হুথিদের মোকাবিলায় সৌদির পাশে মিশর? প্রস্তুত যুদ্ধবিমান-জাহাজ - 24 Ghanta Bangla News
Home

হুথিদের মোকাবিলায় সৌদির পাশে মিশর? প্রস্তুত যুদ্ধবিমান-জাহাজ

Spread the love

কায়রো: ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে মিশর। কায়রো শেষ পর্যন্ত এই সংঘাতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হলে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, সুয়েজ খালের বাণিজ্য এবং আরব উপদ্বীপের সামরিক ভারসাম্যে বড় প্রভাব পড়তে পারে। মিশরের হাতে রয়েছে রাফাল, এফ-১৬ ও মিগ-২৯এম/এম২ যুদ্ধবিমান, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী নৌবাহিনী। তবে সৌদি আরবকে ঠিক কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সৌদি আরবের অনুরোধ এলে সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সংসদের অনুমোদন চেয়েছেন। প্রস্তাবটি নিয়ে সংসদে ভোটাভুটি ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য অভিযানের লক্ষ্য, মেয়াদ এবং খরচ নিয়ে প্রশ্ন থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে সময় নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। সিসি এই সম্ভাব্য ভূমিকাকে প্রতিরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, এই প্রস্তাবের অর্থ এই নয় যে মিশর ইতিমধ্যেই ইয়েমেনে স্থলসেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

১৩ অক্টোবর মিশরের বিদেশমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি জানান, সৌদি আরব যে ধরনের সহায়তা চাইবে, কায়রো তা বিবেচনা করে সাড়া দেবে। একই সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টিও মিশর গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে বলে তিনি জানান।

কেন সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী মিশর?

মিশরের এই আগ্রহের পিছনে শুধু সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও। লোহিত সাগর সুয়েজ খালকে বাব এল-মান্দেব প্রণালীর মাধ্যমে এডেন উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে হুথিদের হামলা সরাসরি মিশরের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হুথিদের ধারাবাহিক হামলার জেরে একাধিক শিপিং সংস্থা লোহিত সাগরের পথ এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল শুরু করে। এর ফলে সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যায় এবং খাল থেকে মিশরের আয়েও বড় ধাক্কা লাগে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুয়েজ খাল থেকে মিশরের আয় ২০২৩ সালে রেকর্ড ১০.২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৪ সালে ৩.৯৯১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তাই লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ নিরাপদ রাখা কায়রোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লক্ষ্য।

অন্যদিকে, সৌদি আরব মিশরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। সৌদি বিনিয়োগ, আর্থিক সহায়তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত মিশরীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

ইয়েমেনে আগের সামরিক অভিযানের তিক্ত অভিজ্ঞতা

ইয়েমেনের সংঘাতে মিশরের অতীত অভিজ্ঞতা কায়রোর বর্তমান সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলেছে। ১৯৬২ সালে ইয়েমেনে সেনা আধিকারিকদের অভ্যুত্থানে রাজতন্ত্রের পতনের পর তৎকালীন মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের প্রজাতন্ত্রী শক্তিকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে, সৌদি আরব সমর্থন করেছিল রাজতন্ত্রপন্থীদের।

প্রথমে সীমিত আকারে শুরু হওয়া মিশরের সামরিক হস্তক্ষেপ দ্রুত বড় অভিযানে পরিণত হয়। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, এক বছরের মধ্যে ইয়েমেনে মিশরীয় সেনার সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারে পৌঁছেছিল। ১৯৬৫ সালের গ্রীষ্মে তা বেড়ে প্রায় ৭০ হাজার হয়।

কিন্তু পাহাড়ি ভূখণ্ড, স্থানীয় গোষ্ঠীগুলির প্রতিরোধ এবং প্রতিপক্ষের প্রতি বাইরের সমর্থনের কারণে মিশরীয় বাহিনীকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। ১৯৬৭ সালের আরব-ইজরায়েল ছয় দিনের যুদ্ধে মিশরের পরাজয়ের পর ইয়েমেনে তাদের অভিযান শেষ হয়। কিছু মূল্যায়নে ওই অভিযানে মিশরের সামরিক মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছিল মিশর। সে সময় নৌ ও বিমানবাহিনীর মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হলেও, ১৯৬০-এর দশকের বিশাল স্থল অভিযানের তুলনায় ভূমিকা ছিল অনেক বেশি সীমিত। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই ইয়েমেনে নতুন করে বড় আকারের স্থলসেনা পাঠানোর ক্ষেত্রে মিশর সতর্ক থাকতে পারে।

সৌদি আরবকে কী সামরিক সহায়তা দিতে পারে মিশর?

