দক্ষিণ চিন সাগর থেকে আটলান্টিক, ভারতীয় নৌসেনার ব্লু-ওয়াটার শক্তির বার্তা
নয়াদিল্লি: দক্ষিণ চিন সাগর, ভূমধ্যসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি দেশের ব্লু-ওয়াটার নৌসেনা (Indian Navy) সক্ষমতা তুলে ধরেছে বলে মন্তব্য করলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতীয় নৌসেনার ২০২৬ সালের দ্বিতীয় কমান্ডার্স কনফারেন্সে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি সমুদ্রপথে ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত উপস্থিতি এবং নৌসেনার ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিন দিনের এই শীর্ষ পর্যায়ের সম্মেলন ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এতে নৌসেনার শীর্ষ নেতৃত্ব অপারেশনাল প্রস্তুতি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে পর্যালোচনা করছে।
দক্ষিণ চিন সাগর থেকে আটলান্টিক, নজরে ভারতের নৌ-উপস্থিতি
রাজনাথ সিং বলেন, ভারতীয় নৌসেনার বিভিন্ন সমুদ্র অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন দেশের ব্লু-ওয়াটার সক্ষমতার প্রকাশ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রথম সাড়া প্রদানকারী দেশ এবং পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে নিজের ভূমিকা বজায় রাখছে। তিনি আরও বলেন, ভারতের কৌশলগত অবস্থান যেমন বাড়ছে, তেমনই সামুদ্রিক ক্ষেত্রে দায়িত্বও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কৌশলগত গভীরতা এবং আঞ্চলিক শক্তি প্রদর্শনে ভারতীয় নৌসেনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ALSO READ –পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ক! বাংলা-অসমে NIA র জালে বাংলাদেশি ১৩ জামাত জঙ্গি
সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থায় বড় আপগ্রেডের ডাক
বর্তমান সামুদ্রিক পরিবেশ আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। সমুদ্রপথে যানজট, বিভ্রান্তিমূলক কার্যকলাপ এবং গ্রে-জোন কার্যকলাপের মতো চ্যালেঞ্জ নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন তৈরি করেছে বলে তিনি জানান। রাজনাথ সিংয়ের মতে, শুধু নজরদারি করলেই হবে না, সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়াতে হবে। সামুদ্রিক ট্রাফিকের পরিমাণ এবং জটিলতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৌসেনার মনিটরিং এবং রেসপন্স মেকানিজমকে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
২০২৬ সালে ১৮টি যুদ্ধজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা
ভারতীয় নৌসেনার জন্য ২০২৬ সালকে গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে তুলে ধরেছেন রাজনাথ সিং। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ১৮টি যুদ্ধজাহাজ নৌসেনায় যুক্ত বা কমিশন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি এক বছরে নৌসেনার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ফোর্স অ্যাক্রিশন হতে পারে বলে তিনি জানান। দেশীয় জাহাজ নির্মাণ ব্যবস্থার অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। রাজনাথ সিং বলেন, সম্প্রতি কমিশন হওয়া যুদ্ধজাহাজগুলিতে ৭৫ শতাংশের বেশি দেশীয় উপাদান রয়েছে।
২০২৬ সালে কলকাতাতেও একাধিক দেশীয় প্ল্যাটফর্ম নৌসেনায় যুক্ত হয়েছে। জুনে আইএনএস দুনাগিরি, আইএনএস সংশোধক এবং আইএনএস অগ্রয় কমিশন করার সময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছিল, তিনটি প্ল্যাটফর্মেই ৭৫ শতাংশের বেশি দেশীয় উপাদান রয়েছে।
ALSO READ –সম্পর্কের বরফ গলাতে তৎপর ভারত-বাংলাদেশ! তারেকের ভারত সফরের আগে বাড়ছে কূটনৈতিক যোগাযোগ
যুদ্ধজাহাজ রফতানির লক্ষ্য
দেশীয় জাহাজ নির্মাণের বর্তমান অগ্রগতির পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভারতকে বন্ধুত্বপূর্ণ বিদেশি দেশগুলিতে যুদ্ধজাহাজ রফতানির ক্ষেত্রেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের নৌ-জাহাজ নির্মাণ ব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে। তাই শুধু দেশের প্রয়োজন মেটানো নয়, ভবিষ্যতে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলির কাছেও ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রাখা উচিত।
হরমুজ প্রণালীতে অপারেশন উর্জা সুরক্ষা
পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতীয় নৌসেনার ভূমিকার প্রশংসা করেন রাজনাথ সিং। বিশেষ করে অপারেশন উর্জা সুরক্ষা-র মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতীয় পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ, বিশেষ করে এলপিজি ট্যাঙ্কারগুলির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের আগে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন উর্জা সুরক্ষার অধীনে ভারতীয় নৌসেনা ১৮টি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে এসকর্ট করেছিল, যেগুলিতে ৯,০০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রয়োজনীয় পণ্য ছিল।
রাজনাথ সিং বলেন, ভারতের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৫০ শতাংশ সমুদ্রপথে আসে। ফলে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
নারীদের অংশগ্রহণেও জোর
ভারতীয় নৌসেনায় নারীদের নিয়োগ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তাঁদের অংশগ্রহণের কথাও তুলে ধরেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ‘অল র্যাঙ্কস, অল রোলস’ নীতির অধীনে ফ্রন্টলাইন যুদ্ধজাহাজ এবং বিমানে মহিলা অফিসারদের মোতায়েনের প্রশংসা করেন তিনি। নৌসেনার নেভিগেশনাল অভিযানে মহিলাদের অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন রাজনাথ সিং। এর মধ্যে নাভিকা সাগর পরিক্রমা-র মতো অভিযান রয়েছে।
সিটিএফ-১৫৪-এ ভারতের ভূমিকা
ভারতীয় নৌসেনা কম্বাইন্ড মেরিটাইম ফোর্সেস-এর অধীনে কম্বাইন্ড টাস্ক ফোর্স-১৫৪-এর কমান্ড গ্রহণ করায় সেটিকেও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন রাজনাথ সিং। ভারতের নেতৃত্বে কোচিতে আয়োজিত অপারেশন সাদার্ন রেডিনেস-এ ২৭টি দেশের ২৭৬ জন কর্মী, ৭৬ জন ফ্যাসিলিটেটর ও বিষয় বিশেষজ্ঞ এবং চারটি আন্তর্জাতিক সংস্থা অংশ নিয়েছিল বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
এছাড়াও আইএনএস সুদর্শিনী-র লোকায়ন-২৬ অভিযানের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এই অভিযান আমেরিকা, আটলান্টিক এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের সামুদ্রিক কূটনীতি ও প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করার পাশাপাশি দেশের সামুদ্রিক ঐতিহ্য তুলে ধরেছে বলে মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
ভবিষ্যতের জন্য আরও প্রস্তুত নৌসেনার লক্ষ্য
কমান্ডার্স কনফারেন্সে রাজনাথ সিং ভারতীয় নৌসেনাকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের জন্য আরও প্রস্তুত এবং যুদ্ধক্ষম বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার উপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যে শুধু সমুদ্রসীমা রক্ষা নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভারতের সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষায় নৌসেনার ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
তিন দিনের এই সম্মেলনে নৌসেনার শীর্ষ নেতৃত্ব অপারেশনাল প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যতের সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করছে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক নজরদারি, দেশীয় প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ এবং পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নৌসেনার সক্ষমতা বৃদ্ধিও আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।