বন্যা কেড়ে নিয়েছে সর্বস্ব, তবু ফের নতুন করে স্বপ্নের জাল বুনছেন নেপালের মহিলারা

‘সবকিছু হারিয়েছি, কিন্তু আশা ছাড়িনি’, বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন রেশমা। ঘর নেই। বাড়ির সামনের ছোট দোকানটাও ভেসে গিয়েছে হড়পা বানের জলে। যা সঞ্চল ছিল, এখন তাও প্রায় তলানিতে।

নেপালের ভয়াবহ বন্যার এক মাস কেটে গিয়েছে। বন্যার জল নেমে গেলেও বহু মানুষের জীবনে তার ক্ষত এখনও গভীর। কেউ কেউ হারিয়েছেন প্রিয়জনকে, কেউ আবার সারাজীবনের জমানো সর্বস্ব পুঁজি।

কিন্তু রেশমার মতো তাঁরাও আশা ছাড়েননি। কঠিন সময়ে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অন্যের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের হাতের রান্নাই এখন বহু বন্যাদুর্গত পরিবারের কাছে বেঁচে থাকার আশার প্রতীক।

গত ২৬ অগস্ট হড়পা বানের জেরে ভোটকোশী ও ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়। নুয়াকোট, রাসুয়া-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় কার্যত শ্মশানে পরিণত হয়েছিল। Nepal’s disaster management agency-এর সর্বশেষ ডেটা অনুযায়ী, প্রাণ হারিয়েছেন ১৪৫৩ জন। এখনও নিঁখোজ ৫,৬৪৪ জন।

রাষ্ট্রপুঞ্জের ডেটা অনুযায়ী, এই বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মহিলা ও শিশুরা। বহু মহিলা তাঁদের দুধের শিশুকে নিয়ে ক্যাম্পেই দিন কাটাচ্ছেন। পরিবারের কারও খোঁজও পাননি এখনও।

রেশমার মতো নিজের সর্বস্ব খুঁইয়েছেন ৮ বছরের সরিতা তামাং ও তাঁর বন্ধু কাঞ্চি মায়া তামাং। হড়পা বানের দিন পাহাড়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু দু’জনেরই মা সেই বানের জলে ভেসে যায়। সরিতা জানায়, পাহাড় থেকে তাঁরা দেখেছিলেন কী ভাবে জলের স্রোত তাঁদের বাড়িঘর গিলে নিচ্ছে। গভীর শোক থাকলেও তাঁরা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।

ঠিক যে লড়াইটা লড়ছেন রেশমা। ৩০ বছরের রেশমা স্বামীর সঙ্গে প্রায় এক দশক ধরে ক্যাটারিং ব্যবসা চালাচ্ছিলেন। বন্যার মাত্র ১২ দিন আগে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য তাঁরা ১২ লক্ষ নেপালি রুপি ঋণ নিয়ে নতুন সরঞ্জাম কিনেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বন্যা তাঁদের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

কিন্তু সেখানেই থেমে যাননি তিনি। বর্তমানে তিনি নুয়াকোটের একটি কমিউনিটি কিচেনের প্রধান রাঁধুনি। অন্য বন্যাদুর্গত মহিলাদের সঙ্গে মিলে প্রতিদিন খাবার রান্না করছেন বন্যাদুর্গতদের জন্য।

রাষ্ট্রপুঞ্জের UN Women-এর সহযোগিতায় নেপালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোট ও রাসুয়ায় চারটি কমিউনিটি কিচেন তৈরি হয়েছে। দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেখানে ১৫ হাজারের বেশি খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। সেখানেই এখন নিজের স্বপ্ন ফের নতুন করে বুনছেন রেশমা।

শুধু রেশমা নন, সান্নানি বিকের জীবনেও নেমে এসেছে ভয়াবহ শোক। বন্যায় নিজের ভাইকে হারিয়েছেন তিনি। এখন নিজের সন্তানদের পাশাপাশি ভাইয়ের সন্তানদেরও দেখাশোনা করছেন তিনি। সান্নানির কথায়, ‘কমিউনিটি কিচেনে কাজ করে যে আয় করছি, তা দিয়ে আমার সন্তান এবং ভাইয়ের সন্তানদের জরুরি প্রয়োজন মেটাচ্ছি’।

এক মাস পরেও নেপাল এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক ছন্দে ফেরেনি। তাঁদের হারানো ঘর, ব্যবসা বা প্রিয়জন কবে ফিরে পাবেন তাও তাঁদের অজানা। কিন্তু বিপর্যয়ের পরে ফের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা আর আশাই এখন তাঁদের একমাত্র সম্বল।