এসআইআর বিতর্কে এনডিএ’তে অস্বস্তি, নির্বাচন কমিশনের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাইল ৩ শরিক
নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR Row )নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এবার শাসক জোটের অন্দরেও নির্বাচন কমিশনের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি উঠল। বিজেপির তিন শরিক দল, লোক জনশক্তি পার্টির নেতা চিরাগ পাসওয়ান, রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চার প্রধান উপেন্দ্র কুশওয়াহা এবং তেলুগু দেশম পার্টির সাংসদ লাভু শ্রীকৃষ্ণ দেবরায়ালু, নির্বাচন কমিশনের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে। সেখানে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের কিছু সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগের মধ্যে ছিল, কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের জ্ঞান বা সুপারিশ ছাড়াই নেওয়া হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের তরফে এই প্রতিবেদনের পর জানানো হয়েছে, কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় মতপার্থক্য আলোচনা ও পর্যালোচনার স্বাভাবিক অংশ এবং SIR-সহ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে।
চিরাগ পাসওয়ানের বক্তব্য
এই পরিস্থিতিতে প্রথমে প্রকাশ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে আরও জোরালো ব্যাখ্যা চেয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং লোক জনশক্তি পার্টির সভাপতি চিরাগ পাসওয়ান। পাটনায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তিনি সরকারের অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে ‘ডিফেন্ড’ করতে চান না। বিরোধীরা রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী প্রশ্ন তুলবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
Advertisements
তবে তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা। চিরাগ বলেন, মানুষ যদি দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর আস্থা হারাতে শুরু করেন, তা গণতন্ত্রের পক্ষে ভালো হবে না। তাই নির্বাচন কমিশনের উচিত আরও জোরালোভাবে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা এবং মানুষের মনে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করা। চিরাগের বক্তব্য অনুযায়ী, কমিশনের ব্যাখ্যা বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী বা অন্য কোনও রাজনৈতিক নেতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য প্রয়োজন।
উপেন্দ্র কুশওয়াহারও ব্যাখ্যার দাবি
রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চার প্রধান এবং রাজ্যসভার সাংসদ উপেন্দ্র কুশওয়াহাও SIR নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতে নির্বাচন কমিশনের কাছে দ্রুত ব্যাখ্যা চেয়েছেন। এক্স-এ পোস্ট করে তিনি বলেন, SIR সংক্রান্ত বিতর্কের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। প্রকৃত পরিস্থিতি পরিষ্কার করতে নির্বাচন কমিশনের অবিলম্বে ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ, বিজেপির জোটসঙ্গী দলগুলির একাংশ সরাসরি SIR-এর বিরোধিতা না করলেও নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা এবং ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিচ্ছে।
TDP-র অবস্থান কী?
তেলুগু দেশম পার্টি অবশ্য অন্ধ্রপ্রদেশে SIR প্রক্রিয়াকে ‘সফল’ বলে উল্লেখ করেছে। দলের সাংসদ লাভু শ্রীকৃষ্ণ দেবরায়ালু বলেন, বিরোধীরাও অন্ধ্রপ্রদেশে এই প্রক্রিয়া নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের পক্ষে প্রমাণ দিতে পারেনি। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং গণতন্ত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। ফলে কেউ প্রশ্ন তুললে উপযুক্ত ব্যাখ্যা দেওয়া এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে পারে।
কী নিয়ে মূল বিতর্ক?
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশীর আপত্তির বিষয়গুলির মধ্যে ছিল নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন, ভোটার তালিকায় নাম যোগ ও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফর্ম ৬-এ SIR-এর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু নতুন প্রশ্ন যুক্ত করা হয়েছিল। সান্ধু এবং যোশীর আপত্তি ছিল, এই ধরনের পরিবর্তন আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে করা হয়েছে।
এছাড়া ভোটার তালিকার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ আরও কেন্দ্রীয় হয়ে যাচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দুই কমিশনারের নোটে রাজ্যস্তরের আধিকারিকদের ভোটার ডেটাবেসে প্রয়োজনীয় অ্যাক্সেস নিয়েও উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে SIR-সংক্রান্ত কিছু আপিল কে বা কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে করা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গোয়ার ক্ষেত্রেও একটি সফটওয়্যার সংক্রান্ত সমস্যা সামনে এসেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ৯৭ জন ভোটারকে স্থানীয় স্তরে যোগ্য বলে বিবেচনা করা হলেও সফটওয়্যার সংক্রান্ত সমস্যার কারণে তাঁদের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন এই রিপোর্টের পর জানিয়েছে, কমিশনের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, SIR-সহ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি তিন সদস্যের কমিশনের সর্বসম্মত অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আপত্তিগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশীও প্রকাশ্যে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি। ফলে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলির বিষয়ে তাঁদের সরাসরি প্রকাশ্য বক্তব্য এখনও সামনে আসেনি।
বিরোধীদের চাপও বাড়ছে
এই বিতর্ক সামনে আসার পর বিরোধী দলগুলি CEC জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টের ভিত্তিতে বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা তাঁর পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন এবং SIR নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে, বিজেপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে মতবিনিময়কে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও জ্ঞানেশ কুমারের পক্ষে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন এবং তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন।
ফলে SIR বিতর্ক এখন শুধু বিরোধী দল বনাম নির্বাচন কমিশনের বিষয় হয়ে নেই। শাসক জোটের শরিকদের একাংশও সাধারণ মানুষের সংশয় দূর করতে কমিশনের আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে, SIR-সহ তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী দিনে কমিশনের আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা এই বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।