এআই’য়ের ধাক্কায় বিশ্বজুড়ে ছাঁটাই, অনিশ্চয়তায় ভারতীয় IT কর্মীরা
মুম্বই: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-নির্ভর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি। একই সঙ্গে চলছে কর্মী ছাঁটাই (Tech Layoffs), পুনর্গঠন এবং নিয়োগের পরিকল্পনায় পরিবর্তন। ২০২৬ সালে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়তে পারে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে যাঁরা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, টেস্টিং, টেকনিক্যাল সাপোর্ট এবং পরিষেবা সংক্রান্ত সাধারণ কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের সামনে বাড়তে পারে অনিশ্চয়তা।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কর্মী ছাঁটাইয়ের পিছনে AI-কে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই দায়ী নয়। অতীতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর্মী নিয়োগ, ব্যবসার গতি কমে যাওয়া, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাহকদের চাহিদায় পরিবর্তনের মতো বিষয়ও সংস্থাগুলিকে কর্মী সংখ্যা কমানোর পথে ঠেলছে।
২০২৬ সালে কোন সংস্থায় কত কর্মী ছাঁটাই?
চলতি বছরে একাধিক বড় প্রযুক্তি সংস্থা কর্মী সংখ্যা কমানোর কথা জানিয়েছে বা ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি তথ্য হল:
| সংস্থা | রিপোর্টে উল্লেখিত ছাঁটাইয়ের সংখ্যা বা পরিকল্পনা |
| Amazon | জানুয়ারিতে ১৬,০০০ কর্পোরেট পদ; অক্টোবরে আরও একটি দফা ছাঁটাই |
| Oracle | প্রায় ২১,০০০ কর্মী |
| Dell | প্রায় ১১,০০০ কর্মী |
| Meta | একটি দফায় ৮,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা |
| Qualcomm | নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি |
Amazon-এর ক্ষেত্রে অক্টোবরে পুনর্গঠনের একটি পৃথক দফায় ১,০০০-এর কম হোয়াইট-কলার কর্মী প্রভাবিত হয়েছেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ভারতের কর্মীরাও রয়েছেন। সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামো সরল করা এবং খরচ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
Oracle-এর ক্ষেত্রে কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর এসেছে ক্লাউড পরিকাঠামো এবং AI-তে বিনিয়োগ বাড়ানোর সময়। Dell-ও পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে মার্চে কর্মী সংখ্যা কমিয়েছে বলে রিপোর্টে প্রকাশ। অন্যদিকে Meta AI-তে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করেছে বলে জানা গিয়েছে। Qualcomm-ও অভ্যন্তরীণ মেমোর মাধ্যমে কর্মী সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। নভেম্বর থেকে কর্মীদের এ বিষয়ে অবহিত করার কথা রয়েছে।
তবে এই সংখ্যাগুলিকে সংশ্লিষ্ট সংস্থার ২০২৬ সালের মোট বার্ষিক ছাঁটাইয়ের হিসাব হিসেবে দেখা উচিত নয়। এগুলি নির্দিষ্ট দফার ছাঁটাই বা পরিকল্পনা সংক্রান্ত রিপোর্টে উল্লেখিত সংখ্যা। প্রতিটি সংস্থার ক্ষেত্রে কর্মী কমানোর কারণও এক নয়।
ভারতীয় IT কর্মীদের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
নিয়োগে বাড়তে পারে বাছাইয়ের প্রবণতা
ভারতের IT সংস্থাগুলির ব্যবসার বড় অংশ আসে আমেরিকা ও ইউরোপের মতো বিদেশি বাজার থেকে। সেই দেশগুলির সংস্থা প্রযুক্তি খাতে খরচ কমালে বা নতুন প্রকল্প পিছিয়ে দিলে ভারতীয় IT পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির উপরও চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে নতুন নিয়োগ কমানো, প্রকল্পের খরচ কমানো এবং কর্মী সংখ্যা পুনর্বিবেচনার মতো পদক্ষেপ দেখা যেতে পারে।
বিশেষ করে যাঁরা সাধারণ সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ম্যানুয়াল টেস্টিং, টেকনিক্যাল সাপোর্ট এবং নিয়মিত পরিষেবা সংক্রান্ত কাজে যুক্ত, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। AI-নির্ভর টুল ব্যবহার করে কম কর্মী দিয়ে বেশি কাজ করানোর প্রবণতা বাড়লে এই ধরনের পদের চাহিদা কমার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুনদের জন্যও চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। ফ্রেশারদের নিয়োগে সংস্থাগুলি আরও বেশি বাছাই করতে পারে। তবে তার অর্থ এই নয় যে তরুণ কর্মীদের জন্য সব ধরনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। বরং বিশেষ প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থাকা প্রার্থীদের চাহিদা বজায় থাকতে পারে।
ভারতীয় IT সংস্থাগুলিও বদলাচ্ছে নিয়োগের কৌশল
শুধু বিদেশি প্রযুক্তি সংস্থাই নয়, ভারতের IT ক্ষেত্রেও কর্মী নিয়োগের প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবর্ষে TCS, Infosys, Wipro, HCLTech এবং Tech Mahindra মিলিয়ে মোট কর্মী সংখ্যা ৬,৯৮১ কমেছে। অথচ তার আগের অর্থবর্ষে এই পাঁচ সংস্থা মিলিয়ে ১২,৭১৮ জন কর্মী নিয়োগ করেছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে নিয়োগের গতি কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, কর্মী সংখ্যা কমার অর্থ সব ক্ষেত্রেই ছাঁটাই নয়। স্বাভাবিক কর্মী প্রস্থান, নিয়োগের গতি কমানো এবং সংস্থার অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনও মোট কর্মী সংখ্যায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ভবিষ্যতে কোন IT দক্ষতার চাহিদা বাড়তে পারে?
AI-এর প্রভাব বাড়লেও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বরং কাজের ধরন এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানো কর্মীদের পেশাগত সম্ভাবনা উন্নত করতে পারে।
- AI ও অটোমেশন: AI-ভিত্তিক কোডিং টুল ব্যবহার, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় করা এবং AI-তৈরি ফলাফল যাচাই করার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
- ক্লাউড কম্পিউটিং ও DevOps: ক্লাউড পরিকাঠামো পরিচালনা, সফটওয়্যার ডেপ্লয়মেন্ট এবং সিস্টেম মনিটরিংয়ের ব্যবহারিক জ্ঞান কাজে আসবে।
- সাইবার নিরাপত্তা: অ্যাপ্লিকেশন সুরক্ষা, সাইবার হামলা শনাক্ত করা এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দক্ষতার গুরুত্ব বাড়তে পারে।
- ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং: ডেটা পাইপলাইন তৈরি, তথ্যের গুণমান বজায় রাখা এবং বড় পরিমাণের ডেটা পরিচালনার দক্ষতা প্রয়োজনীয় হতে পারে।
- সমস্যা সমাধানের দক্ষতা: প্রোগ্রামিংয়ের মৌলিক জ্ঞান, যোগাযোগের দক্ষতা এবং ব্যবসার প্রয়োজন বুঝে প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
চাকরির নিরাপত্তায় বদল আনছে AI
প্রযুক্তি শিল্পে AI-এর ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মীদের কাছ থেকে সংস্থাগুলির প্রত্যাশাও বদলাচ্ছে। আগে যে কাজের জন্য একাধিক কর্মীর প্রয়োজন হত, তার কিছু অংশ এখন AI টুলের সাহায্যে দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। ফলে সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের ক্ষেত্রে কর্মী চাহিদা কমতে পারে। অন্যদিকে AI, ক্লাউড, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডেটা ব্যবস্থাপনার মতো বিশেষ ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীদের প্রয়োজন তৈরি হতে পারে।
তবে কোনও নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত দক্ষতাই চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। নিয়মিত শেখা, বাস্তব প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ানোই এই পরিবর্তিত IT চাকরির বাজারে টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
Get your daily dose of tech news and insight. Follow us on X, Facebook, WhatsApp and Google News for instant updates. Catch all the action on our YouTube channel.