খেলাতে পারি, কিন্তু কেন খেলাব: বৈভবকে খেলানো নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ক্রিকেট দুনিয়া
সব্যসাচী সরকার
‘ডোন্ট ওয়েট ফর দ্য রাইট অপরচুনিটি, ক্রিয়েট ইট।’
সহজ বাংলায়, ‘সঠিক সুযোগের জন্য অপেক্ষা কোরো না, সেটা তৈরি করো।’ লিখেছিলেন বিশ্বখ্যাত আইরিশ নাট্যকার জর্জ বানার্ড শ। তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে নিউ জি়ল্যান্ডে থাকা টিম ইন্ডিয়ার ম্যানেজমেন্ট কতটা একমত, তা নিয়ে সংশয় যথেষ্ট। সার্চলাইটে ১৫ বছরের বিস্ময়বালক বৈভব সূর্যবংশী। বিতর্কের বিষয় সহজ। প্রতিভা আগে, না যুক্তি?
আজ কিউয়িদের বিরুদ্ধে তৃতীয় টি–টোয়েন্টিতে বৈভবকে প্রথম এগারোয় দেখা যাবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু ওপেন করবেন কি? ইশান কিষানের চোট থাকায় প্রথম এগারোর দরজা খুলেছে বৈভবের। আগের ম্যাচে তিনে নেমে করেছেন ৮ বলে ৪। তা নিয়েও উত্তাল ভারতের ক্রিকেটমহল। সরব হয়েছেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও মুরলী কার্তিকের মতো দুই প্রাক্তন। অশ্বিন সরাসরি বলছেন, ‘সব সময়েই এই ফর্ম্যাটে বৈভব ওপেন করে এসেছে। অনভ্যস্ত জায়গায় ওকে পাঠানো মানে অহেতুক চাপের মধ্যে ফেলে দেওয়া। সঞ্জু অভিজ্ঞ, ওকে তিনে পাঠানোই যেত।’ একই বক্তব্য মুরলী কার্তিকের। তাঁর কথায়, ‘খেলালে বৈভবকে ওপেনার হিসেবেই খেলানো উচিত।’
১৫ বছরের বৈভব এখন পর্যন্ত খেলেছেন ৯টি ম্যাচ, মোট রান ২৫০, স্ট্রাইক রেট ১৭৮.৫৭। কিউয়িদের বিরুদ্ধেও হয়তো গোটা সিরিজ়েই তাঁকে বাইরে বসতে হতো, ঈশানের চোট না হলে। কিন্তু সুযোগ যখন এসেছিল, কেন তিন নম্বরে? গোটা কেরিয়ারে ওপেন করে আসা ছেলেটিকে হঠাৎ তিন নম্বরে পাঠানো কি ‘আনফেয়ার’ নয়?
সন্দেহ নেই, এ বারে নিউ জ়িল্যান্ড সফরে শুরু থেকেই টি–টোয়েন্টি সিরিজ়ে বৈভবকে নিয়ে একটা হাইপ আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যাচ্ছে বিস্ফোরণ, তাঁকে কেন খেলানো হবে না? যে কারণে শুরু থেকেই টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষে গম্ভীর ও তাঁর দলবল এর বিরোধিতা করে আসছেন। ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটাক ক’দিন আগেই বলেছেন, ‘ওকে খেলাতেই হবে, এই ভাবনাটা ঠিক নয়। একটা ১৫–১৬ বছরের ছেলের জন্য এই চাপটা ভালো হতে পারে না। বাকি দু’জন ওপেনার, যারা পারফর্ম করে যাচ্ছে, তাদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে, ওরা কেন খেলেছে? এটা একদমই ফেয়ার নয়।’ ব্যাপারটা অনেকটাই সেই রকম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে––’খেলাতে পারি, কিন্তু কেন খেলাব?’
অন্য যুক্তিও থাকছে। বৈভবকে যদি না খেলানোই হয়, নিউ জ়িল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার বদলে রঞ্জি ট্রফিতে খেলার জন্য ভারতে রেখে আসা যেত। সে ক্ষেত্রে লাল বলে নিজেকে ঘষামাজার সুযোগ পেতে পারতেন তিনি। টিমের সঙ্গে থাকলে অভিজ্ঞতা বাড়বে, এই যুক্তি আজকের দিনে অচল। কারণ, বৈভব আইপিএলে নিয়মিত খেলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ এই বয়সে নিয়েছেন, নিতে জানেন।
টি–টোয়েন্টি ফর্ম্যাটে টিমের সঙ্গে রাখার চেয়ে লাল বলে রঞ্জি খেলানোটা যে যুক্তিযুক্ত হতো, মানবেন অনেকেই। মনে রাখতে হবে, ১৯৮৯ সালে সচিন ১৬ বছরে টেস্ট খেলেছিলেন। তখন টি–টোয়েন্টি ছিল না, কিন্তু সেখানেই বৈভবের চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতো প্রতিভা কেন শুধু সাদা বলে আটকে থাকবেন? এখানেই সবচেয়ে দামি কথাটা বলেছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। ‘লাল বলে খেলে পরিণত হওয়ার সুযোগটা আমরা ওকে দেব তো?’
সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিভা থাকলে কী হবে, বৈভবের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা খচখচানি থাকছেই। আইপিএল, কুড়ি–বিশের চার–ছক্কা আর সাদা বলের দৌরাত্ম্য এই বিরল প্রতিভাকে গিলে নেওয়ার জন্য তিমি মাছের মতো হাঁ নিয়ে তৈরি থাকবেই। সেই চ্যালেঞ্জ সামলে লাল বলেও সূর্যবংশী হয়ে ওঠাটা কঠিন ঠিকই, কিন্তু জিনিয়াসের পক্ষে অসম্ভব নয়।