‘আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের উপর হামলা নিন্দনীয়’, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জে উদ্বেগ প্রকাশ জয়শঙ্করের
রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তাঁর বক্তব্য, স্থলভাগের পুরনো সংঘাতের সঙ্গে সমুদ্রপথে তৈরি হওয়া নতুন নিরাপত্তা সমস্যাও এখন বিশ্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। শনিবার নিউ ইয়র্কে এই অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সংঘাতের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বহু দূরের দেশগুলিকেও তার মূল্য চোকাতে হচ্ছে। অথচ পরিস্থিতি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির অনেকেরই কার্যত এই যুদ্ধে কোনও ভূমিকা নেই।’
জয়শঙ্কর বলেন, ‘স্থলভাগে দীর্ঘদিন ধরে চলা সমস্যার সঙ্গে সমুদ্রপথেও নতুন নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। গালফ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের উপর হামলা হয়েছে। লোহিত সাগর থেকে কৃষ্ণ সাগর পর্যন্তও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।’
এই হামলায় ভারতীয় নাবিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের নাবিকেরও মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। জয়শঙ্করের কথায়, ‘ভারতীয় নাবিকরা প্রাণ হারিয়েছেন। অন্য দেশের নাবিকরাও প্রাণ হারিয়েছেন। এই ধরনের হামলা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
এই ধরনের হামলার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলতে ভারত ইতিমধ্যেই একটি উদ্যোগে যোগ দিয়েছে বলেও জানান বিদেশমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘লাইবেরিয়া এবং আরও ২৩টি দেশের সঙ্গে ভারত এই উদ্যোগে যোগ দিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, এই ধরনের অযৌক্তিক হামলার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জনমত তৈরি করা।’
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে সমুদ্রপথের নিরাপত্তার কথা তুলে ধরে জয়শঙ্কর বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও আপস করা যাবে না। ‘জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা যাতে কোনও পরিস্থিতিতেই বিঘ্নিত না হয়, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে,’ বলেন তিনি।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার উপরও জোর দেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘আন্তর্জাতিক আইন যথাযথভাবে মেনে চলা এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।’
জয়শঙ্করের কথায়, ‘শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ না থাকা নয়। গোটা বিশ্ব যদি ক্রমাগত হুমকি ও চাপের মধ্যে থাকে, তা হলে আমরা আসলে গভীর বিপদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি। আর এক ধাপ এগোলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।’
গালফের পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে বিদেশমন্ত্রী বলেন, ‘এই বছর পশ্চিম এশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে একটি সংঘাত দেখতে পাচ্ছি, যা ইতিমধ্যেই কঠিন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং নাবিকদের উপর হামলা গোটা বিশ্বের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
একই সঙ্গে এই সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে সংযত থাকার এবং উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানান ভারতের বিদেশমন্ত্রী। যুদ্ধের প্রভাব সংঘাতের এলাকা ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছয় বলেও উল্লেখ করেন জয়শঙ্কর। তাঁর কথায়, ‘বিশ্বায়নের যুগে যুদ্ধের প্রভাব গোটা বিশ্বেই পড়ে। সংঘাতের এলাকা থেকে বহু দূরে থাকা দেশগুলিকেও কোনও দোষ না থাকা সত্ত্বেও তার মূল্য দিতে হয়। অথচ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির অনেক সময়ে বলার সুযোগই সবচেয়ে কম।’ রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদকে পরিস্থিতির বাস্তব চিত্রের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও ভারতের অবস্থান
ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, তার প্রভাবও তত বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যের উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, ‘অন্তহীন যুদ্ধের পরিবর্তে এ বার যুদ্ধেরই অবসান হওয়া দরকার।’ শান্তি ফেরাতে যে উদ্যোগগুলি চলছে, ভারত সেগুলিকে সমর্থন করছে বলেও জানান তিনি।
যুদ্ধের কারণে খাদ্যশস্য ও জ্বালানি সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন জয়শঙ্কর। নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও জরুরি বলে জানান তিনি। এই পরিস্থিতির প্রভাব কমাতে ভারত যতটা সম্ভব সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করেন বিদেশমন্ত্রী।