বস্তায় কী? ‘একটা বডি আছে’, বিস্ফোরক অমিত!
এই সময়, পুরুলিয়া: নিকষ, জমাট বাঁধা অন্ধকার। তার ভিতর থেকে ভেসে এল দুটো বাক্য— ‘বস্তার ভিতরে একটা বডি আছে। একটা মেয়ের বডি।’শুনে চমকে উঠলেও কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সামলে নিলেন তিনি। তাঁকে এ বার কর্তব্য করতে হবে। দ্রুত মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালালেন এবং সেই আলোয় তিনি দেখলেন, মোটরবাইকে পিছনের সওয়ারির জন্য যে পাদানি, সেখানে রক্তের দাগ। পিছনের চাকার রিংগার্ড বেয়েও নেমেছে রক্তের ধারা।
মোটরবাইকের পিছনে রাখা বস্তার ভিতরে লাশ থাকার কথা যে সত্যি, সেটা বুঝে বলরামপুর থানার ভিলেজ পুলিশ লক্ষ্মীকান্ত কুমার সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলেন থানায়। তার আগে অবশ্য লক্ষ্মীকান্ত নিজের মোটরবাইক আড়াআড়ি ভাবে রাখলেন লাল রঙের বাইকটির সামনে। যাতে বাইক সওয়ারি যুবক পালাতে না–পারেন। লক্ষ্মীকান্তর ফোন পেয়ে বলরামপুর থানার টহলদারি ভ্যান পৌঁছল অন্তত ১০ মিনিট পরে। ওই সময়ের মধ্যে চল্লিশোর্ধ্ব লক্ষ্মীকান্তকে পাত্তা না–দিয়ে ২১ বছরের ওই যুবক ছুটে পালাতে পারতেন। কিন্তু সেই চেষ্টাও তিনি করেননি। ঠায় সেখানেই দাঁড়িয়েছিলেন। সে ভাবেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেলেন পুরুলিয়া শহরের কাছে নিজের মেসে প্রেমিকাকে ডেকে খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত অমিত মাহাতো। তাঁর বাইকের পিছনে রাখা বস্তাতেই ছিল ১৯ বছরের ওই তরুণীর দেহ। খুনের সাড়ে পাঁচ–ছ’ঘণ্টা পরে।
শনিবার রাত তখন ১১টা–সওয়া ১১টা। রাস্তায় লোকজনের বা যানবাহন কমে এসেছে। পুরুলিয়া-জামশেদপুর ১৮ নম্বর জাতীয় সড়কে, বলরামপুর এলাকায় নজরদারির দায়িত্বে ছিলেন বলরামপুর থানার গ্রামীণ পুলিশ লক্ষ্মীকান্ত কুমার। পুরুলিয়া শহরের দিক থেকে বলরামপুরে ঢোকার কিছুটা আগে, পুরোনো জাতীয় সড়ক ও নতুন জাতীয় সড়কের বাইপাসে মোটরবাইকে লক্ষ্মীকান্ত টহল দিচ্ছিলেন। ওই জায়গায় রথতলা মাসির বাড়ির বাগানের কোনায় তিনি দেখলেন রাস্তার ধারে বাঁ দিকে মোটরবাইক দাঁড় করিয়ে এক যুবক দাঁড়িয়ে। লক্ষ্মীকান্তর বাইকের হেডলাইটে দেখা গেল, ওই যুবকের বাইকের পিছনে একটি বস্তা রাখা। লক্ষ্মীকান্ত প্রথমে মনে করেছিলেন, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ওই যুবক ওখানে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সে রকম কিছু নয় বুঝতে পেরে ভিলেজ পুলিশ ওই ব্যক্তি কিছুটা এগিয়ে গিয়েও বাইক ঘুরিয়ে ওই জায়গায় এলেন।
দাঁড়িয়ে থাকা ওই যুবককে লক্ষ্মীকান্তর প্রশ্ন, ‘পিছনের বস্তায় কী আছে?’ বাইক সওয়ারির উত্তর, ‘একটা জিনিস আছে।’ লক্ষ্মীকান্তর প্রশ্ন, ‘কী জিনিস?’ যুবক বললেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।’ লক্ষ্মীকান্তর ফের প্রশ্ন, ‘কী গুরুত্বপূর্ণ জিনিস?’ উত্তর এ বার এল সঙ্গে সঙ্গে নয়, কয়েক সেকেন্ড পরে এবং একটু কাঁপা গলায়। ‘বস্তার ভিতরে একটা বডি আছে। একটা মেয়ের বডি।’
ওই ভিলেজ পুলিশের ফোন পেয়ে বলরামপুর থানার টহলদার গাড়ি পৌঁছনোর পরে সেখানে যান থানার সেকেন্ড অফিসার। তার পরে সেখানে যান আইসি অর্ণব গুহ ও অন্য আধিকারিকরা। মোবাইলের চার্জারের তার দিয়ে বেঁধে রাখা বস্তা খুলতেই দেখা যায় বস্তার ভিতরে এক তরুণীর লাশ রয়েছে। তার পরেই অমিত মাহাতোকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই তিনি সবটা স্বীকার করে নেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গ্রামীণ পুলিশ লক্ষ্মীকান্ত কুমারের ওই তৎপরতা ও কাজের প্রশংসা সোমবার করেছেন জেলার পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ। এ দিন নিজের অফিসে লক্ষ্মীকান্তকে এসপি সম্মানিতও করেন। পুলিশ সুপার জানান, লক্ষ্মীকান্ত কুমারের সতর্কতা, উপস্থিতবুদ্ধি এবং দ্রুত পদক্ষেপের ফলে একটি খুনের মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে, গ্রেপ্তার করা গিয়েছে অভিযুক্তকে।
পুলিশের বক্তব্য, তরুণীর দেহের ময়না-তদন্ত রিপোর্ট এখনও আসেনি। নিহত তরুণীর বাবা লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন যে, তাঁর মেয়েকে খুনের আগে ধর্ষণ করা হয়েছে। সেটা মাথায় রেখে পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে এ নিয়ে নির্দিষ্ট ভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে পুলিশের তরফে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার সন্ধেয় অমিত তাঁর প্রেমিকার মৃতদেহ বস্তায় পুরে মোটরবাইকে করে মেস থেকে বেরোনোর পরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, রাতে তিনি বলরামপুরের ওই জায়গায় পৌঁছন। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অমিত জানিয়েছেন, তাঁর প্রেমিকা একাধিক সম্পর্কে জড়িত ছিলেন বলে সন্দেহ করতেন তিনি। অমিতের দাবি, ওই তরুণী তাঁকে আর্থিক প্রয়োজনে রীতিমতো ব্যবহার করতেন। নার্সিং পড়তে ওই তরুণীর পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনিতে চলে যাওয়ার কথা ছিল। তার আগে তাঁকে মেসে ডেকে আনেন অমিত। শনিবার দিনটিই অমিত ঠিক করেছিলেন। কারণ, মেসের অনেকেই রবিবারের ছুটির আগে থাকায় শনিবার দুপুরের মধ্যে বাড়ি চলে যান। ফাঁকা হয়ে যায় মেস। পুলিশ জানিয়েছে, খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।