হারিয়েছে কদর, কমেছে বরাতও, ধুঁকছে মালাপাড়ার শোলাশিল্প
বাবলু সাঁতরা, চন্দ্রকোণা
এক সময়ে পুজোর অনেক আগে থেকেই ব্যাস্ত হয়ে পড়তেন তাঁরা। নাওয়া–খাওয়া ভুলে শোলার কাজ করতেন। বরাতও মিলত প্রচুর। তাই গ্রামের মহিলা–পুরুষ সবাই এ কাজই করতেন। কিন্তু বদলেছে সময়। এখন বেশির ভাগ পুজো কমিটি শোলার বদলে বিভিন্ন রকমের গয়না দিয়ে দেবীকে সাজান। এখন আর চন্দ্রকোণা-১ ব্লকের মনোহরপুর-২ পঞ্চায়েতের কুলদহ ও ডিঙাল গ্রামে মালাকার পাড়ার শোলাশিল্পীদের সেই ব্যস্ততা দেখা যায় না। সময়ের গতিতে হারিয়ে যেতে বসেছে শোলার কদর।
চন্দ্রকোণার কুলদহ ও ডিঙাল গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে গিয়েছে শিলাবতী নদী। নদীর দুই পাড়ে এই দু’টি গ্রামে ৫০ টির মতো মালাকার পরিবারের বাস। বংশপরম্পরায় এই মালাকার পরিবারগুলি শোলার কাজের উপর নির্ভরশীল ছিল। শোলা দিয়ে প্রতিমার অলঙ্কারের পাশাপাশি বিয়ের মুকুট এবং বিভিন্ন পুজোর সামগ্রী তৈরি করতেন তাঁরা। দুর্গা পুজোর আগে শোলার তৈরি প্রতিমার মুকুট, গয়নার বরাত পেত মালাকার পরিবারগুলি। কিন্তু এখন প্রতিমার গয়নায় জরি ও চুমকির কাজ চলে আসায় চাহিদা কমেছে শোলার। থিম পুজোর হিড়িকে থার্মোকল–সহ আরও নানা উপাদান এসেছে। তাই পুজো এলেও আর তেমন বরাত আসে না শোলার গয়নার। বর্তমানে শোলার ডিজাইন করা চাঁদমালা তৈরি করে এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন হাতেগোনা কয়েকটি মালাকার পরিবার। কুলদহ ও ডিঙাল গ্রামে হাতেগোনা চার পাঁচটি পরিবার শোলার কাজের সঙ্গে এখন যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ শোলার কাজ ছেড়ে থার্মোকলের গয়না তৈরিতে হাত পাকাচ্ছেন। শিল্পীদের কথায়, ‘কাঁচামাল হিসাবে শোলা প্রধান উপকরণ। আগে শোলা দাসপুরের বেশ কিছু এলাকা থেকে আমদানি হতো। বর্তমানে শোলার আকাল। জলাশয় ভরাট, কখনও আবার পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে শোলার উৎপাদন কমে গিয়েছে। এখন সবং, পিংলা ও হাওড়া জেলায় শোলা কিনতে যেতে হয়। শোলার দামও আকাশ ছোঁয়া।’ শিল্পীরা জানান, এক বান্ডিল (১০০ পিস) ভালো শোলার দাম বর্তমানে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এ বছর বান্ডিল পিছু শোলার দাম দুই থেকে তিনশো টাকা বেশি। কারণ, শোলার উৎপাদন কম। এ ছাড়াও অন্য উপকরণ যেমন চুমকি, ভেলভেট, রঙের দামও প্রচুর বেড়েছে। শিল্পীরা জানান, কাঁচামাল ও উপকরণের দাম বাড়লেও শোলার গয়নার দাম সে ভাবে বাড়েনি।
ডিঙাল গ্রামের শোলাশিল্পী প্রদীপ মালাকার বলেন, ‘আগে বাবা এ কাজ করতেন। তিনি মারা যাওয়ার পরে আমি কাজ ধরে রেখেছি। আগে বাড়ি বয়ে বিভিন্ন পুজো কমিটি অর্ডার নিয়ে আসত। এখন পাইকারি বিক্রি হয়। লোকাল কয়েকটি দোকানে দিয়ে আসি। বাকি হাওড়ায় পাইকারের কাছে পাঠিয়ে দিই। পরিশ্রম বেশি লাভ কম।’ শোলাশিল্পী দিলীপ মালাকার বলেন, ‘শোলা ঠিকঠাক পাওয়া যাচ্ছে না। টুকটাক থার্মোকলের কাজ করছি। নতুন প্রজন্মের একাজে উৎসাহ নেই। মালাকার পরিবারের অনেক ছেলে বাইরে কাজে চলে গিয়েছেন। আমার পরিবারে আমিই হয়তো শোলার কাজে শেষ পিড়ি।’