Durga Puja: ৩টি পট এলেই মল্ল রাজবংশে শুরু হয় পুজো, বংশ পরম্পরায় পট আঁকেও একটি পরিবার | Malla royal family’s Durga Puja begins when the three traditional patachitras arrive, one family painting these sacred scrolls for generations in Bankura
ফৌজদার পরিবার বংশ পরম্পরায় এঁকে চলেছে মল্লরাজ কুলদেবী মৃন্ময়ীর পটImage Credit: TV9 Bangla
বাঁকুড়া: এ রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন রাজত্ব বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজত্ব। সেই মল্ল রাজবংশের কুলদেবী মৃন্ময়ীর পুজোও এ রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজা। সেই পুজোর সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে মল্ল সেনাপতি ফৌজদার পরিবারের নাম। কারণ, গত এক হাজার বছর ধরে গঙ্গামাটির প্রতিমার পাশাপাশি এই ফৌজদার পরিবারের হাতে আঁকা বিশেষ ধরনের তিনটি পটেই রাজ দরবারে পূজিতা হন দেবী মৃন্ময়ী।
কথিত আছে, মল্ল রাজারা সেনা পরিচালনার জন্য একসময় রাজস্থান থেকে দক্ষ সেনাপতি ফৌজদারদের বিষ্ণুপুরে নিয়ে আসেন। ৯৯৭ খ্রীষ্টাব্দে দৈব নির্দেশে ১৯ তম মল্ল রাজা জগৎমল্ল বিষ্ণুপুরে মৃন্ময়ীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। দৈব নির্দেশেই গঙ্গামাটির প্রতিমার পাশাপাশি মৃন্ময়ীর তিনটি পটে শুরু হয় পুজো। এসময় মৃন্ময়ীর পট তৈরির ভার পড়ে সেনাপতি ফৌজদারের উপর। ফৌজদার নিজের হাতে আঁকা মৃন্ময়ীর পট রাজ দরবারে উপস্থিত করলে রাজা সেই পটের শিল্পশৈলী দেখে মুগ্ধ হয়ে ফৌজদারের কাঁধে বংশ পরম্পরায় পট তৈরির ভার তুলে দেন। সেই সময় থেকেই মৃন্ময়ীর পট এঁকে চলেছে বিষ্ণুপুরের ফৌজদার পরিবার।
হাজার বছরের রীতি মেনে প্রতি বছর পুজো শুরুর ১৫ দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় মল্ল রাজ কুলদেবী মৃন্ময়ীর পুজো। যথাক্রমে জিতাষ্টমীর পরের দিন, মান চতুর্থী ও দুর্গা ষষ্ঠী এই তিনদিনে স্থানীয় একটি পুকুরে বিশেষ পুজো করে মন্দিরে নিয়ে আসা হয় বড় ঠাকরুণ, মেজো ঠাকরুণ ও ছোট ঠাকরুণকে। এই তিন ঠাকরুণ আসলে তিনটি পট। পুজো শেষে প্রতিমা নিরঞ্জন করা না হলেও পটগুলিকে নিরঞ্জন করে দেওয়ার রীতি রয়েছে মল্ল রাজ পরিবারে। ফলে প্রতিবছরই নিয়ম করে এই ৩টি পট হাতে আঁকতে হয় ফৌজদার পরিবারকে।
পটগুলি শিল্প শৈলীর দিক থেকে যেমন একেবারে ভিন্ন তেমনই এই পট আঁকার উপকরণও একেবারে ভিন্ন। হাজার বছরের পুরানো রীতি মেনে আজও মূলত বিভিন্ন গাছের পাতা, ফুল, ফল, পাথর ও মাটির নির্যাস থেকে রং বের করে প্রাকৃতিক বিভিন্ন গাছের আঠা এবং ছাগলের লেজের লোম থেকে নিজেদের হাতে তৈরি তুলি ব্যবহার করে আঁকা হয় এই পট। একেকটি পট নিখুঁতভাবে আঁকতে বিস্তর সময় লাগে। তাই পুজোর অন্তত ৩-৪ মাস আগে থেকেই ফৌজদার পরিবারে শুরু হয়ে যায় পট আঁকার তোড়জোড়। বছরভর বিখ্যাত দশাবতার তাস আঁকার কাজে ব্যস্ত থাকলেও পুজোর কয়েক মাস আগে থেকে শুধুমাত্র পট আঁকার কাজেই মনোনিবেশ করেন ফৌজদার পরিবারের শিল্পীরা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে মল্ল রাজত্ব। কার্যত ধুলোয় মিশে গেছে মল্লগড়ের বিশাল প্রাসাদ। কিন্তু অতীতের ঐতিহ্য, পরম্পরা, আভিজাত্য আর সাবেকিয়ানার প্রতীক হয়ে মল্ল রাজদরবারে আজও নিয়ম মেনে প্রতিমা আর ফৌজদার পরিবারের হাতে আঁকা পটে পূজিতা হয়ে আসছেন মল্ল রাজ কুলদেবী মৃন্ময়ী।
পট আঁকা নিয়ে কী বলছে ফৌজদার পরিবার?
বংশ পরম্পরায় তাঁরা এই পট এঁকে চলেছেন জানিয়ে ফৌজদার পরিবারের সদস্য সম্রাট ফৌজদার বলেন, “এই পটটা সম্পূর্ণ কাপড়ের তৈরি। হাতে আঁকা। এর যে রংটা দেখছেন, তাও প্রাকৃতিক। লণ্ঠনের ভুসি থেকে কালো রং। কাঁচা হলুদ বেটে হলুদ রং। সবুজ রংটা হল গাছের পাতা বেটে। লাল রঙের জন্য একটা পাথর পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে এই পট তৈরি করা হয়। তাই, এটা সবার চেয়ে একটু আলাদা।” একইসঙ্গে তিনি জানান, “এক-একটা পট আঁকতে ১০-১২ দিন অনন্ত সময় লাগে।” পুজোর আর কয়েকদিন বাকি। তাই, দম ফেলারও ফুরসত পাচ্ছেন না ফৌজদার পরিবারের শিল্পীরা। পটের ইতিহাস ব্যাখ্যা করেই ফের মনোনিবেশ করলেন আঁকায়।