বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ইউরোপে ড্রোন হামলার আশঙ্কা, সিআইএর সতর্কবার্তা
ইউরোপের একাধিক দেশের জন্য সম্ভাব্য নতুন ড্রোন হুমকি নিয়ে সতর্ক করেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা CIA। স্পেনের সংবাদমাধ্যম এল মুন্দোর প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, রাশিয়া…
ইউরোপের একাধিক দেশের জন্য সম্ভাব্য নতুন ড্রোন হুমকি নিয়ে সতর্ক করেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা CIA। স্পেনের সংবাদমাধ্যম এল মুন্দোর প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, রাশিয়া বাণিজ্যিক জাহাজকে গোপন ড্রোন উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে ভূমধ্যসাগর থেকে ইউরোপের উপকূলবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করতে পারে।
প্রতিবেদনে স্পেন, ফ্রান্স এবং ইতালিকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা সংক্রান্ত গোয়েন্দা সতর্কতা। হামলার ঘটনা ঘটেছে বা পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এমন তথ্য এখানে নেই।
কীভাবে ড্রোন উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা হতে পারে?
এল মুন্দোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজের মধ্যে ড্রোন লুকিয়ে রাখা হতে পারে। বিশেষ করে পণ্যবাহী কনটেনারের মধ্যে এগুলি রাখা এবং পরে আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে উৎক্ষেপণের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছোট আকারের ক্যাটাপল্ট ব্যবস্থা ব্যবহার করে জাহাজ থেকেই ড্রোন আকাশে পাঠানো হতে পারে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে ড্রোন উৎক্ষেপণের জন্য আলাদা সামরিক জাহাজ বা দৃশ্যমান ঘাঁটির প্রয়োজন হবে না। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে বিমানবন্দর, বন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর কথা বলা হয়েছে। উদ্দেশ্য বড় আকারের সামরিক হামলা চালানো নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা ব্যাহত করা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি করা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
Read More: হরমুজ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের, রিয়াদে হুথি ড্রোন হামলা
আলোচনায় রাশিয়ার গেরবেরা ড্রোন
সম্ভাব্য এই পরিকল্পনার সঙ্গে রাশিয়ার গেরবেরা নামের একটি ছোট মানববিহীন বিমান বা ড্রোনের নাম উঠে এসেছে। ডিফেন্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, গেরবেরা ড্রোনের ডানার বিস্তার প্রায় ২.৫ মিটার এবং এর ঘোষিত পাল্লা ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। তুলনামূলক ছোট এবং হালকা নকশার কারণে ড্রোনটি সহজে পরিবহণ এবং লুকিয়ে রাখার উপযোগী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়া গেরবেরা ব্যবহার করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ড্রোনটি শুধু হামলার জন্য নয়, প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার জন্য ডিকয় হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। এই ছোট আকার এবং তুলনামূলক কম খরচের বৈশিষ্ট্যই বাণিজ্যিক জাহাজের মধ্যে ড্রোন লুকিয়ে রাখার সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কেন বাণিজ্যিক জাহাজ নিয়ে উদ্বেগ?
সম্ভাব্য পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বাণিজ্যিক জাহাজকে উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা। ভূমধ্যসাগরে প্রতিদিন অসংখ্য বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য বেসামরিক জাহাজ চলাচল করে। এর ফলে সন্দেহজনক কোনও জাহাজকে আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের মধ্যে একটি জাহাজকে আলাদা করে নজরদারিতে রাখা এবং তার ভেতরে কী রয়েছে তা শনাক্ত করাও সহজ নয়। আন্তর্জাতিক জলসীমা ব্যবহার করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলিকে তখন শুধু নিজেদের আকাশসীমা নয়, সমুদ্রপথে চলাচলকারী বিপুল সংখ্যক বেসামরিক জাহাজের গতিবিধির দিকেও নজর রাখতে হবে।
৬০০ কিলোমিটার পাল্লা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গেরবেরা ড্রোনের ঘোষিত পাল্লা ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হওয়ায় সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে উৎক্ষেপণের স্থান বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। সমুদ্রের অনেকটা দূর থেকে কোনও ড্রোন উৎক্ষেপণ করা হলে সেটি ইউরোপীয় উপকূলের দিকে অপ্রত্যাশিত দিক থেকে এগিয়ে আসতে পারে। ফলে প্রচলিত নজরদারি ব্যবস্থা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ঘোষিত পাল্লা এবং বাস্তব অভিযানের কার্যকর পাল্লা সব পরিস্থিতিতে এক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবহাওয়া, উড়ানের উচ্চতা, পেলোড এবং অন্যান্য পরিচালনাগত বিষয় ড্রোনের কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
Read More: ‘পাকিস্তানের সন্ত্রাস ও প্রতারণা সবার সামনে উন্মুক্ত’: রাষ্ট্রসংঘে মোক্ষম জবাব ভারতের
বড় বিস্ফোরণের চেয়ে পরিষেবা ব্যাহত করাই উদ্বেগ
এই সম্ভাব্য হুমকির ক্ষেত্রে শুধু ধ্বংসের মাত্রা নয়, গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও বড় বিষয়। একটি তুলনামূলক ছোট ড্রোন বিমানবন্দর, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় আঘাত করলে সাময়িকভাবে পরিষেবা বন্ধ হতে পারে। এর ফলে বিমান চলাচল বা বন্দর পরিচালনায় বিঘ্ন, সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কোনও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন হামলার আশঙ্কা তৈরি হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট পরিষেবায় অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করতে হতে পারে।
নজরদারি ব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ড্রোন উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য পরিস্থিতি বাস্তবায়িত হলে ইউরোপীয় দেশগুলির জন্য আকাশ এবং সমুদ্র, দুই ক্ষেত্রেই নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে বেসামরিক জাহাজের স্বাভাবিক চলাচলের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক বা নাশকতামূলক কার্যকলাপ শনাক্ত করা একটি জটিল কাজ। একই সঙ্গে কোনও ঘটনার পর সেটির উৎস বা দায় নির্ধারণ করাও কঠিন হতে পারে। সিআইএর সতর্কতার পর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ, গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এবং উপকূলীয় পরিকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে নজরদারি বাড়ানোর প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে বর্তমানে প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে এটি একটি সম্ভাব্য রুশ ড্রোন পরিকল্পনা সংক্রান্ত গোয়েন্দা সতর্কতা, নিশ্চিত হামলার ঘোষণা নয়। পরিকল্পনাটি আদৌ বাস্তবায়িত হয়েছে কি না বা ভবিষ্যতে হবে কি না, সে বিষয়ে প্রকাশ্য তথ্য থেকে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।