মিশরের বিমানবাহিনীতে রাফাল, এফ-১৬ এবং মিগ-২৯এম/এম২ যুদ্ধবিমান রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ই-২সি হকআই আর্লি ওয়ার্নিং বিমান, যা আকাশে থাকা অবস্থায় বিস্তীর্ণ এলাকার উপর নজরদারি এবং সম্ভাব্য হামলার আগাম সংকেত শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এই বিমানগুলি আকাশপথে টহল, নজরদারি এবং শত্রুর আকাশযান বা ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবিধি শনাক্ত করার কাজে সহায়তা করতে পারে।

মিশরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে এস-৩০০ভিএম, বুক, তোর এবং হক পরিবারের বিভিন্ন ব্যবস্থা। এগুলি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এই অস্ত্রগুলির কোনওটি সৌদি আরবকে হস্তান্তর করা হবে, এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য নেই। নিজেদের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য মিশরকেও এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধরে রাখতে হবে।

নৌবাহিনীর ক্ষেত্রেও মিশরের হাতে রয়েছে ফ্রিগেট, করভেট, ক্ষেপণাস্ত্রবাহী নৌযান, সাবমেরিন এবং মিস্ত্রাল শ্রেণির হেলিকপ্টারবাহী জাহাজ। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নজরদারি এবং নৌপথে টহল দেওয়ার কাজে এই সম্পদ ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যোগাযোগ এবং রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রেও মিশর সহায়তা দিতে পারে।

তবে সম্ভাব্য সহায়তার পরিধি নির্ভর করবে সৌদি আরবের চাহিদা, মিশরের নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রয়োজন এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক সমন্বয়ের শর্তের উপর।

হুথিদের মোকাবিলা করা কেন কঠিন?

ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন, যাদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ, প্রচলিত সেনাবাহিনীর মতো একমাত্রিক প্রতিপক্ষ নয়। তাদের হাতে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল, একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন এবং নজরদারি ড্রোন। মোবাইল লঞ্চার ব্যবহার এবং বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্র ও সরঞ্জাম ছড়িয়ে রাখার কৌশলের ফলে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে ওঠে।

এই ধরনের হুমকি মোকাবিলায় শুধু যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজ থাকলেই হয় না। প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি, আগাম সতর্কবার্তা, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ এবং পর্যাপ্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র। তুলনামূলক সস্তা ড্রোনের বিরুদ্ধে দামি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হলে প্রতিরক্ষাকারী বাহিনীর খরচও দ্রুত বাড়তে পারে।

সৌদি আরবকে মিশরের আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা ও নৌ টহল হুথিদের হামলার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু তাতেই হুথিদের সব ধরনের আক্রমণ বন্ধ হয়ে যাবে বা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতের সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

সংসদের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে পরবর্তী পদক্ষেপ

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মিশরের সংসদ সামরিক সহায়তার প্রস্তাবে অনুমোদন দেয় কি না। অনুমোদন মিললেও ঠিক কোন যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ বা প্রতিরক্ষা সম্পদ ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে পৃথক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। অভিযান সৌদি ভূখণ্ড ও তার সংলগ্ন জলপথে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ইয়েমেনের ভিতরেও বিস্তৃত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অভিযানের খরচ, কত দিন সেনা মোতায়েন থাকবে এবং সামরিক নির্দেশ দেওয়ার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়েও স্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার। ১৯৬০-এর দশকে ইয়েমেনে মিশরের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সামরিক হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

সৌদি আরবকে মিশরের সম্ভাব্য সামরিক সহায়তা লোহিত সাগরের নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে। তবে কায়রো কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত এবং সহযোগিতার সীমা কোথায় টানা হবে, তার উত্তর মিলবে সংসদের সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী সামরিক পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পরেই।

Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট।  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *