সর্বত্র ব্রিজে জলপথও আর বাধা নয়, কীভাবে বাড়ে ভারতের সাঁজোয়া বাহিনীর গতি
কলকাতা: ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর। যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ৩ ডিসেম্বর, আর মাত্র ১৩ দিনের মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে। পূর্বাঞ্চলের সেই যুদ্ধে ভারতীয় সেনার দ্রুত অগ্রযাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গতি। সাঁজোয়া বাহিনীর দ্রুত অভিযান, হেলিকপ্টারে সেনা পারাপার এবং আকাশপথে সেনা নামানোর মতো একাধিক কৌশল পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরোধকে (Sarvatra Bridge) দ্রুত ভেঙে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। অসংখ্য নদী, খাল ও জলপথ সমতল ভূখণ্ডকে যেমন উর্বর করেছে, তেমনই সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি করেছে প্রাকৃতিক বাধা। সামরিক কৌশলের একটি বহুল ব্যবহৃত ধারণা হল, ভূখণ্ডই কৌশল নির্ধারণ করে। অর্থাৎ কোনও সেনাবাহিনী কীভাবে এগোবে, কোথায় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং কোথায় দ্রুত আক্রমণ চালাবে, তার উপর ভূপ্রকৃতির বড় প্রভাব থাকে।
এই কারণেই আধুনিক সেনাবাহিনীতে যুদ্ধ প্রকৌশলী বা স্যাপারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা একদিকে প্রাকৃতিক বাধাকে শত্রুর বিরুদ্ধে কাজে লাগান, অন্যদিকে নিজেদের বাহিনীর জন্য সেই বাধা অতিক্রমের পথ তৈরি করেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে গতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
যুদ্ধের ইতিহাসে দ্রুত গতিশীল বাহিনী বারবার বড় সুবিধা পেয়েছে। ঘোড়সওয়ার বাহিনী থেকে শুরু করে আধুনিক ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান, শত্রুর প্রতিরক্ষা ভেঙে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তার অবস্থানকে পাশ কাটানো বা ঘিরে ফেলার কৌশল বহু যুদ্ধেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Advertisements
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে জার্মানির দ্রুত সাঁজোয়া অভিযান তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় যুদ্ধগুলিতেও দ্রুতগতির সাঁজোয়া বাহিনী এবং তাদের সঙ্গে সমন্বিত বিমান ও অন্যান্য সহায়ক শক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।তবে গতি ধরে রাখার পথে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলির একটি হল প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম বাধা।
বাধা তৈরি করে কীভাবে প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা হয়
সামরিক বাধা সাধারণত শত্রুর অগ্রযাত্রা থামানো, ধীর করা অথবা নির্দিষ্ট দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়। নদী, খাল, জলাভূমির মতো প্রাকৃতিক বাধার সঙ্গে মাইনফিল্ড, কৃত্রিম প্রতিবন্ধক এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত হলে তা আরও কার্যকর হয়ে ওঠে।
সামরিক পরিকল্পনায় এই ধরনের বাধার চারটি প্রধান উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রথমত, শত্রুর ফর্মেশন ভেঙে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, তার অগ্রযাত্রার গতি কমিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে দেওয়া। তৃতীয়ত, তাকে নিজের পছন্দের দিক থেকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়ে যাওয়া। চতুর্থত, কোনও নির্দিষ্ট অগ্রযাত্রার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া।
এই বাধাগুলি একসঙ্গে ব্যবহার করলে আক্রমণকারী বাহিনীকে একাধিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে জলপথের সামনে পৌঁছনোর পর একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বাহিনীকে জমায়েত হতে হয়। ফলে প্রতিরক্ষাকারী বাহিনী বুঝতে পারে আক্রমণ কোথা থেকে আসছে এবং সেই জায়গায় অতিরিক্ত শক্তি মোতায়েন করতে পারে।
জলপথ কেন এত বড় সামরিক চ্যালেঞ্জ
সামরিক ইতিহাসে নদী পারাপার অন্যতম কঠিন অভিযান হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপারেশন মার্কেট গার্ডেন-এ নেদারল্যান্ডসের একাধিক নদী ও সেতু দখল করে রাইন নদীর দিকে এগোনোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু আরনহেমের গুরুত্বপূর্ণ সেতু দখল করতে ব্যর্থ হওয়ায় পুরো পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধেও জলপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। মিশরীয় বাহিনী সুয়েজ খাল অতিক্রম করে ইজরায়েলের বার-লেভ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানে। উচ্চচাপের জল ব্যবহার করে বালির বাঁধে ফাঁক তৈরি করার কৌশল ছিল সেই অভিযানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।
১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনা অবশ্য অন্য পথ বেছে নিয়েছিল। মেঘনা নদীর মতো বড় জলপথ সরাসরি পার হওয়ার বদলে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেনা ও সরঞ্জাম নদীর ওপারে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে একটি দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ নদী পারাপারকে পাশ কাটিয়ে ভারতীয় বাহিনী দ্রুত এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সেই অভিযানে পিটি-৭৬ উভচর ট্যাঙ্কও ব্যবহার করা হয়েছিল।
ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে জলপথের গুরুত্ব
পাঞ্জাব এবং জম্মু অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিতেও নদী, খাল ও অন্যান্য জলপথ রয়েছে। ফলে এখানে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় জলপথকে কেন্দ্র করে একাধিক বাধা তৈরি করা সম্ভব। একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় জলপথের আগে মাইনফিল্ড বা অন্যান্য বাধা রাখা হলে আক্রমণকারী বাহিনীকে প্রথমে সেগুলি অতিক্রম করতে হয়। এরপর জলপথ পার হয়ে বিপরীত তীরে পৌঁছতে হয়, যেখানে প্রতিরক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকেই অবস্থান করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আক্রমণকারী বাহিনীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় গতি। জলপথ পার হওয়ার পর দ্রুত সেতুমাথা বা ব্রিজহেড থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে প্রতিরক্ষাকারী বাহিনী পাল্টা শক্তি নিয়ে সেই জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে। এই কারণেই সাঁজোয়া বাহিনীর সঙ্গে দ্রুত অ্যাসল্ট ব্রিজিং সক্ষমতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ সর্বত্র ব্রিজ
ভারতীয় সেনার এই প্রয়োজন মেটানোর জন্য দেশীয়ভাবে তৈরি সর্বত্র ব্রিজ সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি একটি মোবাইল মাল্টি-স্প্যান ব্রিজিং ব্যবস্থা, যা বিএমইএলের ৮×৮ উচ্চ গতিশীলতার সামরিক যানবাহনের উপর স্থাপন করা হয়েছে।
সর্বত্রের মূল উদ্দেশ্য হল যুদ্ধক্ষেত্রে নদী, খাল বা অন্যান্য জলপথের মতো বাধার উপর দ্রুত সেতু তৈরি করে সাঁজোয়া ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের অগ্রযাত্রা বজায় রাখা।
এই ব্যবস্থা সর্বোচ্চ ৭৫ মিটার পর্যন্ত জলপথ বা বাধা অতিক্রম করার জন্য সেতু তৈরি করতে পারে। ১৫ মিটার করে ধাপে ধাপে স্প্যান বাড়ানো যায়। সিস্টেমটির বহনক্ষমতা প্রায় ৭০ টন শ্রেণির, ফলে ভারতের ভারী সাঁজোয়া যানও এর উপর দিয়ে যেতে পারে। প্রায় ৬৮ টন ওজনের অর্জুন এমকে-১এ ট্যাঙ্কের মতো ভারী যানকে মাথায় রেখেও এই সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
দ্রুত সেতু তৈরি করাই সর্বত্রের বড় শক্তি
সর্বত্রে বিশেষ ধরনের পিয়ার বা খুঁটি ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। মাল্টি-স্টেজ টেলিস্কোপিক পা প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চতা পরিবর্তন করতে পারে এবং নিজে লক হয়ে যায়। উন্নত হাইড্রলিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সেতু নির্মাণের কাজ পরিচালিত হয়।
সিস্টেমটির পিছনের কেবিনে দ্বৈত ড্রাইভ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। ডাবল এ-আকৃতির ট্রেসল কাঠামো নির্মাণের সময় স্থিতিশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। তুলনামূলক কম সংখ্যক কর্মী দিয়েই সেতু তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
একটি ১৫ মিটার স্প্যান প্রায় ২০ মিনিটে তৈরি করা সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ ৭৫ মিটার সেতু তৈরি করতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
এর গুরুত্ব বোঝা যায় ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের ইছোগিল খালের উদাহরণে। বামবাওয়ালি-রাভি-বেদিয়ান বা বিআরবি খাল নামে পরিচিত এই জলপথটি প্রায় ৪৫ মিটার প্রশস্ত। অর্থাৎ উপযুক্ত পরিস্থিতিতে ৭৫ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃতির সক্ষমতা থাকা একটি মোবাইল ব্রিজিং ব্যবস্থা এই ধরনের জলপথ অতিক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সুবিধা দিতে পারে।
শুধু যুদ্ধ নয়, দুর্যোগেও ব্যবহারযোগ্য
সর্বত্রের ব্যবহার শুধু সামরিক অভিযানে সীমাবদ্ধ নয়। বন্যা, ভূমিকম্প এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও দ্রুত অস্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরিতে এই ধরনের মোবাইল ব্রিজিং সিস্টেম ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ এটি একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনার গতিশীলতা বজায় রাখার এবং শান্তিকালীন সময়ে জরুরি পরিকাঠামো তৈরির সক্ষমতা দেয়।
সাঁজোয়া বাহিনীর জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
আধুনিক যুদ্ধে শুধু ট্যাঙ্ক বা সাঁজোয়া যান থাকা যথেষ্ট নয়। তাদের দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি নদী বা খাল যদি পুরো সাঁজোয়া বাহিনীর গতি থামিয়ে দেয়, তাহলে শত্রু সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে পারে।
সর্বত্রের মতো মোবাইল ব্রিজিং ব্যবস্থা সেই সময়ের ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যেই তৈরি। এর মাধ্যমে জলপথকে সম্পূর্ণ অচলাবস্থার কারণ না বানিয়ে দ্রুত অতিক্রমযোগ্য বাধায় পরিণত করা যায়।
১৯৭১ সালের যুদ্ধ দেখিয়েছিল, ভূপ্রকৃতিকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে সর্বত্রের মতো দেশীয় প্রযুক্তি সেই একই মূল সামরিক নীতিকে আরও আধুনিক রূপ দেয়। অর্থাৎ শত্রুর তৈরি বা প্রাকৃতিক বাধা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, দ্রুত ব্রিজিং সক্ষমতা থাকলে সাঁজোয়া বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে যায়।
সেই অর্থে সর্বত্র, যার অর্থ সর্বত্র, ভারতের যান্ত্রিক ও সাঁজোয়া বাহিনীর জন্য শুধু একটি সেতু নয়, বরং বাধা অতিক্রম করে দ্রুত গতিশীলতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা।