WiFi Router রাখার ৬ ভুলে কমছে ইন্টারনেটের গতি, বাড়িতেই বাড়ান সিগন্যাল
বাড়িতে দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ থাকা সত্ত্বেও কি ইন্টারনেট ধীরগতিতে চলছে? ভিডিও দেখতে গিয়ে বারবার বাফারিং হচ্ছে, অনলাইন মিটিংয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে কিংবা বাড়ির অন্য ঘরে গেলেই ওয়াই-ফাই সিগন্যাল দুর্বল হয়ে পড়ছে? এর জন্য সব সময় ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা বা রাউটারের ক্ষমতাকে দায়ী করা যায় না। অনেক সময় আপনার বাড়িতে ওয়াই-ফাই রাউটার কোথায় রাখা হয়েছে, তার উপরেই নির্ভর করে ইন্টারনেটের গতি ও সংযোগের মান।
ওয়াই-ফাই রাউটার আসলে একটি রেডিও ট্রান্সমিটার, যা নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডের মাধ্যমে ডেটা আদানপ্রদান করে। দেয়াল, ধাতব বস্তু, জল এবং আশপাশের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি এই সিগন্যালের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ফোনে ওয়াই-ফাইয়ের সবকটি বার দেখা গেলেও ইন্টারনেটের কার্যক্ষমতা খারাপ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, রাউটারকে বাড়ির উপযুক্ত জায়গায় রাখলে অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই সংযোগের মান উন্নত করা সম্ভব। জেনে নিন, রাউটার রাখার ক্ষেত্রে কোন ছয়টি সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলা উচিত।
১. ঘরের কোণে, আলমারির ভিতরে বা টিভির পিছনে রাউটার রাখা
অনেকেই রাউটারকে ঘরের কোণে, বন্ধ আলমারির ভিতরে কিংবা টিভির পিছনে রেখে দেন। এতে ঘরের সৌন্দর্য বজায় থাকলেও ওয়াই-ফাই সিগন্যালের বিস্তারে বাধা তৈরি হতে পারে। বন্ধ জায়গা, ধাতব তাক এবং আশপাশের অন্যান্য বস্তু সিগন্যাল দুর্বল করে দিতে পারে।
রাউটার ঘরের একেবারে কোণে রাখলেও সমস্যা হয়। কারণ, সিগন্যাল বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বাড়ির বাইরের দিকে সিগন্যালের একটি অংশ চলে যেতে পারে, অথচ বাড়ির অন্য ঘরগুলিতে পর্যাপ্ত কভারেজ পাওয়া যায় না।
কী করবেন? রাউটারকে খোলা জায়গায়, সম্ভব হলে বাড়ির কেন্দ্রীয় অংশে একটি টেবিল বা তাকে রাখুন। তবে বাড়ির ঠিক মাঝখানে রাখাই একমাত্র লক্ষ্য নয়। আপনি যে ঘরে সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, সেই জায়গায় ভালো সিগন্যাল পৌঁছনোও গুরুত্বপূর্ণ।
২. মোটা দেয়াল, ধাতব আলমারি বা অ্যাকোয়ারিয়ামের পাশে রাউটার রাখা
ওয়াই-ফাই সিগন্যালের পথে বাধা তৈরি হলে তার শক্তি কমে যায়। কাচের তুলনায় ইটের দেয়াল, কংক্রিট এবং স্টিলের মতো উপাদান সাধারণত সিগন্যালের উপর বেশি প্রভাব ফেলে। বড় আয়না, ফ্রিজ এবং অন্যান্য বড় বৈদ্যুতিক যন্ত্রও সিগন্যালের বিস্তারকে প্রভাবিত করতে পারে। অ্যাকোয়ারিয়ামের জলও রেডিও সিগন্যাল শোষণ করতে পারে।
উপাদান ও নির্মাণের ধরন অনুযায়ী সিগন্যালের ক্ষতি আলাদা হয়। সাধারণভাবে, কাচের ক্ষেত্রে প্রায় ২ থেকে ৫ ডেসিবেল এবং কাঠের পার্টিশন বা ড্রাইওয়ালের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৫ ডেসিবেল পর্যন্ত সিগন্যাল লস হতে পারে। ইটের দেয়ালে এই ক্ষতি প্রায় ১০ থেকে ২৫ ডেসিবেল এবং কংক্রিটের দেয়ালে ১৫ থেকে ৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে। স্টিলের জালযুক্ত রিইনফোর্সড কংক্রিটে ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে।
এই পরিসংখ্যানগুলি আনুমানিক। দেয়ালের পুরুত্ব ও নির্মাণের ধরন অনুযায়ী প্রকৃত ক্ষতি পরিবর্তিত হয়।
কী করবেন? রাউটার এমন জায়গায় রাখুন, যেখান থেকে আপনার ব্যবহারের ঘরগুলিতে পৌঁছতে তুলনামূলক কম দেয়াল পেরোতে হয়। ধাতব আলমারি, ফ্রিজ কিংবা জলের বড় পাত্রের একেবারে পাশে রাউটার রাখা এড়িয়ে চলুন।
৩. মাইক্রোওয়েভ, কর্ডলেস ফোন বা ভিড়যুক্ত ফ্রিকোয়েন্সির কাছে রাউটার রাখা
রাউটারের আশপাশে থাকা অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রও ইন্টারনেটের কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং অনেক কর্ডলেস ফোন ২.৪ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডে কাজ করে। ফলে একই ব্যান্ড ব্যবহার করা ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে হস্তক্ষেপ বা ইন্টারফেরেন্স তৈরি হতে পারে।
ওয়াই-ফাইয়ের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
- ২.৪ গিগাহার্টজ: তুলনামূলক বেশি দূরত্বে সিগন্যাল পৌঁছয় এবং দেয়াল ভেদ করার ক্ষমতা ভালো। তবে এই ব্যান্ডে ভিড় ও ইন্টারফেরেন্স বেশি হতে পারে।
- ৫ গিগাহার্টজ: সাধারণত বেশি গতি দেয়, কিন্তু ২.৪ গিগাহার্টজের তুলনায় দেয়াল ভেদ করার ক্ষমতা কম।
- ৬ গিগাহার্টজ: ওয়াই-ফাই ৬ই এবং ওয়াই-ফাই ৭ সমর্থিত রাউটারে উচ্চ গতি ও কম ল্যাটেন্সির সুবিধা দিতে পারে। তবে এর রেঞ্জ কম এবং দেয়াল ভেদ করার ক্ষমতাও দুর্বল।
কী করবেন? রাউটারকে মাইক্রোওয়েভ, বেবি মনিটর এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র থেকে সম্ভব হলে প্রায় ৩ মিটার দূরে রাখুন। কাছাকাছি থাকা দ্রুতগতির ডিভাইসে ৫ গিগাহার্টজ ব্যবহার করতে পারেন। দূরের ঘরে থাকা স্মার্ট ডিভাইসের জন্য ২.৪ গিগাহার্টজ বেশি উপযোগী হতে পারে।
৪. ব্রডব্যান্ড সংযোগের প্রবেশপথেই রাউটার রেখে দেওয়া
বাড়িতে ফাইবার ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়ার সময় প্রযুক্তিবিদ অনেক ক্ষেত্রে দরজার কাছে, বারান্দায় কিংবা যে জায়গা দিয়ে তার বাড়িতে প্রবেশ করেছে, সেখানেই রাউটার বসিয়ে দেন। পরে অনেকেই সেটিকে আর সরান না।
এর ফলে প্রবেশপথের আশপাশে ভালো সিগন্যাল পাওয়া গেলেও শোওয়ার ঘর বা বাড়ির অন্য প্রান্তে সিগন্যাল দুর্বল হতে পারে।
কী করবেন? রাউটারকে বাড়ির বেশি ব্যবহৃত অংশের কাছাকাছি কেন্দ্রীয় স্থানে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে একটি লম্বা ইথারনেট কেবল ব্যবহার করে রাউটারকে উপযুক্ত জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন। বিকল্প হিসেবে অন্য একটি ওয়্যারলেস অ্যাক্সেস পয়েন্টও ব্যবহার করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে শুধু রাউটারের অবস্থান পরিবর্তন করলেই নতুন রাউটার কেনার প্রয়োজন হয় না।
৫. মেঝেতে রাউটার রাখা বা অ্যান্টেনার ভুল অবস্থান
রাউটার মেঝেতে রাখলে আসবাবপত্র ও অন্যান্য বাধার কারণে সিগন্যালের বিস্তার সীমিত হতে পারে। আবার বাইরের অ্যান্টেনার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে, উল্লম্বভাবে রাখা অ্যান্টেনা একই তলের বিভিন্ন দিকে সিগন্যাল ছড়াতে সাহায্য করে।
দোতলা বাড়িতে একাধিক অ্যান্টেনা থাকলে একটি অ্যান্টেনা অনুভূমিকভাবে রাখার পরীক্ষাও করা যেতে পারে। তবে সব রাউটারের নকশা এক নয়। তাই অ্যান্টেনার সঠিক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা অনুসরণ করা উচিত।
কী করবেন? রাউটারকে মেঝে থেকে তুলে টেবিল, উঁচু তাক অথবা দেওয়ালে লাগানো মাউন্টে রাখুন। টিভি, সেট-টপ বক্স বা পাওয়ার সাপ্লাইয়ের উপর রাউটার চাপিয়ে রাখবেন না। এতে বাধা ও অন্যান্য যন্ত্রের প্রভাব বাড়তে পারে।
৬. ওয়াই-ফাই এক্সটেন্ডারকে দুর্বল সিগন্যালের এলাকাতেই রাখা
বাড়ির যে ঘরে ওয়াই-ফাই পৌঁছয় না, সেখানে সিগন্যাল বাড়ানোর জন্য অনেকেই রেঞ্জ এক্সটেন্ডার ব্যবহার করেন। কিন্তু এক্সটেন্ডারকে যদি এমন জায়গায় রাখা হয়, যেখানে রাউটারের সিগন্যালই পৌঁছয় না, তাহলে সেটি কার্যকরভাবে সিগন্যাল পুনরায় পাঠাতে পারবে না।
এক্সটেন্ডারকে রাউটার ও দুর্বল সিগন্যালের এলাকার মাঝামাঝি এমন জায়গায় রাখতে হবে, যেখানে রাউটার থেকে যথেষ্ট ভালো সিগন্যাল পাওয়া যায়। তবে কিছু এক্সটেন্ডারে একই রেডিও দিয়ে সিগন্যাল গ্রহণ ও পাঠানোর কারণে কার্যকর গতি কমে যেতে পারে।
কী করবেন? প্রথমে রাউটার থেকে এক্সটেন্ডারের সম্ভাব্য অবস্থান পর্যন্ত সিগন্যাল পরীক্ষা করুন। বড় বাড়ি, একাধিক তল বা মোটা কংক্রিটের দেয়াল থাকলে মেশ ওয়াই-ফাই সিস্টেম বিবেচনা করতে পারেন। সম্ভব হলে মেশ নোডগুলির মধ্যে ইথারনেট সংযোগ ব্যবহার করলে পারফরম্যান্স আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
ভারতে ওয়াই-ফাই ৬ই ও ওয়াই-ফাই ৭ ব্যবহারকারীদের কী জানা জরুরি?
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভারতে ৫৯২৫ থেকে ৬৪২৫ মেগাহার্টজ পর্যন্ত নিম্ন ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড ইনডোর ওয়াই-ফাই ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যান্ড ওয়াই-ফাই ৬ই এবং ওয়াই-ফাই ৭ সমর্থিত রাউটারে উচ্চ গতি ও কম ল্যাটেন্সির সুযোগ দিতে পারে।
তবে ৬ গিগাহার্টজের সিগন্যাল দেয়াল ভেদ করে তুলনামূলক কম দূরত্বে পৌঁছয়। তাই এই ব্যান্ড ব্যবহার করতে চাইলে রাউটারকে উঁচু, খোলা এবং ব্যবহারকারীর কাছাকাছি জায়গায় রাখা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দূরের ঘরের জন্য ৫ গিগাহার্টজ বিকল্প হিসেবে কাজে আসতে পারে। অবশ্য ফোন বা ল্যাপটপেও ৬ গিগাহার্টজ সমর্থন থাকতে হবে।
মাত্র ১০ মিনিটে পরীক্ষা করুন রাউটারের সঠিক অবস্থান
রাউটারের জন্য ভালো জায়গা খুঁজতে বিশেষ যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই। স্মার্টফোন এবং একটি ইন্টারনেট স্পিড টেস্ট অ্যাপ ব্যবহার করেই প্রাথমিক পরীক্ষা করা যায়।
১. প্রথমে রাউটারের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ইন্টারনেটের গতি পরীক্ষা করুন।
২. এরপর যে ঘরগুলিতে সিগন্যাল দুর্বল, সেখানে একই ফোন দিয়ে স্পিড টেস্ট করুন। ফলাফল লিখে রাখুন।
৩. রাউটারকে আরও কেন্দ্রীয় এবং উঁচু জায়গায় সরিয়ে আবার পরীক্ষা করুন।
৪. আগের পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করার জন্য সম্ভব হলে একই সময়ের কাছাকাছি স্পিড টেস্ট করুন।
৫. যে অবস্থানে বাড়ির বিভিন্ন ঘরে সামগ্রিকভাবে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই বেছে নিন।
মনে রাখবেন, শুধু ফোনে ওয়াই-ফাই সিগন্যালের বার বেশি থাকলেই ইন্টারনেটের গতি ভালো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নেটওয়ার্কে ভিড়, ইন্টারফেরেন্স, রাউটারের ক্ষমতা এবং ব্রডব্যান্ড সংযোগের মানও গুরুত্বপূর্ণ।
রাউটার সরিয়েও সমস্যা না মিটলে কী করবেন?
রাউটারের অবস্থান ঠিক করার পরেও যদি বাড়ির কিছু অংশে সিগন্যাল দুর্বল থাকে, তাহলে মেশ ওয়াই-ফাই সিস্টেম বা অতিরিক্ত অ্যাক্সেস পয়েন্ট ব্যবহার করার কথা ভাবতে পারেন। আবার পুরনো রাউটার শুধু ২.৪ গিগাহার্টজ বা পুরনো ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি সমর্থন করলে সেটিও গতির সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
তবে নতুন রাউটার কেনা বা বেশি দামের ব্রডব্যান্ড প্ল্যানে যাওয়ার আগে বর্তমান রাউটারের অবস্থান, দেয়ালের বাধা এবং ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। অনেক সময় এই সাধারণ পরিবর্তনগুলিই বাড়ির ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে সাহায্য করে।
Get your daily dose of tech news and insight. Follow us on X, Facebook, WhatsApp and Google News for instant updates. Catch all the action on our YouTube channel.