রাবার ছেড়ে লেবু চাষে ঝোঁক! কেরলের কৃষকের মরশুমি আয় প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা
নয়াদিল্লি: প্রায় তিন দশক উপসাগরীয় দেশে কাজ করার পর কেরলে ফিরে চাষের ধরনই বদলে ফেলেছিলেন রাজন ম্যাথিউ। পরিবারের জমিতে রাবার গাছের বদলে লেবুর বাগান (Lemon Farming) গড়ে তোলেন তিনি। সেই উদ্যোগই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে জৈব লেবু চাষের ব্যবসায়। ৩০স্টেডস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ০.৮ একর জমিতে প্রায় ১০০টি লেবুগাছ থেকে বছরে প্রায় পাঁচ টন ফল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন তিনি। মরশুমে চাহিদা বাড়লে প্রতি কেজি লেবু সর্বোচ্চ ২৬০ টাকায় বিক্রি করেন রাজন। প্রতিবেদনে তাঁর মরশুমি আয়ের পরিমাণ প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই অঙ্ককে বার্ষিক আয় বা নিট মুনাফা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। চাষের খরচ, শ্রম, পরিবহণ এবং অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব ছাড়া প্রকৃত লাভের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
কেন রাবার ছেড়ে লেবু চাষের সিদ্ধান্ত?
কেরলের কোল্লাম জেলার পুনালুরের কাছে ভিলাক্কুড়ি গ্রামে রাজনের এই বাগান। রাবার চাষে উৎপাদন খরচ বাড়া এবং তুলনামূলক কম লাভের সম্ভাবনা তাঁকে বিকল্প ফসলের কথা ভাবতে বাধ্য করে। অন্যদিকে, কেরলে বাজারের লেবুর বড় অংশ প্রতিবেশী তামিলনাড়ু থেকে আসে।
কোভিড-১৯ অতিমারির সময় লেবুর দাম বাড়তে দেখে রাজন বুঝতে পারেন, স্থানীয় চাহিদা মেটানোর সুযোগ রয়েছে। ৩০স্টেডস-কে তিনি জানান, তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, কেরলেই যখন লেবুর চাহিদা রয়েছে, তখন সেখানে এই ফলের চাষ করা যাবে না কেন?
উপসাগরীয় দেশ থেকে স্থায়ীভাবে ফেরার আগেই তিনি লেবুর চারা লাগাতে শুরু করেন। প্রথমে প্রায় ১৪০টি চারা লাগালেও পরে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত জায়গার কথা ভেবে সংখ্যা কমিয়ে প্রায় ১০০ করেন। ২০২২ সালে তিনি স্থায়ীভাবে কেরলে ফিরে এসে চাষের কাজে আরও মন দেন।
১০০টি গাছ থেকে বছরে পাঁচ টন লেবুর সম্ভাবনা
রাজনের বাগানে একাধিক ধরনের লেবু চাষ হয়। এর মধ্যে রয়েছে গণপতি লেবু, যা বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি রয়েছে অসমের কাজি নিমু প্রজাতি, যা সারা বছর ফল দিতে পারে বলে পরিচিত।
৩০স্টেডস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি পরিণত লেবুগাছ থেকে বছরে প্রায় ৫০ কেজি ফল পাওয়া যেতে পারে। সেই হিসাবে ১০০টি গাছ থেকে বছরে প্রায় পাঁচ টন লেবু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকৃত ফলন গাছের বয়স, আবহাওয়া, পরিচর্যা, মাটির গুণমান এবং রোগপোকার পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে।
চাষের ক্ষেত্রে রাজন জৈব উপাদান ব্যবহার করেন। গাছের বৃদ্ধি ও মাটির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে জীবামৃত এবং ফিশ অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো উপকরণ ব্যবহার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর খামারে জৈব শংসাপত্রও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পাইকারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বিক্রি
রাজনের ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বিক্রির নিজস্ব ব্যবস্থা। তিনি শুধু পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে ফল বিক্রি করেন না, নিজের খুচরো বিক্রির কেন্দ্র থেকেও সরাসরি ক্রেতাদের লেবু সরবরাহ করেন। পাশাপাশি, বিয়ে ও অন্যান্য অনুষ্ঠানেও বড় অঙ্কের অর্ডার নেন।
এই ধরনের অনুষ্ঠানে একবারে প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০টি লেবুর প্রয়োজন হতে পারে। ফলে খুচরো বিক্রির পাশাপাশি বড় অর্ডার থেকেও ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া, লেবু চাষের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চারা বিক্রিও শুরু করেছেন তিনি। অর্থাৎ, তাঁর ব্যবসায় আয়ের সম্ভাব্য তিনটি পথ রয়েছে: পাকা লেবু বিক্রি, অনুষ্ঠান বা অন্যান্য উপলক্ষে বড় অর্ডার এবং লেবুর চারা বিক্রি।
মরশুমে চাহিদা বেশি থাকলে প্রতি কেজি লেবুর দাম ২৬০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে এই দাম সারা বছর পাওয়া যায় কি না, তা স্পষ্ট নয়। সেই কারণে মরশুমি আয়ের অঙ্ককে সারা বছরের নিশ্চিত উপার্জন হিসেবে দেখা উচিত নয়।
রাবার ছেড়ে বিকল্প চাষের দিকে কেরলের কৃষকেরা
রাজনের উদ্যোগ কেরলের কৃষকদের মধ্যে বিকল্প ফসলের প্রতি আগ্রহের বৃহত্তর প্রবণতার সঙ্গে মেলে। রাবার চাষে লাভের অনিশ্চয়তার কারণে কিছু কৃষক রাম্বুটান, ড্রাগন ফ্রুট, অ্যাভোকাডো এবং ম্যাঙ্গোস্টিনের মতো ফলের চাষেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে, স্ক্রল-এ প্রকাশিত মঙ্গাবে-র প্রতিবেদন পুনঃপ্রকাশের মাধ্যমে, এই পরিবর্তনের কথা তুলে ধরা হয়েছিল। তবে নতুন ফসল চাষে আবহাওয়ার পরিবর্তন, জলের প্রয়োজন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভের অনিশ্চয়তার মতো সমস্যাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, একটি একক ফসলের বদলে আরেকটি একক ফসলের উপর পুরোপুরি নির্ভর করলেও পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বিকল্প চাষ বেছে নেওয়ার আগে স্থানীয় বাজার, মাটির উপযোগিতা, জলের প্রাপ্যতা এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের বিষয়ে পরিকল্পনা করা জরুরি।
রাজন ম্যাথিউয়ের অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু ফসল বদল করাই নয়, বাজারের চাহিদা বুঝে সরাসরি বিক্রির ব্যবস্থা তৈরি করাও কৃষি ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তবে তাঁর মডেল অন্য কৃষকের ক্ষেত্রে কতটা লাভজনক হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন খরচ, ফলন, বিক্রির দাম এবং নিয়মিত ক্রেতা পাওয়ার উপর।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business