১১৩ বছরে ৩০০ পার, বিস্ফোরণ পুজোসংখ্যায় - 24 Ghanta Bangla News
Home

১১৩ বছরে ৩০০ পার, বিস্ফোরণ পুজোসংখ্যায়

Spread the love

এই সময়: হিসেব বলে, সে বছর বিশেষ একটি পুজোসংখ্যা অন্তত ৩০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। সালটি ১৯৩৫। কলকাতা তথা বাংলায় দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল অবশ্য তারও ৬২ বছর আগে, ১৮৭৩–এ। কেশবচন্দ্র সেনের উদ্যোগে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘সুলভ সমাচার’-এর দুর্গাপুজোর বিশেষ সংস্করণ ‘ছুটির সুলভ’ নামে বেরিয়েছিল। পুজোর ছুটিতে পাঠকদের পড়ার জন্য প্রকাশিত হয়েছিল সেই বিশেষ সংখ্যা। প্রকৃত অর্থে পুজোসংখ্যা বলতে যা বোঝায়, সেটি ছিল ১৯১৩–র ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার কার্তিক সংখ্যা। ওই পত্রিকাকেই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা ‘শারদীয়া সংখ্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

১৯১৩ থেকে ২০২৬—১১৩ বছর পরে দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে প্রকাশিত পুজোসংখ্যার সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। অতীতের মতো এখন আর পুজোসংখ্যা প্রকাশের সময় মহালয়া বা তার কাছাকাছি কোনও একটি দিনে আটকে নেই। এখন জুন-জুলাই থেকেই পুজোসংখ্যা প্রকাশের হিড়িক পড়ে। এ বছর তো শারদ পত্রিকার সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। একটা সময় ছিল যখন শুধুমাত্র দৈ‍নিক কিংবা সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলি পুজোসংখ্যা প্রকাশ করতো। এখন সেই ট্রেন্ড বদলেছে। বইপাড়ার প্রকাশকরাও নিজেদের উদ্যোগে পুজোসংখ্যা বের করছেন।

তবে যে শোনা যায়, বাঙালিদের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা ক্রমশ কমছে? যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রতি বছর এত বেশি নতুন নতুন পুজোসংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে কী করে? জবাবে প্রবীণ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘বই পড়ার প্রবণতা কমেছে, বই বিক্রি হয় না—এমন একটা কথা বহু বছর ধরেই চলে আসছে। কিন্তু প্রতি বছর বইমেলার শেষে যে হিসেব দেওয়া হয়, সেটা দেখে তো মনে হয় না বই বিক্রি কিছু কমেছে বলে। কোন ধরনের বই মানুষ পড়ছেন, তার মান কেমন—আমি সে দিকে যাচ্ছি না। পুজোর সময়ে এত বেশি সংখ্যক শারদীয় সংখ্যা বেরোনোর একটাই অর্থ—পাঠক আছে।’

এই মত অবশ্য পুরোপুরি মানতে চাননি বর্ষীয়ান প্রকাশক ও সম্পাদক অনিল আচার্য। তিনি বলেন, ‘একটা সময়ে পুজোসংখ্যা প্রকাশিত হতো মহালয়ার সময়ে। এখন জুন-জুলাই থেকেই প্রকাশ হতে শুরু করেছে। যদি চার-পাঁচ মাস ধরে শারদ সংখ্যা বাজারে পাওয়া যায়, তা হলে একটা না একটা সময়ে তো বিক্রি হবেই। তাই সংখ্যা বৃদ্ধি এ ক্ষেত্রে কিছু প্রমাণ করে বলে মনে করি না। শারদ পত্রিকার মান আর আগের মতো নেই। পাঠক অপেক্ষা করে রয়েছেন উপন্যাস পড়বেন বলে—এমন লেখকের সংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত।’

বই এবং নানা রকমের পুজোসংখ্যা নিয়ে রীতিমতো সংবেদনশীল চন্দননগরের বাসিন্দা বইপ্রেমী গৌরব অধিকারী। পুজোসংখ্যা পত্রিকার জনপ্রিয়তা ও সংখ্যাবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসলে পুজোসংখ্যায় স্বাদবদলের মতো বহু রকমের লেখা থাকে। তাই একঘেয়ে লাগে না। এ ছাড়া কোনও একটা–দু’টো লেখা হতাশ করলেও বাকি লেখাগুলো মন ভালো করে দেয়।’

১৯১৩-তে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার শারদ সংখ্যা দিয়ে যে প্রচেষ্টার সূত্রপাত, সেটিই ১৯২০-৩০-এর দশকে সাহিত্য প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার পরে বাংলা সংবাদপত্রের প্রসার এবং মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে অন্তত একটি পুজোসংখ্যা কেনা দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। ফলে পুজোসংখ্যাকে কেন্দ্র করে বিশাল একটি অর্থনীতি গড়ে ওঠে। এর পর ১৯৭০-এর দশক থেকে পুজোসংখ্যা আর নতুন উপন্যাস সমার্থক হয়ে ওঠে। এই সময়ে পুজোসংখ্যা বাংলা প্রকাশনা শিল্পে আলাদা একটি ‘সিজ়ন’ তৈরি করে। লেখকরা নতুন উপন্যাস লিখতেন, সম্পাদকরা কয়েক মাস আগে থেকেই লেখা সংগ্রহ করতেন, প্রচ্ছদ নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা হতো, আর পাঠকরা পুজোর আগেই তালিকা তৈরি করতেন—কোন কোন পত্রিকা কিনবেন। ফলে পুজোসংখ্যা হয়ে ওঠে বার্ষিক সংগ্রহযোগ্য সাহিত্যপণ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *