বাংলাই ‘দ্বিতীয় কর্মভূমি’ হোক, চান আদানি
এই সময়: বাংলাকে নিজের ‘দ্বিতীয় কর্মভূমি’ করে তুলতে চান আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। বৃহস্পতিবার বণিকসভা ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্সের (আইসিসি) বার্ষিক অধিবেশন এবং ২০২৬-এর বার্ষিক সাধারণ সভায় মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এই মুহূর্তে এশিয়ার ধনীতম ব্যক্তি। সেখানেই তিনি বলেন, ‘৩০ বছর আগে মুন্দ্রা বন্দর দিয়ে আমার ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই অর্থে মুন্দ্রা আমার প্রথম কর্মভূমি। আজ কর্মজীবনের এতগুলি বছর পার করে আমি চাই, বাংলা আমার দ্বিতীয় কর্মভূমি হোক।’ সে ক্ষেত্রে বাংলাকে আর একটি গুজরাট তৈরি করা নয়, বরং বাংলার নিজস্ব শক্তি, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করে তোলাই তাঁর লক্ষ্য।
আদানি বলেন, ‘যে মাটি বন্দে মাতরম ধ্বনির মাধ্যমে দেশের মানুষের স্বাভিমান জাগিয়েছে, সেই জমিকে নতুন করে শক্ত করতে হবে, শক্তি জোগাতে হবে।’ বাংলার সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্যিক বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অংশীদারিত্ব হিসেবে তুলে ধরেছেন আদানি।
কিন্তু বাংলাই কেন?
তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন আদানি। তিনি বলেন, ‘দেশের সার্বিক ভাবমূর্তি তৈরিতে বাংলার মতো শক্তি আর কোনও জায়গা দেয়নি। দেশের ১২ জন নোবেল প্রাপকের মধ্যে ছ’জনের সঙ্গে বাংলার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাধারা, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সাহস এবং জগদীশচন্দ্র বসুর মেধা দেশকে বাংলার সেরা উপহার।’
এ দিন সকালে নিউ টাউনের সিলিকন ভ্যালিতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে আদানি গোষ্ঠীর হাসপাতাল— ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বিশিষ্ট এই শিল্পপতি। তারপরে বিকেলে বণিকসভার অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।
বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, বাংলার মানুষের সংবেদনশীল মনোভাব এবং সর্বোপরি বুদ্ধিমত্তাই প্রাথমিক ভাবে এই রাজ্যের প্রতি তাঁকে আকৃষ্ট করে বলে তিনি জানান। শুধু তাই নয়, বাংলা নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার কথা ঘোষণার আগে এই রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ করে আসছে— এমন শিল্পগোষ্ঠী ও শিল্প-পরিবারগুলিকে সম্মান জানিয়ে আদানি বলেন, ‘যে সমস্ত শিল্পপতি এবং শিল্প-পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নানা অর্থনৈতিক ওঠাপড়ার মধ্যেও এই রাজ্যে বিনিয়োগ করে চলেছেন, তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানাই। এমনকী, খারাপ সময়ের মধ্যেও তাঁরা কেউ নিজের কর্মভূমিকে ছেড়ে যাননি। একজন প্রকৃত শিল্পপতির কাছ থেকে এটাই আশা করা যায়।’
এ রাজ্যে বন্দর, লজিস্টিক্স, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিদ্যুৎ বণ্টন, গ্রিন সিমেন্ট, সড়ক ও সেতু নির্মাণ, হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার-সহ একাধিক ক্ষেত্রে আগামী ১০ বছরের মধ্যে আদানি গোষ্ঠী এক লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে বলে তিনি জানান।
তাঁর মতে, বিগত কয়েক দশক ধরে দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ ভাগ অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে চলেছে। কিন্তু, এক লক্ষ কোটি ডলার অর্থনীতির ‘বিকশিত ভারত’ তৈরি করতে হলে এই যাত্রার পরবর্তী অধ্যায়ে এক নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্রের প্রয়োজন রয়েছে। আর পূর্ব ভারত, বিশেষ করে বাংলা সেই জায়গা নিতে পারে বলে আদানি বিশ্বাস করেন।
তাঁর কথায়, ‘বাংলার নিজস্ব খনিজ সম্পদ তো রয়েইছে। এর পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড, ওডিশা এবং ছত্তিসগড়ের মতো খনি ও খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ রাজ্য বাংলাকে ঘিরে রয়েছে। তা ছাড়া উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলার গুরুত্ব অপরিসীম। সর্বোপরি ইন্দো-প্যাসিফিক এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির নিকটবর্তী হওয়ায় ব্যবসা বিস্তারে বাংলার কৌশলগত অবস্থান উপেক্ষা করা যায় না।’ এই দেশগুলির সঙ্গে দেশকে বাংলাই যুক্ত করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিশ্বের মোট জিডিপি-র ৬০ শতাংশ এবং জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের কাছে পৌঁছনো অনেক সহজ হবে বলে তাঁর দাবি।
এ দিন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমোরটুলি ঘাটের পুনরুজ্জীবনে সহায়তার কথা জানানো হয়েছে আদানি গোষ্ঠীর তরফে। দুর্গাপুজোর শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে একটি বিশেষ পুজো কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংসের সংরক্ষণেও সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।