অপারেশন সিঁদুরে বদলেছে ভারতের সামরিক কৌশল, বাড়ছে স্থলভিত্তিক অস্ত্রের গুরুত্ব - 24 Ghanta Bangla News
Home

অপারেশন সিঁদুরে বদলেছে ভারতের সামরিক কৌশল, বাড়ছে স্থলভিত্তিক অস্ত্রের গুরুত্ব

Spread the love

কলকাতা: ২০২৫ সালের ৭ মে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর শুরু করা অপারেশন সিঁদুর সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক প্রতিক্রিয়াকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। ২২ এপ্রিল পহেলগামে জঙ্গি হামলায় ২৬ জনের মৃত্যু হওয়ার পর এই অভিযান চালানো হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারত পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে মোট ৯টি জঙ্গি স্থাপনায় নির্ভুল হামলা চালায়। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক তখন জানিয়েছিল, হামলাগুলি ছিল লক্ষ্যভিত্তিক, পরিমিত এবং সংঘাত না বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত। পাকিস্তানের কোনও সামরিক স্থাপনা তখন লক্ষ্য করা হয়নি।

এই অভিযানের তাৎপর্য শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি জঙ্গি স্থাপনায় আঘাত হানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক যুদ্ধে স্থলভিত্তিক আগ্নেয়াস্ত্র, ড্রোন, নজরদারি ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং আকাশ প্রতিরক্ষার মধ্যে সমন্বয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, অপারেশন সিঁদুর সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।

আকাশশক্তির পাশাপাশি স্থলভিত্তিক আগ্নেয়াস্ত্র

অপারেশন সিঁদুর নিয়ে আলোচনায় সাধারণত বিমানশক্তি ও নির্ভুল দূরপাল্লার অস্ত্রের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে স্থলভিত্তিক গোলন্দাজ ব্যবস্থা, রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র এবং নজরদারি ব্যবস্থার গুরুত্বও দ্রুত বাড়ছে।

১৫৫ মিলিমিটার শ্রেণির কামান, এম৭৭৭ আল্ট্রা-লাইট হাউইৎজার, ধনুষ কামান, পিনাকা রকেট ব্যবস্থা এবং অন্যান্য দূরপাল্লার অস্ত্র এখন শুধু বিস্তীর্ণ এলাকায় গোলাবর্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয় না। নির্দিষ্ট লক্ষ্য শনাক্ত করে তুলনামূলকভাবে নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষমতাও এসব ব্যবস্থার রয়েছে।

Advertisements


   


   

এই পরিবর্তনের ফলে স্থলভিত্তিক আগ্নেয়াস্ত্রকে শুধু সহায়ক অস্ত্র হিসেবে দেখার ধারণা বদলাচ্ছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এগুলি দ্রুত প্রতিক্রিয়া, পাল্টা গোলাবর্ষণ এবং সীমিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

নজরদারি থেকে হামলা, কয়েক মিনিটেই সিদ্ধান্ত

আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল সেন্সর এবং অস্ত্র ব্যবস্থার মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ। শত্রুর গোলাবর্ষণ শনাক্ত করা, অবস্থান নির্ধারণ করা এবং দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কাউন্টার-ব্যাটারি রাডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভারতের স্বদেশি ডব্লিউএলআর স্বাথী রাডার এই ধরনের ব্যবস্থার অন্যতম উদাহরণ। এটি শত্রুপক্ষের মর্টার, রকেট এবং গোলন্দাজ হামলা শনাক্ত করে সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে।

এর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সমন্বয় যুক্ত হলে একটি পূর্ণাঙ্গ সেন্সর-টু-শুটার ব্যবস্থা তৈরি হয়। অর্থাৎ লক্ষ্য শনাক্ত হওয়ার পর সেটি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত এবং অস্ত্র ব্যবহারের মধ্যে সময় কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।

অপারেশন সিঁদুর নিয়ে সরকারি বিশ্লেষণেও গোয়েন্দা তথ্য, ড্রোন, লইটারিং মিউনিশন এবং বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রহ্মোস নিয়ে নতুন করে আলোচনা

অপারেশন সিঁদুরের পর ব্রহ্মোসের মতো দূরপাল্লার সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার নিয়েও সামরিক বিশ্লেষণে আলোচনা হয়েছে। ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মোস উচ্চ গতির একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।

এই ধরনের স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার অন্যতম সুবিধা হল, উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মকে সীমান্তের ওপারে পাঠানোর প্রয়োজন হয় না। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিমান ও পাইলটকে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঝুঁকির মধ্যে না ফেলেও দূরপাল্লার আঘাত হানার বিকল্প তৈরি হতে পারে।

তবে অপারেশন সিঁদুরে ব্রহ্মোসের নির্দিষ্ট ব্যবহার, বিশেষ করে কোন কোন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে এটি ব্যবহৃত হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রকাশ্য সরকারি তথ্য সীমিত। তাই নির্দিষ্ট বিমানঘাঁটি ধ্বংস বা ব্রহ্মোসের “প্রথম যুদ্ধ-ব্যবহার” হিসেবে কোনও দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে কৌশলগত প্রশ্ন

এই জায়গা থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রশ্ন উঠে আসে। স্থির এবং পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সব ক্ষেত্রে কি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা প্রয়োজন? বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লার অস্ত্রের সুবিধা হল এগুলি দ্রুত লক্ষ্য পরিবর্তন করতে পারে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নমনীয়ভাবে ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে, স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিজ দেশের ভূখণ্ড থেকেই পরিচালনা করা সম্ভব। এর ফলে বিমান, পাইলট এবং অত্যন্ত মূল্যবান উড়ন্ত প্ল্যাটফর্মকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলেই নির্দিষ্ট স্থির লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে আঘাত হানার বিকল্প পাওয়া যায়।

তবে এর অর্থ বিমানশক্তির গুরুত্ব কমে যাওয়া নয়। বরং ভবিষ্যতের সামরিক পরিকল্পনায় বিমান, কামান, রকেট, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থাকে পরিস্থিতি অনুযায়ী একসঙ্গে ব্যবহার করার প্রয়োজন আরও বাড়ছে।

শুধু অস্ত্র নয়, গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বও

দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজন বাড়ছে। কোন লক্ষ্যবস্তুতে কামান ব্যবহার করা হবে, কোথায় রকেট কার্যকর, কখন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার প্রয়োজন এবং কোন পরিস্থিতিতে বিমান পাঠানো যুক্তিযুক্ত, এই সিদ্ধান্তগুলি শুধু অস্ত্রের পাল্লার উপর নির্ভর করে না। লক্ষ্যের গুরুত্ব, নির্ভুলতা, গোলাবারুদের মজুত, পাল্টা হামলার সম্ভাবনা, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি এবং সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কাও বিবেচনা করতে হয়।

এই কারণে গোলন্দাজ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং দূরপাল্লার আগ্নেয়াস্ত্র বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনায় আরও বেশি ভূমিকা দেওয়ার পক্ষে যুক্তি রয়েছে।

অপারেশন সিঁদুরের বড় প্রশ্ন, কীভাবে সংঘাত সীমিত রাখা যায়

অপারেশন সিঁদুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল হামলার পর সংঘাতকে সীমিত রাখার চেষ্টা। অভিযান শুরুর পর ভারতীয় সরকার একে লক্ষ্যভিত্তিক এবং পরিমিত প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছিল। প্রথম সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করা হয়নি।

পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা এবং ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ্যে আসে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছিল, ৭-৮ মে রাতে পাকিস্তানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা ইন্টিগ্রেটেড কাউন্টার-ইউএএস গ্রিড এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করা হয়েছিল। এই ঘটনা দেখায়, আধুনিক সামরিক প্রতিরোধ শুধু আক্রমণাত্মক অস্ত্রের উপর নির্ভর করে না। প্রতিপক্ষের পাল্টা হামলা প্রতিহত করার ক্ষমতাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে

সুনির্দিষ্ট সামরিক হামলা জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির, অস্ত্রভাণ্ডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা কমান্ড কাঠামোর ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং আর্থিক ভিত্তি শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।

তাই সামরিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধ করা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা, গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ানো এবং উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, সামরিক শক্তি কোনও জঙ্গি সংগঠনের সক্ষমতা কমাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের জন্য আরও বিস্তৃত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা

আগামী দিনের যুদ্ধক্ষেত্রে দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র, লইটারিং মিউনিশন, ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, কাউন্টার-ব্যাটারি রাডার এবং বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভারতের ক্ষেত্রেও ব্রহ্মোস, প্রলয় শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্র, পিনাকা রকেট ব্যবস্থা, স্বাথী রাডার এবং ড্রোনভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে ব্যবহার করার প্রশ্ন সামনে আসছে। লক্ষ্য শনাক্ত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করার ক্ষমতা আধুনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠছে।

সামনে ভারতের জন্য কী কী প্রশ্ন?

অপারেশন সিঁদুর নিয়ে প্রকাশ্য সরকারি তথ্য এবং সামরিক বিশ্লেষণ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। প্রথমত, স্থলভিত্তিক দূরপাল্লার অস্ত্রের সক্ষমতা আরও বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, কাউন্টার-ব্যাটারি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। তৃতীয়ত, সেন্সর, গোয়েন্দা তথ্য এবং অস্ত্র ব্যবস্থার মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি করা।

এর পাশাপাশি গোলন্দাজ, যোগাযোগ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনায় আরও বেশি যুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। অপারেশন সিঁদুরকে সরকারি নথিতে একটি সমন্বিত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং পরিমিত সামরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এর দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা তাই শুধু কোন অস্ত্র কতটা শক্তিশালী, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে গোয়েন্দা তথ্য, সেন্সর, অস্ত্র, যোগাযোগ, আকাশ প্রতিরক্ষা, কূটনীতি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে কতটা সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা যায় তার উপর।

Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories — On Kolkata24x7 Business.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *