবা। তারপর বলে, “কিন্তু আমাদের সত্যিকারের বাড়িও তো ছিল।”

ছেলের পাশে গিয়ে বসেন মা। কোনও ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন না। এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন শিশু এমন কথা বলে, যার কোনও যথাযথ উত্তর বড়দের কাছেও থাকে না। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন তিনি। কপালে চুমু খেয়ে খাতাটির যত্ন নিতে বলেন। থোইবা যত্ন করে খাতাটি বন্ধ করে। তারপর অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলতে বাইরে ছুটে যায়। সবকিছুর পরেও তার কাছে সকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হল খেলাধুলো।

পাঁচ বছরের দুই শিশু, বাড়ি সম্পর্কে দুই ভিন্ন ধারণা-

সেই একই রবিবার দিল্লির একটি আবাসনে নিজের বাবার সঙ্গে পুরনো ছবির অ্যালবাম দেখছিল আরব নামে আরেক পাঁচ বছরের শিশু। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, দুই বছর বয়সে জন্মদিনের কেক কাটছে সে। অন্য একটি ছবিতে তিন বছর বয়সে প্রথম স্কুলের পোশাক পরে রয়েছে। তৃতীয় ছবিতে চার বছর বয়সে সাইকেল চালাচ্ছে।

বাবা জানালেন, আগামী মাসে তার ঘরের দেওয়ালে নতুন রং করা হবে। আরব নীল রং পছন্দ করেছে। মা আলমারি খুলে জানতে চাইলেন, পুরনো খেলনাগুলির মধ্যে কোনগুলি ছোট শিশুদের দিয়ে দেওয়া যায়। তবে নিজের ছোট্ট লাল গাড়িটি কাউকে দিতে রাজি নয় আরব। কারণ, খেলনাটি তার এখনও খুব প্রিয়।

তার জীবনেও সমস্যা আসেনি, এমন নয়। অসুস্থ হয়েছে, বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করেছে, বাবা-মায়ের বকুনি খেয়েছে, পছন্দের খেলনা না পেয়ে কেঁদেছে। কিন্তু রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় সে জানত, সকালে ঘুম থেকে উঠলে নিজের বিছানা, বই এবং মায়ের কণ্ঠস্বর—সবই তার জন্য অপেক্ষা করবে। পরের মাসে পরিবার কোথায় থাকবে, তা নিয়ে তার বাবা-মাকে প্রতি রাতে দুশ্চিন্তা করতে হয় না।

শৈশবের স্মৃতি ধরে রাখতে আরবের কাছে রয়েছে একাধিক ছবি। আর মণিপুরের থোইবা নিজের শৈশবের বাড়িটিকে কল্পনা করতে ছবি আঁকে।

থোইবা যদি আপনার সন্তান হত, তাহলে তার পঞ্চম জন্মদিনে আপনি কী উপহার দিতেন? একটি খেলনা, নাকি নিজের বাড়িতে নির্ভয়ে ঘুমোতে পারার নিশ্চয়তা?

ডিসক্লেমার: এই গল্পটি নথিভুক্ত বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে নির্মিত কাল্পনিক আখ্যান। গল্পের চরিত্র এবং তাঁদের কথোপকথন কল্পনাপ্রসূত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *