‘খাবার যার যার, উৎসব সবার’, দুর্গাপুজোয় এটাই হোক পণ - 24 Ghanta Bangla News
Home

‘খাবার যার যার, উৎসব সবার’, দুর্গাপুজোয় এটাই হোক পণ

Spread the love

তরুণী: এই যাঃ! এ বার পুজোয় তা হলে আমরা আর মাছ খেতে পারব না? হোটেলে খাওয়াও বন্ধ?

যুবক: আরে না না, সব বাজে কথা। পয়সা খরচ করে নিরামিষ খেতে পারব না। খেলে আমিষই খাব। পুজো বলে কথা! রাত জেগে ঠাকুর দেখতে গিয়ে একটা চিকেনরোল না খেলে চলে নাকি।

তরুণী: (মুচকি হেসে) যাক গে, বাদ দাও! যা হবে দেখা যাবে।

ওঁদের সামনের সিটেই বসে আমি। ঘুরে ওদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। গত কয়েক দিন ধরে ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ছে বাগেশ্বর বাবার কথা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা। তিনি বলেছেন, ‘পুজোর সময়ে মণ্ডপের নীচে আমিষ রান্না হয়।’ পশ্চিম বাংলার লোকজন পুজোর সময়ে মাছ, মাংস খান, তাঁর এ সব একদম না–পসন্দ। তা, তিনি এ সব পছন্দ না–ই করতে পারেন। এটা সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু, তারপর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায়, বাসে, মেট্রোয়, চায়ের দোকানে, স্কুলের অভিভাবকদের আড্ডায়— সর্বত্র সেই বিষয়টাই হয়ে গিয়েছে ‘টক অফ দ্য টাউন’।

তবে, বাগেশ্বর বাবা এক জায়গায় একটু ভুল। তিনি বলেছেন, মণ্ডপের নীচে আমিষ রান্না হয়। না, আমরা তো অষ্টমী, নবমীর দিন থালা সাজিয়ে মাকে পাঁচ পদের ভোগ দিই। সেই ভোগের থালায় কিন্তু মাছের ভোগ থাকে। কোনও বাড়িতে কাতলা, ইলিশ, চিংড়ি দিয়ে মায়ের থালা সাজিয়ে দেওয়া হয়। কোনও বাড়িতে ল্যাটা পোড়া থেকে শুরু করে অনেক রকমের মাছ থাকে ভোগের থালায়। মেয়ে যখন শ্বশুরবাড়ির থেকে বাপের বাড়ি আসে তখন মা সারাদিনই তার জন্য হরেক রকমের পদ রান্না করেন। বাপের বাড়ি এলে মেয়েকে ভালো ভালো পদ রান্না না করে দিলে আবার মায়ের মন মানে না। ছোট থেকে শুনে আসছি, মা দুর্গাও বছরে এই একবার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়ি আসেন। তাই মেয়ে বাড়ি এলে যেমন আদর-যত্ন করা হয়, ঠিক তেমনই মা দুর্গা এলে মেয়ের মতো তাঁকে আদর যত্ন করা হয়। কোন দিন কোন পদ দিয়ে তাঁর ভোগ হবে সব ঠিক করে নেন বাড়ির লোকজন।

কলকাতার চোরবাগান চ্যাটার্জি বাড়িতে মা দুর্গাকে মাছ ও অন্য আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। যা পরিবারের পুরুষ সদস্যরা রান্না করেন। অনেক বাড়িতেই সন্ধিপুজোয় পোড়া ল্যাটা মাছ, ইলিশ কিংবা নবমীতে মাছের পদ রান্না করে মা দুর্গাকে উৎসর্গ করা হয়। দক্ষিণ কলকাতার সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বাড়ির ভোগে ভাত, পোলাও, পাঁচ রকমের ভাজা, মাছ থাকে। তার সঙ্গে থাকে আরও অনেক কিছু। দশমীর দিন পান্তা ভাত, কচুর শাকের সঙ্গে নিবেদন করা হয় কই মাছের ঝোল ও খেসারির ডাল।

তারপরে ধরুন উত্তর কলকাতার লাহা পরিবারের কথা। কথিত আছে, এই পরিবারের নবকৃষ্ণ লাহার স্ত্রী দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান। তারপরেই লাহা পরিবারে দুর্গাপুজো শুরু হয়। এখন এক বছর পুজো হয় ঠনঠনিয়ার লাহা বাড়িতে, পরের বার আবার কৈলাস বোস স্ট্রিটের লাহা বাড়িতে। এই বাড়ির বিখ্যাত রান্নাগুলির মধ্যে প্রিয় হলো সুজির নাড়ু ও শিঙি মরিচ। সুজির নাড়ু খুব প্রচলিত মিষ্টি হলেও লাহা বাড়ির নাড়ুর বিশেষ খ্যাতি আছে। এ ছাড়া আমিষ পদের মধ্যে শিঙি মরিচ বেশ অন্যরকম খেতে।

এ তো গেল কলকাতার কথা। এ বার একটু জেলার দিকে যাওয়া যাক। পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরের মিশ্র বাড়িতে আমিষ ছাড়া ভোগ হয় না। রামনগরের প্রাক্তন বিধায়ক প্রয়াত অবন্তি মিশ্রর বাড়ির পুজোয় দেবীকে মাছের ভোগ দেওয়া হয়। অবন্তি মিশ্রের নাতি বিভাস রঞ্জন মিশ্র জানিয়েছিলেন, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী— চার দিনই পারিবারিক প্রথা মেনে দেবীকে বাড়ির পুকুরের মাছ ভোগ দেওয়া হয়। পশ্চিম মেদিনীপুরের বড়বাজারের ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল ১৯৩৭–এ। এখানে নবমীর ভোগে মাছের পদ দেওয়া হয়। দশমীতে শোল মাছ পোড়া ও পান্তাভাত দেবীকে নিবেদন করা হয়। দাঁতনের কৃষ্ণপুরের মহাপাত্র (রায় মহাপাত্র) জমিদার বাড়ির ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো দুর্গাপুজোতেও ভোগে মাছ দেওয়া হয়। এখানে সকালে খিচুড়ি ভোগ রাতে পোনা মাছের ভোগ দেওয়া হয়। পুজোর প্রথম দিন থেকেই জমিদারবাড়ির পুকুর থেকে মাছ ধরে দেবীকে নিবেদন করার রীতি রয়েছে।

মুর্শিদাবাদে আটপলগাছি বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য মাছের ভোগ। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিদিনই অন্নভোগের সঙ্গে মাছের ভোগ থাকা বাধ্যতামূলক। এমনকী অষ্টমীর দিনেও মা দুর্গাকে মাছ উৎসর্গ করা হয়। বালুরঘাটের পাল বাড়ির পুজো ৪০০ বছর পুরোনো। এই পুজোর বিশেষত্ব নবমী ও দশমীর দিন মাকে পান্তাভাত, বোয়াল মাছ ও রাইখর মাছের ভোগ দেওয়া হয়। অন্য দিন অবশ্য নিরামিষ ভোগই দেওয়া হয়। এমন অনেক বনেদি বাড়ির পুজোতেই দেবীকে মাছের ভোগ দিয়ে পুজো করা হয়।

আমাদের বাঙালিদের এটাই ঐতিহ্য। আমরা দেবীকে শুধু পুজো করি না, তাঁকে সন্তানের মতো স্নেহ করি। আবার মা-ও বলি। পুজোর দিনগুলিতে আমার সন্তান যদি ভালোমন্দ খাবার না খায় মা হিসেবে আমি কিন্তু কষ্টই পাব। আর আমরা তো মাছে-ভাতে বাঙালি। আমাদের কাছে ভালো খাবার রান্না মানেই ভালো ভালো মাছের পদ রান্না করা। তাই মা যখন আমাদের বাড়িতে মেয়ে রূপে আসেন, তখন তাঁকে ভালো ভালো মাছ রান্না করে থালায় সুন্দর করে বেড়ে খেতে না দিতে পারলে কিন্তু আমার মন খারাপ হবে। তাই মণ্ডপের নীচে নয়, আমাদের বাড়ির ঠাকুর দালানেই আমিষ রান্না হয় দুর্গাপুজোতে। সেখানে থালা সাজিয়ে গুড়ের নাড়ু, চিনির নাড়ু, খইয়ের মোয়া, মুড়ির মোয়া, পায়েস, নানা রকমের ফল, মিষ্টি যেমন দেওয়া হয়, তেমনই অনেক রকমের মাছও থাকে। এককথায় মা-কে মাছের ভোগ উৎসর্গ করে আমরা তৃপ্তি পাই। তবে বিভিন্ন বাড়ির বিভিন্ন নিয়ম আছে। সেই প্রথা অনুযায়ী তাঁরা দুর্গাপুজো করেন। আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি দুর্গাপুজো হয়। আমি ছোট থেকেই দেখে এসেছি দেবীকে মাছের ভোগ দিয়ে পুজো করতে। অষ্টমীর দিনে তাঁদের বাড়িতে ভোগ খাওয়ার প্রচলন আছে। সেই খাবারেও কিন্তু মাছ থাকে। অষ্টমী ও নবমী দু’দিনই মাকে কাতলা, ইলিশ-সহ বিভিন্ন মাছ দেওয়া হয়। তা ছাড়া পুজোর সময়ে কে নিরামিষ খাবেন, কে মাছ-মংস খাবেন, তা সম্পূর্ণ যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ এসে বিষয়টি আমাদের উপরে চাপিয়ে দিতে পারেন না বলে আমার মনে হয়।

এ তো গেল দুর্গা পুজোর ভোগ নিবেদনের কথা। এ বার নবরাত্রি নিয়ে বলি। নবরাত্রি হলো ন’টি রূপে দুর্গাকে পুজো করা। অর্থাৎ নবরাত্রিতে দেবী দুর্গার নয়টি রূপ বা নবদুর্গার পুজো করা হয়। শৈলপুত্রী, হিমালয় রাজের কন্যা, এটি দেবীর প্রথম রূপ। ব্রহ্মচারিণী হলো তপস্যা ও ত্যাগের প্রতীক। চন্দ্রঘণ্টা, কপালে অর্ধচন্দ্রাকৃতি ঘণ্টা ধারণকারী রূপ। কুষ্মাণ্ডা, সৃষ্টি বা ব্রহ্মাণ্ডের রূপকার। স্কন্দমাতা, কার্তিকের বা স্কন্দের মাতা। কাত্যায়নী, মহিষাসুর বধকারী যোদ্ধা দেবী। কালরাত্রি অত্যন্ত ভয়ঙ্করী ও অন্ধকার নাশকারী রূপ। মহাগৌরী হলো পরম সুন্দরী ও শান্তির রূপ। সিদ্ধিদাত্রী, সকল সিদ্ধি বা পূর্ণতা প্রদানকারী রূপ। নবরাত্রির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কাহিনি হলো মা দুর্গার মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে দেবীর আবির্ভাব হয় এবং তিনি মহিষাসুরকে পরাজিত করেন। তাই নবরাত্রি শুধু উৎসব নয়—এটি অহঙ্কার, অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ ও ন্যায়ের বিজয়ের প্রতীক। এই সময় বেশির ভাগ অবাঙালি নিরামিষ খান। তাই এটা ভাবার কারণ নেই, যে পশ্চিম বাংলার মানুষও এ সময় নিরামিষ খাবার খাবে।

অনেক অঞ্চলে অষ্টমী ও নবমী বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টমীতে দুর্গাষ্টমী বা মহাষ্টমী পালন করা হয়। নবমীতে মহানবমী পালিত হয়। অনেক পরিবারে কন্যাদের দেবীর রূপ হিসেবে সম্মান করে কন্যাপুজো বা কুমারী পুজো করা হয়। নবরাত্রিতে সাধারণত অষ্টমী বা নবমী তিথিতে কন্যা বা কুমারী পুজো করা হয়। বিশেষ করে নবমীর দিনে অনেক পরিবার কন্যাপূজন বা কন্যাভোজনের আয়োজন করে। এরকম কন্যাপুজো আমারও হয়েছে। আমার বেড়ে ওঠা অবাঙালি পরিবেশে। তাই যতদিন ছোট ছিলাম আমিও কন্যপুজোতে অংশ নিতে পেরেছি। নিয়ম অনুযায়ী, একজন ছোট মেয়েকে দেবীর প্রতীক হিসেবে আমন্ত্রণ করা হয়। তাঁদের পা ধুয়ে পরিষ্কার আসনে বসানো হয়। তারপরে তাদের কপালে সিঁদুরের টিপ পরিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করা হয়। এরপর তাদের পুরী, ছোলা, সব্জি, নানা রকমের মিষ্টি ও ফল দিয়ে থালা সাজিয়ে খেতে দেওয়া হয়। সব শেষে ওই ছোট মেয়েদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেন বাড়ির লোকজন। নানা রকমের উপহারও পাওয়া যায় কন্যাপুজোয়। এই সমস্ত পরিবারগুলিকে দেখেছি নবরাত্রির কয়েকটা দিন সম্পূর্ণ নিরামিষ খেতে। তবে আমি বাঙালি বাড়ির মেয়ে। আগের দিন মাছ খেয়েছি। পরের দিন কন্যা পুজোতে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছে। কোনও দিন তাঁদের কেউ মাছ-মাংস নিয়ে বিবাদ করেননি। আমাদের খাবার আমরা খাচ্ছি। তাঁদের খাবার তাঁরা খাচ্ছেন। এই তো বেশ। সবশেষে হলো মিলমিশের গাঢ়ত্ব। এটা থাকলেই হলো। আমার এক আবাঙালি বান্ধবী নিরামিষ খান। কিন্তু তাঁর স্বামী ও মেয়ে দু’জনেই মাছ, মাংস, ডিম খান। তাঁর কথায়, ‘আমার থালাতেও যদি কেউ মাছ, মাংস খায় খেতে পারে। আমি না খেলেই হলো।’ নবরাত্রির এই ন’দিন তিনি নিরামিষ খেলেও বাধ মানে না মেয়ে ও স্বামী। তাঁরা কিন্তু বাঙালিদের মতো পাত পেড়ে পুজোর সময়ে আমিষ খাবারই খান। এতে যদিও আমার বন্ধুর কোনও আপত্তিও নেই।

তবে এখন অনেক বাঙালি বাড়ির লোকজন ন’দিনই নিরামিষ খেয়ে নবরাত্রি পালন করেন। ডান্ডিয়া খেলতে যান। সেটাও তো তাঁদের বিশ্বাস। কেউ যদি মন থেকে এ সব পালন করতে চান, করবেন। বাধা কোথায়! সব কিছুই নির্ভর করে আসলে আমাদের মনের উপরে। মন যা বলে, তাই করা উচিত। কথিত আছে, আত্মাকে কষ্ট দিয়ে কিছু করা উচিত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *